শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০৩:২৯ অপরাহ্ন




ঋণ পরিশোধে টালবাহানা নয়

আহনাফ আবদুল কাদির :
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২০




সমাজে কিছু মানুষ আছে যারা কথা দিয়ে কথা রাখে না। ঋণ নিয়ে সময় মতো সেই ঋণ ফেরত দেয় না। গড়িমসি ও টালবাহানা করে। বারবার সময় ও সুযোগ তালাশ করে। মনে মনে পুষে রাখে ফেরত না দেয়ার বাসনা। এমন লোকদের সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ঋণ করার পর মনে মনে সঙ্কল্প করে রাখে যে, সে ওই ঋণ পরিশোধ করবে না, তবে সে আল্লাহর সাথে চোর হয়ে সাক্ষাৎ করবে’ (ইবনে মাজাহ : ২৪১০)। প্রয়োজনের সময় বারবার যার দ্বারস্থ হয়েছিল, এখন তাকেই না চেনার ভান ধরা; সহযোগিতার হাত যে বাড়িয়ে দিয়েছিল, তাকে দেখলে পাশ কেটে চলে যাওয়াÑ এমন লোকের দৃষ্টান্ত আমাদের সমাজে কম নয়। আবার এমনো কিছু মানুষ আছে, যাদের কাছে ঋণের টাকা ফেরত চাইলে উল্টো পেশিশক্তি ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দাতার দিকে বুড়ো আঙ্গুল তোলে।
হাদিসের ভাষায়, ‘ধনী ব্যক্তির ঋণ আদায়ে টালবাহানা করা অন্যায়’ (সহিহ বুখারি : ২২৮৭, মুসলিম : ১৫৬৪, মুয়াত্তা মালেক : ১৩৭৯)। আরো বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি তার হাত দিয়ে যা গ্রহণ করেছে, তা পরিশোধ না করা পর্যন্ত সে দায়ী থাকবে (তিরমিজি : ১২৬৬, আহমাদ : ১৯৫৮২)। অথচ ঋণ একটি আমানত। ঋণগ্রহীতা মূলত দাতার কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করে থাকে। খেয়ানত না করে সময় মতো সেই আমানত পরিশোধ করাই কর্তব্য। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, ‘আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানত সময় মতো তার প্রাপকের কাছে দিয়ে দেবে’ (সূরা নিসা : ৫৮)। আরো বলা হয়েছে, ‘যদি তোমাদের পরস্পর পরস্পরকে বিশ্বাস করে, তবে যাকে বিশ্বাস করা হয় সে যেন অপরের আমানত যথাযথভাবে আদায় করে দেয়, আল্লাহকে ভয় করে এবং সাক্ষী গোপন না রাখে। আর যে কেউ তা গোপন রাখে, তার অন্তর হবে পাপপূর্ণ। তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ সেসব অবহিত’ (সূরা বাকারা : ২৮৩)।
মূলত ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়া রক্তচোষার শামিল। হাদিসের ভাষায়, ‘একজন মুসলমান ভাইয়ের অর্থ অপর মুসলমানের জন্য ঠিক তেমনি হারাম, যেমন হারাম তার রক্ত’ (সহিহুল জামে : ৩১৪০)। অপরিশোধিত ঋণ আমল বরবাদ করে দেয় এবং জান্নাতের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। রাসূল সা: বলেন, ‘ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির আত্মা লটকে থাকে, যতক্ষণ না তার পক্ষ থেকে কেউ সেই ঋণের টাকা পরিশোধ করে দেয়’ (ইবনে মাজাহ : ২৪১৩)। তাই রাসূল সা: মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম ঋণ পরিশোধের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে রাসূল সা:-এর প্রিয় সাহাবি স্বাদ বিন আওতাল বলেন, ‘আমার ভাই ছেলেমেয়ে রেখে মারা গেল। মারা যাওয়ার সময় সে ৩০০ দিরহাম রেখে গেল। আমি মনস্থ করলাম এই ৩০০ দিরহাম তার ছেলেমেয়েদের পেছনে ব্যয় করব। কিন্তু আমার ভাই ছিল ঋণগ্রস্ত।
নবী সা:-এর কাছে এই সংবাদ দেয়ার পর তিনি বললেন, তোমার ভাই ঋণের ফলে আটকে আছে। আগে তার ঋণ পরিশোধ করো’ (ইবনে মাজাহ : ২৪৩৩, সহিহুল জামে: ১৫৫০)। রাসূল সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি দিনার অথবা দিরহাম ঋণ রেখে মারা যাবে, কিয়ামতের দিন তাকে তার নেকি থেকে সেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। কারণ সেখানে কোনো দিনার ও দিরহাম নেই’ (ইবনে মাজাহ : ২৪১৪, আহমদ : ৫৫১৯)। ঋণ আদায়ে সচ্ছল ব্যক্তির কোনোরূপ টালবাহানা গ্রহণযোগ্য নয়। এ ক্ষেত্রে ঋণদাতা কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের কাছে পাওনা আদায়ে অভিযোগ করতে পারে। এ জন্য টালবাহানাকারী ঋণীকে শাস্তিও দেয়া যেতে পারে। রাসূল সা: বলেন, ‘যে সচ্ছল ব্যক্তি ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করে, তাকে অপমান ও শাস্তি উভয়টিই দেয়া আমার জন্য হালাল’ (নাসায়ি : ৪৬৯০, আবু দাউদ : ৩৬২৮, মুসনাদে আহমাদ: ১৮৯৬২)। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আলী আত-তানাফিসী র: বলেন, অপমান করা অর্থ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা এবং শাস্তি দেয়া অর্থ তাকে কারাগারে প্রেরণ করা। ঋণের বোঝা এতটাই ভারী যে, পরকালে সব হিসাব থেকে পার পাওয়া গেলেও ঋণ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। রাসূল সা: বলেন, ‘ঋণ পরিশোধের পাপ ছাড়া শহীদের সব পাপই মাফ দেয়া হবে’ (মুসলিম, মিশকাত : ২৯১২)। তাই ঋণ পরিশোধে গড়িমসি বা টালবাহানা নয়; বরং জাহান্নামের ভয়াবহ আজাব থেকে বাঁচা এবং জান্নাতের পথ সহজ করতেই ঋণ আদায়ে মনোযোগী হতে হবে। আর যে ঋণ আদায়ে সচেষ্ট হয়, আল্লাহ তাকে সক্ষমতা দান করেন।
হাদিসের ভাষায়, ‘যে মুসলিম ঋণ গ্রহণ করে এবং আল্লাহ জানেন যে, তা পরিশোধ করার অভিপ্রায় তার রয়েছে, তাহলে দুনিয়াতে আল্লাহ তার ওই ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন’ (দারেমি : ৪৬৮৬, ইবনে মাজাহ : ২৪০৮)। আরো বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে মানুষের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে, আল্লাহ তায়ালা তা আদায়ের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে তা নেয় বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ তায়ালা তাকে ধ্বংস করেন’ (সহিহ বুখারি : ৫৭২)।




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com