বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ০৯:৪০ অপরাহ্ন




বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাতকে অস্থিরতায় ফেলেছে করোনাভাইরাস

খবরপত্র ডেস্ক:
  • আপডেট সময় সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২০




সিএনবিসির প্রতিবেদন

করোনা ভাইরাস মহামারি বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাতকে অস্থিরতায় ফেলেছে। এতে যে কয়েক লাখ শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন, আচমকাই তাদের হাতছাড়া হয়ে যায় এই কাজ। এর ফলে পিছিয়ে পড়েন কয়েক লাখ শ্রমিক। এখানে অর্থনীতির চালিকাশক্তি বা লাইফলাইন হলো গার্মেন্ট শিল্প। কিন্তু করোনা ভাইরাস যেমন সারাবিশ্বকে তছনছ করে দিয়েছে, তেমনি এদেশের কয়েক শত ডলারের কার্যাদেশ বাতিল করে বৈশ্বিক খুচরা ক্রেতারা। কারণ, তারা তাদের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছিল। ব্রান্ডগুলো তাদের অর্ডার ফিরিয়ে নিচ্ছিল। অনলাইন সিএনবিসি’তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, করোনা মহামারি শুরুর আগে ২২ বছর বয়সী মৌসুমী জানুয়ারিতে একটি গার্মেন্ট কারখানায় নতুন কাজ শুরু করেন। ২০১৮ সাল থেকে তিনি বেকার ছিলেন। মার্চ পর্যন্ত তিনি প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে আয় করতেন। করোনা ভাইরাস আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে মার্চেই দেশজুড়ে গার্মেন্ট বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়। সীমিত জনবল নিয়ে এপ্রিলে আবার খোলে কারখানা। এ সময় তিনমাস পর্যন্ত বেকার থাকা মৌসুমিকে ১লা আগস্ট জানানো হয় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সিএনবিসি’কে মৌসুমী বলেন, বরখাস্ত করার কারণ হিসেবে তারা একটাই কথা বলেছে। তা হলো করোনা ভাইরাসের কারণে লোকজনকে কাজ থেকে ছাঁটাই দেয়া হচ্ছে। এপ্রিলে এবিএ ফ্যাশন্স লিমিটেডে চাকরি হারান দুলালী (২২)। তিনি সেখানে ওভারটাইম মিলিয়ে এক মাসে ১১ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতেন। তখন থেকেই তিনি কাজ পাওয়ার জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। মৌসুমীর মতো তাকেও চাকরি থেকে বরখাস্তের কারণ হিসেবে করোনা মহামারিকে দায়ী করা হয়েছে। দুলালী বলেছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে কোনো নতুন কার্যাদেশ আসছিল না। কারখানা মালিক শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। দুলালী বলেন, নতুন কাজ খুঁজে নেয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে তার। তার মতো আরো অনেকে কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আট বছর বয়সী মেয়ের সঙ্গে বসবাস করেন দুলালী। তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা বেঁচে আছি মারাত্মক এক সঙ্কটের মধ্যে। বাসা ভাড়া বাকি পড়েছে ১৬ হাজার টাকা। তিনি ভূমি মালিকের বাসায় রান্নার কাজ করছেন। তা থেকে মাসে মাত্র ৫০০ টাকা বেতন পান। তা দিয়ে কোনো মতে বেঁচে আছেন তারা।
