বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০১:০৭ অপরাহ্ন




জনপ্রতি চাল ভোগের সঠিক চিত্র বিবিএসের জরিপে আসেনি: ইফপ্রি

খবরপত্র ডেস্ক :
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২০




ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বি আইডিএস) মনে করে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দৈনিক জনপ্রতি চাল ভোগের যে তথ্য দিয়েছে তাতে বাংলাদেশর জনগণের ভোগের সঠিক চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না। চাল উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে বেশ প্রশংসা পেয়েছে। সরকারি তথ্যে দৈনিক জনপ্রতি যে ভোগ দেখানো হচ্ছে তাতে প্রতি বছর ৫০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কিন্তু উদ্বৃত্ত তো থাকছেই না, উল্টো আমদানি করে ঘাটতি মেটাতে হচ্ছে। এ ঘাটতি আরো তীব্র হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে। বিবিএসের তথ্যে জনপ্রতি চাল ভোগের যে পরিমাণ উঠে এসেছে তার সঙ্গে বেশ পার্থক্য রয়েছে ইফপ্রি ও বি আইডিএসের তথ্যের। একজন মানুষ দৈনিক কত গ্রাম চাল ভোগ করে তা নিয়ে একটি জরিপ করেছিল ইফপ্রি। সেই জরিপে তারা দেখিয়েছিল, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে দৈনিক জনপ্রতি চাল ভোগের পরিমাণ ছিল ৩৯৬ দশমিক ৬ গ্রাম, যা ২০১৬ সালেও ছিল ৪২৬ গ্রাম। অন্যদিকে ২০১৬ সালে দৈনিক জনপ্রতি চাল ভোগের পরিমাণ ৪৬০ গ্রাম ছিল বলে তথ্য দিয়েছে বি আইডিএস। যদিও একই বছরে দৈনিক জনপ্রতি চাল ভোগের হিসাব ৩৬৭ গ্রাম দেখানো হয়েছে বিবিএসের সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপে। তিন সংস্থার তথ্যের তুলনা করলে দেখা যায়, জনপ্রতি চাল ভোগের পরিমাণ ইফপ্রির চেয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ এবং বি আইডিএসের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ কম বলে উঠে এসেছে বিবিএসের তথ্যে। চালের মজুদ নিয়ে সঠিক পরিকল্পনার জন্য জনপ্রতি ভোগের সঠিক তথ্য থাকা জরুরি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ভোগের তথ্য অনুযায়ীই চালের চাহিদা নিরূপণ ও মজুদের পরিকল্পনা করা হয়। এক্ষেত্রে সঠিক তথ্য না থাকলে এর প্রভাব গিয়ে পড়ে মজুদ এবং সর্বোপরি বাজারের ওপর।
সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলে সুন্দরভাবে লিখিত পরিকল্পনাও বাস্তবায়নে গলদ দেখা দিতে পারে বলে মনে করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম। তিনি বলেন, জনপ্রতি চালের যে ভোগ দেখানো হচ্ছে তাতে উৎপাদনের তথ্যের সঙ্গে ন্যূনতম ৫০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কিন্তু বাজারের তথ্য সেটি বলছে না। উৎপাদন কিংবা ভোগের তথ্যেও গরমিল রয়েছে। বাজার তথ্যের সঙ্গে আমাদের প্রকাশিত সব তথ্যের মিল থাকা প্রয়োজন। তা না হলে নীতি প্রণয়নে, বিশেষ করে চাল আমদানি কিংবা রফতানির বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া মুশকিল হয়ে পড়বে। চাল উৎপাদন ও ভোগের তথ্যের ক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে পর্যালোচনার প্রয়োজন মনে করলে সেটি বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে চাল আমদানির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে না। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে দেশে দৈনিক জনপ্রতি চাল ভোগের পরিমাণ ছিল ৪১৬ গ্রাম এবং সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ২০১৬ সালে তা ছিল ৩৬৭ দশমিক ২ গ্রাম। এ সময় জনপ্রতি ভোগের পরিমাণ গ্রামে প্রায় ৩৮৬ গ্রাম ও শহরে প্রায় ৩১৭ গ্রাম ছিল।
