বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ১০:৩৯ অপরাহ্ন




ইউনিট বিলুপ্তির সুফল পাবে শিক্ষার্থীরা: ঢাবি উপাচার্য

খবরপত্র ডেস্ক:
  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ১০ নভেম্বর, ২০২০




২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান (ঘ) এবং চারুকলা (চ) ইউনিট বিলুপ্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিনদের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট আলোচনা ছাড়াই বিলুপ্তির সুপারিশ করায় চরম সমালোচনার মুখে পড়েছেন উপাচার্য। ওই দুই ইউনিটের ডিনদের অভিযোগ, আলোচ্যসূচিতে না রেখে গত রবিবার ডিনস কমিটির মিটিংয়ে তড়িঘড়ি করে ঘ ও চ ইউনিট বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পক্ষে দিনভর যুক্তি দিয়ে নানা পোস্ট দিয়েছেন। সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিজেদের করণীয় ঠিক করতে শিক্ষকরাও নানা সভা করেছেন।
তারা বলছেন, শিক্ষক ও অনুষদের সঙ্গে পূর্বালোচনা ছাড়া ডিনস কমিটির মিটিংয়ে হুট করে এ ধরনের পরামর্শ দেওয়া একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলছেন, এটি নতুন কোনও আলাপ নয়। ২০১৮ সাল থেকেই এই আলাপ চলছে। শিক্ষার্থীরা যাতে আর্থিকভাবে লাভবান হয়, সে কারণে পরীক্ষা কমিয়ে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। আলোচ্যসূচির বহির্ভূত কিছুই ছিল না। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা কমানোর সুপারিশ করেছে অনুষদের ডিনরা।
প্রসঙ্গত, রবিবার (৮ নভেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমিটির মিটিংয়ে ঘ ও চ ইউনিট বিলুপ্ত করে মাত্র তিনটি ইউনিটে (বিজ্ঞান, কলা, বাণিজ্য) ভর্তি নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়। তবে এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের মিটিংয়ে বিষয়টি মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত হবে। চূড়ান্ত হলে আগামী শিক্ষাবর্ষ (২০২১-২০২২) থেকে এটি কার্যকর হবে। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির সুবিধার্থে এক বছর আগ থেকে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, এ বছর আগের নিয়মেই পরীক্ষা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শরীফুল হাসান ফেসবুকে ওই সুপারিশের প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেছেন, ‘আমাদের দেশের বহু ছেলেমেয়ে বিজ্ঞান, কলা কিংবা ব্যবসা শাখা নেয় বাবা-মা বা স্কুলের শিক্ষকদের কারণে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসে অনেকেই এখান থেকে বেরিয়ে আসার স্বাধীনতা পায়।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমি বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। ক এবং ঘ দুই ইউনিটেই উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। আট মাস গণিতে ক্লাস করে জার্নালিজমে ফিরে এসেছিলাম ঘ ইউনিটে উত্তীর্ণ হবার সুবাদে। আমার জীবনের একমাত্র ভালো সিদ্ধান্ত বলে মনে করি। গণিতে আমার এসএসসি, এইচএসসি-তে খুব ভালো নম্বর এবং ক ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় গণিতে পূর্ণমান পেলেও আমি জানতাম গণিতে আমার স্বতঃস্ফূর্ত ঝোঁক নেই, ভাষা, সাহিত্য বা সামাজিক চিন্তনে যেমন আছে। তাই বাসায় না জানিয়েই যথেষ্ট ঝুঁকি নিয়ে বছরের একেবারে শেষে জার্নালিজমে ফিরে এসেছি। সেটা সম্ভব হয়েছিল ঘ ইউনিটে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ ছিল বলেই।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘এই ইউনিট থাকা মানে শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয়বারের মতো পরীক্ষায় বসার সুযোগ। কলা, বিজ্ঞান, বাণিজ্যÍমোটাদাগে এই তিন অনুষদের বাইরেও অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র, যোগাযোগ, উন্নয়ন, জনপ্রশাসন অর্থাৎ সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নানা স্তরের পাঠ ও অনুধ্যানের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারা। সারা পৃথিবীতে যখন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অন্তর্গত বিষয়গুলোকে অধিকতর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে, এমনকি বিজ্ঞানের অনেক বিষয়কে সামাজিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সংযুক্ত করে পড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমিটির এই সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছি।