মৌসুমী, দুলালী সহ মোট ৬ জন গার্মেন্ট শ্রমিকের সঙ্গে ফোনে বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন ফেডারেশনের মাধ্যমে কথা বলেছে সিএনবিসি। ইন্ডিপেন্ডেন্ট গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন ফেডারেশন কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে কাজ করে। সিএনবিসি যাদের সঙ্গে কথা বলেছে, তার মধ্যে কয়েকজন কাজ পেয়েছেন। অন্যরা এপ্রিল বা মে মাস থেকে কাজের সন্ধান করে বেড়াচ্ছেন। তারা সবাই অতিরিক্ত আর্থিক সঙ্কটের কথা জানিয়েছেন। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেসব খুচরা ব্রান্ডের অর্ডার প্রোডাকশনে চলে গিয়েছিল, তা সহ বেশির ভাগই কার্যাদেশ বাতিল করে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) মতে, করোনা ভাইরাসের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১১৫০টি কারখানা। তারা ৩১৮ কোটি ডলারের কার্যাদেশ বাতিলের রিপোর্ট করেছে। এ বছর মার্চ এবং জুনের মধ্যবর্তী সময়ে ২০১৯ সালের তুলনায় বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাতে হারিয়েছে ৪৯০ কোটি ডলার। সিএনবিসি’কে বিজিএমইএ বলেছে, শেষ তিন থেকে চার মাসে তাদের সদস্য কারখানাগুলো ৭১ হাজার শ্রমিককে কাজ থেকে বাদ দিয়েছে।
চীনের পরই পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ দেশ। দেশের রপ্তানি আয়ের একটি বড় উৎস হলো গার্মেন্ট শিল্প। বিজিএমইএ’র ডাটা অনুযায়ী, ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে মোট ৩৩৬৭ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের মধ্যে শতকরা ৮৩ ভাগই এসেছে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। বাংলাদেশের কমপক্ষে ৪৬০০ গার্মেন্ট কারখানা শার্ট, টি-শার্ট, জ্যাকেট, সোয়েটার এবং ট্রাউজার প্রস্তুত করে। এর বেশির ভাগই যায় ইউরোপে, যুক্তরাষ্ট্রে এবং কানাডায়। এই খাতে কাজ করেন প্রায় ৪১ লাখ শ্রমিক। তার মধ্যে বেশির ভাগই নারী। তবে তারা জোরপূর্বক শাস্তিমুলক অবস্থায় অধিক কর্মঘন্টা কাজ করেন বলে অভিযোগ আছে। তা সত্ত্বেও তাদের বেতন কম। পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক প্রফেসর মার্ক অ্যানার বলেছেন, এসব শ্রমিক হলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বিপন্ন শ্রমিক। এর মধ্যে যুব শ্রমিক, নারী শ্রমিক বেশির ভাগই দেশের ভিতরে অভিবাসী হয়ে পড়েন। ফলে তারা গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরে ছুটে আসেন। ৪ঠা এপ্রিল গার্মেন্টের কাজ হারিয়েছেন ৩০ বছর বয়সী বিলকিস বেগম। এখন পর্যন্ত তিনি কোনো কাজ খুঁজে পান নি। তাই বেঁচে থাকার জন্য তিনি পাশের এক অসুস্থ প্রতিবেশীর বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ নিয়েছেন। তার সঙ্গে আশপাশের মানুষের দেয়া খাদ্য সহায়তার ওপর বেঁচে আছেন। তাকে এখন অস্থায়ী ভিত্তিকে কাজে নেয়া হয়েছে। ঘন্টাভিত্তিক এই কাজে তিনি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পান। তা দিয়ে এখন ঘরভাড়াই দিতে পারেন না। তার এক ভাই কাজ করছেন। তিনি মাঝে মাঝে বিলকিসকে সহায়তা করে থাকেন। কিন্তু তারও তো পরিবার আছে। বিলকিস বলেন, এখন আমি এখানে ওখানে কাজ করি, যাতে অন্তত কিছুটা অর্থ আসে। অ্যানার বলেন, এসব শ্রমিকের অনেকেরই কোনো সঞ্চয় থাকে না। তারা যা উপার্জন করেন তার ওপর ভর করে বেঁচে থাকেন। তাই যখন তাদেরকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়, তখন তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েন তারা। কখনো কখনো এসব শ্রমিকের গ্রামের বাড়িতে থাকা সদস্যরা তাদের ওপর নির্ভর করেন। নানা দিক দিয়ে তারাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিক। এ জন্য তাদেরকে কঠোর মূল্য দিতে হচ্ছে। প্রফেসর মার্ক অ্যানার মার্চে বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাতে করোনা মহামারির তাৎক্ষণিক কি প্রভাব পড়বে তার ওপর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেন। তিনি বলেছিলেন যে, বেশির ভাগ ব্রান্ডই প্রাথমিকভাবে সরবরাহকারীদের উৎপাদন খরচ এবং কাঁচামাল কেনার খরচ দিতে অনীহা করছে। অথচ কারখানাগুলো ততক্ষণে নিজেদের অর্থে তা কিনে ফেলেছে। তাদের কারণে বেশির ভাগ কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, সামরিক বন্ধ হয়ে যায় অথবা কর্মীদের ছাঁটাই করে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক রিপোর্টে বলা হয়, যখন কয়েক মাসে এই ক্ষতি কাটিয়ে নিতে রপ্তানি শুরু হয়েছে, তখন কারখানা মালিকদের আশঙ্কা অর্ডার তিন ভাগের দুই ভাগ কমিয়ে দেয়া হতে পারে। খুচরা ক্রেতারা শতকরা ১৫ ভাগ কম মূল্য দাবি করছে।
মৌসুমী বলেছেন, প্রায় এক মাস আগে তিনি একটি নতুন কারখানায় যোগ দিয়েছেন। সেখানে তৈরি হয় টি-শার্ট এবং ফেসমাস্ক। সেখানে কর্মঘন্টা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে সকাল আটটা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। মাঝে মাঝেই শিফটে কাজ করতে হয়। সেই কাজ মধ্যরাতের পরেও চলে। তিনি আরো বলেন, কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। আছে প্রচুর চাপ। আমাদেরকে দিয়ে জোরপূর্বক কাজ করানো হয়। বিকাল ৫টার পর দেয়া হয় ওভারটাইম। মৌসুমী বলেন, আগের কারখানায় তিনি যে বেতন পেতেন এখন বেতন পান তার চেয়ে অনেক কম। এখন তিনি বেতন পান প্রায় ৮৫০০ টাকা। বিকাল ৫টার পরে কাজ করলে সঙ্গে পান কিছু ওভার টাইমের বিল। তিনি বলেন, এখন কম বেতন পাচ্ছি। তাই বলে এখনই নতুন চাকরি খুঁজতে যাচ্ছি না। আমার পরিবারে অনেক সমস্যা। তাই আমাকে বাধ্য হয়েই কাজ করতে হবে। বৃটেনে বিজনেস এন্ড হিউম্যান রাইটস রিসোর্স সেন্টারের শ্রম অধিকার বিষয়ক সিনিয়র কর্মকর্তা তুলসি নারায়ণাস্বামী বলেন, এই খাতের শ্রমিকরা বেঁচে থাকার মতো বেতন পান না। মাঝে মাঝে তারা কাজ করেন নাজুক পরিবেশে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়ার মতো এশিয়ার অনেক দেশেই সর্বনি¤œ যে বেতন ধরা হয়েছে, তা বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদা পূরণ করে না। তাই তাদের বেশির ভাগই ঋণে আবদ্ধ। দিনে তিনবেলা খাবার যোগানোর সামর্থ নেই তাদের অনেকের। এমনকি অনেকে পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারেন না। শিল্প খাতে তারা হলেন শোষণের এক প্রান্তের মানুষ। তারা অবিশ্বাস্য রকম বেশি সময় কাজ করেন অর্ডার পূর্ণ করতে। এক্ষেত্রে তাদেরকে সময় সীমিত করে দেয়া হয়। এর ফলে কারখানার অগ্নি ঝুঁকি সহ নানারকম নিরাপত্তা পড়ে ঝুঁকিতে। এক্ষেত্রে তিনি ঢাকায় একটি গার্মেন্ট কারখানা ধসে কমপক্ষে এক হাজার মানুষ মারা যাওয়ার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। নারায়ণাস্বামী বলেন, বৈশ্বিক তৈরি পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা যেসব সমস্যার মুখোমুুখি হচ্ছেন তার মূল কারণ হলো, ফ্যাশন ব্রান্ড, সরবরাহকারী ও শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষমতার মারাত্মক ভারসাম্যহীনতা।




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com