অন্যদিকে ইফপ্রির জরিপের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ২০১৮ সালে দৈনিক জনপ্রতি চাল ভোগের পরিমাণ ৩৯৬ দশমিক ৬ গ্রামে নেমে এসেছে। যদিও তা ২০১২ সালে প্রায় ৪৬৭ গ্রাম এবং ২০১৬ সালে ছিল প্রায় ৪২৬ গ্রাম।
শহর ও গ্রামে জনপ্রতি চাল ভোগের পরিমাণে কম-বেশি পার্থক্য রয়েছে বলে জানিয়েছে ইফপ্রি। সংস্থাটির তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে গ্রামের মানুষ জনপ্রতি দৈনিক ৪১৭ গ্রাম করে চাল ভোগ করেছে, অন্যদিকে শহরের মানুষ ভোগ করেছে জনপ্রতি ৩৪২ গ্রাম। এ জরিপে ইফপ্রি একজন মানুষ নিজ বাড়িতে ও বাড়ির বাইরে যে খাবার গ্রহণ করে সে তথ্যও বিবেচনায় নিয়েছে। যেমন গ্রামের একজন মানুষ বাড়ির বাইরে দৈনিক গড়ে ১৫ গ্রাম খাবার গ্রহণ করছে, আর নিজ বাড়িতে গ্রহণ করছে ৪০২ গ্রাম। ইফপ্রি বলছে, আগামীতে জনপ্রতি চাল ভোগের পরিমাণ আরো কমে আসবে। সঠিক ভোগের তথ্য বিবেচনায় নিলে আমদানির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে। সঠিক ও নিরাপদ পরিকল্পনার জন্য জনপ্রতি ভোগ ৪৮৯ গ্রামকে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশে ইফপ্রির কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. আখতার আহমেদ বলেন, পদ্ধতিগত কারণে ভোগের তথ্যের পার্থক্য হতে পারে। জনপ্রতি ভোগের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ‘সাপ্তাহিক’ ও ‘২৪ ঘণ্টার’Íএ দুটো জনপ্রিয় পদ্ধতি বিবেচনায় নেয়া হয়। আমরা ভোগের সঠিক তথ্য পাওয়ার জন্য একজন ভোক্তার ২৪ ঘণ্টার খাবারের তথ্য হিসাব করি। সে কখন কী পরিমাণে কী কী ধরনের খাবার গ্রহণ করছে সেটি লিপিবদ্ধ করি। এ পদ্ধতিটা বেশ ব্যয়বহুল হলেও সঠিক পরিমাণটা পাওয়া যায়। কিন্তু অন্য পদ্ধতিতে পরিমাণ কম-বেশি (ওভার কিংবা আন্ডারএস্টিমেট) হওয়ার ঝুঁকি থাকে। জনপ্রতি ভোগের বাইরে চালের আরো বেশকিছু ভোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রাণী খাদ্য হিসেবে চালের কয়েক লাখ টন ভোগ করা হয়। এছাড়া ধান-চাল উৎপাদনের তথ্যটি সাধারণত মাঠ পর্যায়ের হিসাব করা হয়। মাঠের ধান থেকে ভোক্তা পর্যায়ে চাল হয়ে আসতে নানা মাত্রায় পোস্ট ও প্রি-হারভেস্ট লস হয়। সেই ক্ষতির পরিমাণ ৮-১০ শতাংশ পর্যন্ত হয়। এজন্য উৎপাদন ও ভোগ সব ক্ষেত্রেই সঠিক তথ্য থাকাটা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বি আইডিএসের মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদ এ বিষয়ে বলেন, চাল অত্যন্ত সংবেদনশীল কৃষিপণ্য। এ কারণে এটির ভোগ ও উৎপাদনের সঠিক তথ্য থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি জনসংখ্যার তথ্যটিও সঠিকভাবে আসা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা দেখছি, এ তিনটি তথ্যের ক্ষেত্রে বেশ ঘাটতি রয়েছে। চালের জনপ্রতি ভোগ ও জনসংখ্যার তথ্য বিবেচনায় নিলে চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কিন্তু উদ্বৃত্ত থাকছে না, উল্টো মাঝে মধ্যে বেসরকারিভাবে চাল আমদানি হচ্ছে। আমরা চাল উৎপাদনে বৈশ্বিকভাবে শীর্ষ তিনে অবস্থান করছি এবং সরকারিভাবে চাল আমদানি গত কয়েক বছর বন্ধই রয়েছে। তার পরও ভোগের তথ্যের সঙ্গে উৎপাদনের তথ্যের এ গরমিল কমানোর জন্য পর্যালোচনার দাবি রাখে। হিসাব করার ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়াতে হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিটকে (এফপিএমইউ) আরো শক্তিশালী করতে হবে। না হলে কার্যকর মনিটরিং ছাড়াও সঠিক তথ্য ও নীতি গ্রহণ করা দুষ্কর হয়ে পড়বে।




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com