শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০৫:০৯ অপরাহ্ন




তরুণদের জীবনাদর্শ

ফাতিমা আজিজা :
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২০




তরুণদের জন্য হজরত মুহাম্মদ সা: নসিহত ছিল এমন- ‘এ হচ্ছে একটি শাশ্বত কথা। এ কথাটি গ্রহণ করে তোমরা আমার সাথী হয়ে যাও। দেখবে, এর শক্তিতে পুরো আরব তোমাদের মুষ্টির মধ্যে চলে আসবে এবং এর প্রভাবে পুরো বিশ্ব তোমাদের অধীন হবে।’ মহান এই ব্যক্তিত্ব সবার মনকে নাড়া দেয়, যিনি কিনা ভারসাম্য বজায় রেখে চলতেন। তিনি খুব সহজেই সবার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং সমাজে সবার সাথে উত্তম যোগাযোগমাধ্যম তৈরি করেছিলেন। সমাজের মানুষের সাথে তাঁর মেলবন্ধন কেমন ছিল তা একটি ঘটনা থেকে লক্ষ্য করতে পারি।
ঘটনাটি হচ্ছে- মক্কার এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আল আস ইবনে ওয়াইল এক ইয়েমেনীব্যবসায়ীর থেকে পণ্য নিয়েছিল টাকা শোধ না করে। সেই ইয়েমেনী মক্কার নেতাদের হস্তক্ষেপ কামনায় আকুতি জানিয়েছিলেন যাতে সম্মানিত নেতারা আল আসের কাছে গিয়ে তাকে টাকা দিতে বাধ্য করেন। এ রকম অবিচার যেন আবার না হয় এবং মক্কার বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিতে যেন বিরূপ প্রভাব না আসে, নগর নেতারা সে জন্য একটা চুক্তি করেন। এর নাম হিলফুল ফুজুল (মর্যাদাপূর্ণদের মৈত্রী)। ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ এবং বহিরাগত ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষা এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। নবী সা: তরুণ হলেও এই চুক্তিতে বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের সাথে অন্তর্ভুক্ত হন। আবদুল্লাহ জুদআনের বাড়িতে সবাই একত্রিত হন। যেখানে মুহাম্মদ সা: সাক্ষী এবং চুক্তির সমর্থক ছিলেন। বহু বছর পরে তিনি এই চুক্তি সম্পর্কে বলেন- ‘আবদুল্লাহ জুদআনের বাড়িতে একটি চুক্তিতে আমি সাক্ষী ছিলাম, ইসলামের সময়ও যদি এই চুক্তিতে ডাকা হতো, তাহলে আমি সাড়া দিতাম।’
এটি স্পষ্ট যে- তরুণ বয়সে মহানবী সা: আদর্শ দৃষ্টান্তে পিছিয়ে ছিলেন না। আর আমাদের সমাজকাঠামোয় পরিবর্তনশীল দৃষ্টান্ত তৈরিতে তরুণদের ভূমিকা যে অপরিসীম তা এখান থেকে জানতে পারি।
‘যখন বুলাই তাঁর মুখমণ্ডলে দু’চোখ, সে যেন বর্ষামুখী মেঘে বিদ্যুতের চমক।’ -আবু কবির হুজালি
আরবের বিশিষ্ট, সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারে, এক ব্যতিক্রমী শিশুর জন্ম। তিনি বিশেষ কুদরতে মরুভূমিতে বেড়ে উঠার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে কঠিন বিপদ মুসিবত ও দুঃখ-কষ্টের মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হন। আর পাশাপাশি ছাগল মেষপালক হয়ে এক বিশ্বজোড়া জাতির নেতৃত্ব দেয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। যৌবনে পদার্পণ করা পর্যন্ত এই তরুণকে প্রবীণদের মতো ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে দেখা যায়। যে সমাজে প্রতিটি মজলিশ ছিল কলুষিত সেই সমাজে তিনিই ছিলেন ব্যতিক্রম। তখন মজলিশে পরনারীর প্রতি প্রকাশ্য প্রেম নিবেদন ও মদ্যপানের বিষয়ে কবিতা পাঠের জমজমাট আসর বসত, সেখানে এই তরুণ মদপান করতেন না। যেখানে অপসংসস্কৃতির সয়লাব সেখানে তিনি বাদ্যবাজনার কাছে যেতেন না। তিনি নিজে বলেন-‘ইসলামপূর্ব সময়ে মানুষরা যেসব কাজে আকৃষ্ট হতো কেবল দুই রাত বাদে আমি সেগুলোতে আকৃষ্ট হইনি। সেই দুই রাতে আল্লাহ আমাকে সুরক্ষা করেছিলেন। এক রাতে আমি মক্কার কিছু ছেলেদের সাথে ছিলাম। আমরা পশুর পাল তদারকি করছিলাম। আমি আমার বন্ধুকে বললাম, ‘আমার ভেড়াগুলোকে দেখো, যাতে আমি মক্কার অন্যান্য ছেলেদের মতো মক্কায় কাটাতে পারি।’ সে বলল ‘ঠিক আছে।’ তো আমি গেলাম। আমি যখন মক্কার প্রথম বাসায় পৌঁছালাম, তখন আমি তাম্বুরিন ও বাঁশিসহ বাজনা শুনতে পেলাম। আমি দেখার জন্য বসলাম। আল্লাহ আমার কানে আঘাত করলেন। আমি শপথ করেছি, সূর্যোদয় পর্যন্ত তিনি আমাকে ঘুম থেকে ওঠাননি।’
