রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ০৪:৪৯ পূর্বাহ্ন




জননেতা তরিকুল ইসলাম

মো: তাইফুল ইসলাম টিপু :
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২০




তরিকুল ইসলাম ছিলেন প্রকৃত গণতন্ত্রে বিশ্বাসী প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ। ছিলেন সৎ ও সাচ্চা দেশপ্রেমিক জননেতা। শত নির্যাতনের মাঝেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন থেকেছেন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস এবং নেতাকর্মীদের প্রতি কমিটমেন্ট তার নেতৃত্বকে উদ্ভাসিত করেছে। তিনি দলমত নির্বশেষে সর্বমহলে ছিলেন জনপ্রিয়। ছিলেন স্বাধীন মতপ্রকাশে বিশ্বাসী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বও। ছাত্রজীবনেই তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি। প্রকৃত রাজনীতিবিদের যে গুণাবলি থাকা দরকার তরিকুল ইসলামের মাঝে কোনোটারই কমতি ছিল না; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশিই ছিল। তরিকুল ইসলাম ১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর যশোর শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ব্যবসায়ী আলহাজ আবদুল আজিজ ও মা গৃহিণী মোসাম্মৎ নূরজাহান বেগম। স্ত্রী নার্গিস ইসলাম তার অন্যতম রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও যশোর সরকারি সিটি কলেজে সাবেক উপাধ্যক্ষ। ছাত্রজীবনে নার্গিস ইসলাম রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। বিয়ের পর তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও স্বামী তরিকুলের মৃত্যুর পর নেতাকর্মীদের চাপে তাকে রাজনীতিতে আসতে হয়েছে। তিনি বর্তমানে যশোর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক।
১৯৬১ সালে তরিকুল ইসলাম, যশোর জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা, ১৯৬৩ সালে যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয় থেকে আইএ এবং ১৯৬৮ সালে একই কলেজ থেকে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) পাস করেন। ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে তার রাজনীতি শুরু। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে তিনি এমএম কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বৃহত্তর যশোর জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতিও ছিলেন। ১৯৬৩ সালে সর্বক্ষেত্রে রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ১৯৬৪ সালে তিনি তৎকালীন মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচনে পাকিস্তান মুসলিম লীগের বিপরীতে ফাতেমা জিন্নাহর অনুকূলে জনমত সৃষ্টির জন্য গ্রামে গ্রামে মানুষকে সংগঠিত করেন। রাজনৈতিক জীবনে তরিকুল ইসলাম বহুবার কারাবরণ করেন ও নির্যাতনের শিকার হন। যশোর এমএম কলেজে শহীদ মিনার তৈরির উদ্যোগ নিতে গিয়ে এবং ১৯৬৬ সালে স্থানীয় এমএনএর দায়ের করা মিথ্যা মামলায় তাকে বেশ কিছুদিন কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬৮ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের জন্যও কারাবরণ করেন তিনি। পাকিস্তান আমল ও পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছাত্র গণআন্দোলনে নেতৃত্বদানের জন্য পুলিশ কর্তৃক নির্যাতিত হন এবং বেশ কিছুদিন হাজতবাস করেন। জাতীয় রাজনীতিতে তরিকুল ইসলাম ছিলেন প্রথম সারির নেতা। ১৯৭০ সালে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। মওলানা ভাসানী আহুত ফারাক্কা লংমার্চে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বীরত্বের সাথে দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করেন। ১৯৭৩ সালে যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান ১৯৭৮ সালে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ শাসনামলে তিন মাস কারাভোগ করেন।
ন্যাপ (ভাসানী) বিলুপ্ত হলে তিনি ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির বৃহত্তর যশোর জেলা শাখার আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যশোর সদর নির্বাচনী এলাকা (যশোর-৩) থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটিতে বিশেষ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যে সারাজীবনই রাজনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন তার প্রমাণ-সেই সময় একটি দলীয় মিটিংয়ে দলের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, সবাই মন্ত্রী হতে চায়, দল করবে কে? তখন তরিকুল ইসলাম দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আমি দল করতে চাই’। ১৯৮২ সালের ৫ মার্চ বিচারপতি সাত্তারের মন্ত্রিপরিষদে তরিকুল ইসলাম সড়ক ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।