ঘ ইউনিটে পরীক্ষা অত্যন্ত পুরনো। হঠাৎ এমন কী ঘটলো যে এক মিটিংয়ে ডিনস কমিটি এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো! বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করেই এক মিটিংয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়! আশ্চর্য!’
অধ্যাপক কাবেরী গায়েন বলেন, ‘সামাজিক বিজ্ঞান, কলা, বিজ্ঞান, বাণিজ্য সব অনুষদের শিক্ষার্থীদের ধারণ করে এক স্বতন্ত্র অনুষদ। তাই তার নিজস্ব শিক্ষার্থী বেছে নেবার রয়েছে পূর্ণ অধিকার। সেদিক থেকে ঘ ইউনিটে পরীক্ষা বাতিল করার ডিনস কমিটির সিদ্ধান্ত বিবেচনাপ্রসূত বলা সম্ভব হচ্ছে না।’
সূত্রে জানা গেছে, মূলত শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে এবং করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ৭৩-এর আদেশভুক্ত চার বিশ্ববিদ্যালয়কে (ঢাবি, জাবি, চবি, রাবি) একসঙ্গে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজস্ব নিয়মের মধ্যে আগের মতো ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আর বিভাগভিত্তিক কেন্দ্র করা, পরীক্ষার সংখ্যা পাঁচ ইউনিট থেকে কমিয়ে তিন ইউনিটে নেওয়ার কথা ভাবে প্রশাসন।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, ‘ঘ ইউনিটের পরীক্ষা বাতিলের বিষয়টি এজেন্ডার মধ্যে ছিল না। তড়িঘড়ি করেই উপাচার্য বিষয়টি আলোচনা করেছেন। আমি এরসঙ্গে একমত হইনি। অনুষদের শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরে আমাদের অবস্থান জানাবো।’
চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, ‘রবিবারের ডিনস কমিটির মিটিংয়ে ইউনিট বাতিলের বিষয়টি এজেন্ডাভুক্ত ছিল না । মিটিংয়ের শেষের দিকে হঠাৎ উপাচার্য মহোদয় বললেন, শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমানোর জন্য আমরা ইউনিটগুলো ভবিষ্যতে কমিয়ে আনবো। এটি বলতে গিয়ে শুধু (ঘ) ইউনিটের কথা আলোচনা হলো। তখন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম বললেন তিনি এর সঙ্গে একমত নন। অন্য ডিনরা উপাচার্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। চ ইউনিট নিয়ে ওইদিন কোনও আলোচনায় হয়নি। কিন্তু আজ (৯ নভেম্বর) দেখলাম উপাচার্য ডিনদের একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। সেখানে চারুকলা, নৃত্যকলা, সংগীত নাট্যকলার বিষয়গুলোকে সৃজনশীল উল্লেখ করে এসব বিষয়ে কীভাবে মেধাবীদের আমরা মূল্যায়ন করতে পারি, সেটার একটি কৌশল বের করা হবে বলে জানান তিনি। এরকম হলে আমার কোনও আপত্তি নেই। চারুকলার ক্ষেত্রে ইউনিট করা হোক বা না হোক সেটি নিয়ে মাথাব্যথা নেই। আমার মাথাব্যথা হলো সঠিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিতে হবে। এখন শুধু তিনটি ইউনিটে পরীক্ষা নেওয়া হলে আপত্তি নেই।’
জানা গেছে, শুধু তিনটি ইউনিটের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়ার কথা ভাবছে প্রশাসন। ঘ ইউনিটের মাধ্যমে বিভাগ পরিবর্তনের জন্য আলাদা পরীক্ষা নেওয়া হয়। তবে, এটি বিলুপ্ত হলেও বিভাগ পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে। চারুকলা (চ) ইউনিটের এবং নৃত্যকলা, নাট্যকলা, সংগীত এসব বিভাগের জন্য নিয়মনীতি প্রণয়ন করার কথাও জানায় কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘পরীক্ষা সংক্রান্ত পূর্ব পর্যালোচনার মধ্যেই বিষয়টি ছিল ইউনিট বাতিলের আলোচনা নতুন নয়। ২০১৮ সাল থেকে হয়ে আসছে। কারণ কলা অনুষদ এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন প্রায় একই। সুতরাং ডিনরা একই ধরনের প্রশ্নে দুটি পরীক্ষার বিষয়ে দ্বিমত দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের হয়রানি কমানোর জন্যই পরীক্ষা কমানোর দিকে যাচ্ছি। এর সুফল তারা পাবে।’




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com