অন্য এক রাত। আমি বন্ধুকে বললাম, ‘আমার ভেড়াগুলোকে দেখো, যাতে আমি মক্কায় রাত কাটাতে যেতে পারি।’ যখন মক্কায় এলাম, গতবার যেমন আওয়াজ শুনেছিলাম, এবারো শুনলাম। আমি দেখার জন্য বসলাম। আল্লাহ আমার কানে আঘাত করলেন। আমি শপথ করছি, সূর্যোদয় পর্যন্ত তিনি আমাকে ঘুম থেকে ওঠাননি। ওই দুই রাতের পর আমি কসম করে বলছি, আর ওসবের ধারেকাছে যাইনি।’ এখান থেকে তরুণদের জন্য একটি উত্তম বিষয় হচ্ছে, তারা যখন খারাপ কোনো কাজে বাধাগ্রস্ত হবে তখন এটাকে আল্লাহর অশেষ কুদরত মনে করেই যেন খারাপ কোনো কাজে অগ্রসর হওয়া থেকে বিরত থাকে।
‘তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী’। (সূরা আল-কলম : ০৪) কুরআনের এই আয়াতে ইসলাম, দ্বীন অথবা কুরআন মজিদকে বুঝানো হয়েছে। অর্থ হলো, তুমি ওই মহান চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছ, যার আদেশ মহান আল্লাহ তোমাকে কুরআনে অথবা ইসলামে দিয়েছেন। অথবা এর অর্থ হলো, এমন শিষ্টাচার, ভদ্রতা, নম্রতা, দয়া-দাক্ষিণ্য, বিশ্বস্ততা, সততা, সহিষ্ণুতা এবং দানশীলতাসহ অন্য যাবতীয় চারিত্রিক ও নৈতিক গুণাবলি যার অধিকারী তিনি নবুয়াতের আগেও ছিলেন এবং নবুয়াতের পর যা আরো উন্নত হয় ও সৌন্দর্য-সমৃদ্ধ হয়। আর এই কারণেই যখন আয়েশা রা:কে তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন তিনি বলেন, ‘তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন’। (মুসলিম : মুসাফিরিন অধ্যায়) মা আয়েশার এই উত্তরে উল্লিখিত উভয় অর্থই রয়েছে। রাসূল সা: এর ২০ বছরের তারুণ্যকালের একটি সুন্দর ঘটনা আছে। ওই সময়ে সুক উকাজ নামক বাজার বসত, সেখানে কিস ইবনে সাদারের বিখ্যাত এক ভাষণ তিনি শোনেন।
ভাষণ ছিল নিম্নরূপ- ‘যারা একদিন বেঁচে ছিল, তারা আজ মারা গেছে। আর যারা মারা গেছে তাদের সব সুযোগ শেষ। মানুষজন কি ভেবেছে দুনিয়াতে এসে আর ফিরে যাবে না? তারা কি তাদের কবর নিয়ে খুব খুশি? তারা কি সেখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে? নাকি সেখানে তাদেরকে ঘুমানোর জন্য রেখে দেয়া হয়েছে? চুলোয় যাক খামখেয়ালি শাসক, পরিত্যক্ত জাতি আর কালের খাতায় হারিয়ে যাওয়া শতাব্দী। যারা উঁচু উঁচু অট্টালিকা বানিয়েছিল আজ তারা কোথায়? তারা তোমাদের চেয়ে বড়লোক ছিল না? বেশিদিন জীবিত ছিল না? এখন তাদের হাড্ডি ক্ষয় হয়ে গেছে। তাদের ঘরবাড়িগুলো পরিত্যক্ত। বেওয়ারিশ কুকুর এখন সেখানে থাকে। কেবল মহান আল্লাহ চিরজীবী। তিনি একজনই। শুধু তিনি উপাসনা পাওয়ার অধিকারী। তাঁর কোনো বাবা-মা নেই। বাচ্চাকাচ্চাও নেই।’ যেই বাজারে মানুষ আনন্দ আর গান-বাজনা করতে যেত, সেখানে নবীজি সব কিছু ছেড়ে দিয়ে এই ভাষণের প্রতি আকৃষ্ট হন। অশেষ কুদরতে নবুয়াত প্রাপ্তির ২০ বছর আগেই তিনি এই ভাষণ মনের ভেতর গেঁথে নেন। তিনি সমাজের প্রতিকূলে গিয়ে নিজের সেরাটি করেছেন। কুসংস্কার আর অপসংস্কৃতির প্রভাবে গা ভাসিয়ে দেননি। আর তাঁর আদর্শ পর্যালোচনার পরে আমরা যারা তরুণ রয়েছি তাদের জন্য এটাই সুযোগ। এই তো হচ্ছে জীবনাদর্শের জ্বলজ্বলে প্রদীপ, যেই প্রদীপের হাতছানি দেয়া ভালোর পথে এগিয়ে নিতে।
লেখিকা : নিবন্ধকার ও গবেষক




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com