১৯৮২ সালে স্বৈরাচার এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর তরিকুল ইসলাম কারারুদ্ধ হন। দীর্ঘ তিন মাস তাকে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে প্রতিদিন তার হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে অকথ্য নির্যাতন করা হয়। তার চোখে-মুখে গরম পানি ঢেলে দেয়াসহ সব দাঁত উপড়িয়ে ফেলা হয়। শুধু তরিকুল ইসলামকে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগদানে রাজি করাতেই এসব ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়। ওই নির্যাতনের ভয়াবহতা এমনই ছিল যে, সেই সময় কারাগারে তার সদস্যরা প্রথম দর্শনে তাকে চিনতে পর্যন্ত পারেননি। তার মুখসহ সারা শরীর ছিল ক্ষতবিক্ষত। কিন্তু তিনি এত নির্যাতনের পরও তার রাজনৈতিক নীতি ও আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। অতঃপর তথাকথিত এরশাদ হত্যা প্রচেষ্টা মামলার প্রধান আসামি হিসেবে দীর্ঘ ৯ মাস ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ থাকেন। সেখানেও তাকে নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়। জেলখানা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তৎকালীন যে কয়জন নেতা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দল এবং দেশের প্রয়োজনে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে উৎসাহিত করেছেন তার মধ্যে তরিকুল ইসলাম অন্যতম।
তিনি সব ধরনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বেগম খালেদা জিয়ার পাশে থেকেছেন। ১৯৮৬ সালে তরিকুল ইসলামকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়। এ সময় তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৯০-এর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তরিকুল ইসলাম। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উত্তরণের পর ১৯৯১-এর সংসদ নির্বাচনে তাকে ১০৩ ভোটে পরাজিত দেখানো হলেও পুনর্গণনায় তিনি বিজয়ী হন। কিন্তু ওই নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়। সে সময় অনেকেই মন্ত্রী হওয়ার জন্য তদবিরে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এখানেও তরিকুল ইসলাম ছিলেন ব্যতিক্রম। কিন্তু তার অবদান বেগম খালেদা জিয়া ভুলে যাননি। তরিকুল ইসলামের প্রতি শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা থেকে তাকে ১৯৯১ সালে সরকারের সমাজকল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং ১৯৯২ সালে ওই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেন। এ সময় তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি ওই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ১৯৯৪ সালের উপ-নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি যশোর-৩ আসনের এমপি নির্বাচিত হন। বিএনপির মন্ত্রিপরিষদে তিনি খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন। পরে তথ্য মন্ত্রণালয় এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত দলের পঞ্চম কাউন্সিলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ পান। তিনি কখনোই পদের জন্য রাজনীতি করেনি। তার প্রমাণ, ১৯৮৮ সালে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাকে বিএনপির মহাসচিব হওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। ওই সময়ে তার ঢাকায় নিজের কোনো বাড়ি-গাড়ি না থাকায় তিনি সেই প্রস্তাব বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। তার জন্য সেই ব্যবস্থাও করতে চেয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। শীর্ষ নেতৃত্বকে ওয়াদা করে তরিকুল বলেছিলেন, ‘আমি যেখানেই থাকি, আমার ওপর অর্পিত সব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করব।’ ২০০৯ সালে জাতীয় কাউন্সিলের সময় তাকে আবারো মহাসচিব করার বিষয়ে আলোচনা শুরু হলে তিনি অ্যাডভোকেট খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে সাথে নিয়ে গিয়ে দলের চেয়ারপারসনকে বলেছিলেন, ‘দলের দুঃসময়ে খোন্দকার সাহেব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। তাই তাকেই মহাসচিব রাখা হোক।’
তরিকুল ইসলাম সদালাপী ও জনবান্ধব নেতা ছিলেন। তার সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল অপরিসীম। কর্মীদের প্রতি ভালোবাসা ছিল অগাধ। কাউকে কখনো কোনো দায়িত্ব দিলে তার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সার্বক্ষণিক খবর রাখতেন। তিনি একজন নির্লোভ সাদামাটা প্রকৃতির নেতা ছিলেন। চারবার মন্ত্রী থাকার পরও ঢাকা শহরে একটি সীমিত আকারের ফ্ল্যাট ছাড়া তার আর কিছুই নেই। রাজনৈতিক কারণে পারিবারিক ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়েছে। তিনি কখনোই স্বজনপ্রীতিকে প্রশ্রয় দিতেন না। এর উদাহরণ মিলে তার ছেলেকে গত ২০১৬ সালের কাউন্সিলে পদ দেয়ার বিষয়ে তার সম্মতি নিতে অনেক নেতাই চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিনি সম্মতি দেননি।
তরিকুল ইসলামের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ছিল অনন্য। ওয়ান-ইলেভেনের তথাকথিত সরকার যখন জিয়া পরিবারকে রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করার প্রক্রিয়া শুরু করে তখন সেই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করার কারণে তাকে কারাগারে নেয়া হয়েছিল। কারাগারে সবাই যখন উদ্বিগ্ন তখন তিনি বলতেন, দুই বছরের বেশি এই সরকার টিকে থাকতে পারবে না। ঠিক তেমনটাই হয়েছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তথা জিয়া পরিবারের প্রতি তার আনুগত্য ছিল অপরিসীম এবং তা আমৃত্যু অটুট ছিল। লেখক : সহ-দফতর সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল।




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com