শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৯:৪১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম ::
তারেক রহমান দেশে ফিরছেন ২৫ ডিসেম্বর বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ পাহাড়ি জনপদ কাশেম নগরের রহস্যঘেরা বাংলোবাড়ি এখন থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারিতে গজারিয়ায় বেগম খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি ও সুস্থতা কামনায় শীতবস্ত্র বিতরণ বগুড়া সদরে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ রায়পুরে দায়িত্বরত গ্রাম পুলিশের পোশাক ছিঁড়ে মারধর আহত দুই শেরপুরে সংসদ সদস্য প্রার্থীদের নিয়ে আন্তঃদলীয় সম্প্রীতি সংলাপ সভাপতি মিজান, সাধারণ সম্পাদক মন্টু ফুলবাড়ীতে ৪টি ইটভাটায় অভিযানে ৬ লাখ টাকা জরিমানা দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সুফিবাদী উদারধারার মানবিক ইসলামের প্রসার ঘটাতে হবে লালমোহনে নবনির্মিত সড়কের উদ্বোধন করলেন জেলা প্রশাসক

যে সভ্যতায় যুদ্ধেও জেগে থাকে মানবতা

শাব্বির আহমদ:
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৫

মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ যেন এক অনিবার্য বাস্তবতা। আধুনিক পৃথিবী যতই শান্তির ভাষা উচ্চারণ করুক না কেন, গাজা, কাশ্মীর, সিরিয়া কিংবা ইউক্রেন; সব জায়গায় প্রতিনিয়ম শুঁকতে হচ্ছে তাজারক্ত ও বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধ। মানবাধিকারের বুলি আওড়ানো বড় শক্তিগুলো একদিকে বিশ্বকে শোনায় শান্তির বাণী, অন্যদিকে নিজের কথার বাইরে এদিক সেদিক হলেই সেই অঞ্চলের মাটি ভিজিয়ে দেয় কোমলমতি নিষ্পাপ শিশু, অসহায় নারী ও দুর্বল বৃদ্ধের রক্ত দিয়ে। এই দ্বিচারিতার যুগে ইসলামী মানবাধিকারনীতিই একমাত্র মত ও পথ।
যা মানবতার জন্য স্থায়ী সমাধানের দিগন্ত উন্মোচন করে, যেখানে যুদ্ধও পরিচালিত হয় সীমার মধ্যে, শান্তিও প্রতিষ্ঠা হয় ন্যায়ের ভিত্তিতে।
মানবাধিকারের আল্লাহ প্রদত্ত ধারণা
ইসলামের দৃষ্টিতে মানবাধিকার কোনো মানুষের বানানো ধারণা নয়; এটি মহান আল্লাহ প্রদত্ত একটি বিধান। পবিত্র কোরআনের ভাষায়, ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১)
এ আয়াত মানবসমতার মূল সূত্র।
মানুষের জাত, বর্ণ, ভাষা বা অবস্থান নয়; বরং আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে সকল মানুষ সম্মানিত। এজন্যই পবিত্র কোরআন ঘোষণা করে, ‘আর আমরা অবশ্যই আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি, তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদেরকে উত্তম জিনিসপত্র থেকে রিযিক দিয়েছি এবং তাদেরকে আমাদের অনেক সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই নীতির বাস্তব রূপ দেন তাঁর বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে, যেখানে তিনি বলেন— ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের ইজ্জত তোমাদের জন্য হারাম; যেমন এ দিন, এ মাস ও এ স্থান হারাম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭৩৯)
এ ঘোষণাই ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, যা জাতি-রাষ্ট্র, ধর্ম ও সীমারেখার ঊর্ধ্বে মানবিক মর্যাদার ঘোষণা দিয়েছে।
শান্তিকালে মানবাধিকারের রূপরেখা
ইসলামে শান্তিকালেই মানবাধিকার সবচেয়ে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়। মুসলিম রাষ্ট্রে শুধু মুসলমান নয়, অমুসলিম নাগরিকও নিরাপদ। মহানবী (সা.) বলেন, ‘সাবধান! যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির (অমুসলিম নাগরিক) উপর জুলুম করবে বা তার প্রাপ্য কম দিবে কিংবা তাকে তার সামর্থের বাইরে কিছু করতে বাধ্য করবে অথবা তার সন্তুষ্টিমূলক সম্মতি ছাড়া তার কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষে বাদী হবো।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৩০৫২)
এই নীতি মধ্যযুগের ইউরোপে ছিল অকল্পনীয়। ইসলামী শাসনে অমুসলিমদের উপাসনালয়, সম্পদ, এমনকি ব্যক্তিস্বাধীনতাও রক্ষা করা হতো। নারীর মর্যাদা, শ্রমিকের অধিকার, শিক্ষার সুযোগ, ন্যায্য বিচার; সবই ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক মানবাধিকার কাঠামোর অংশ।
যুদ্ধেও ইসলামের উদার মানবিকতা
ইসলাম যুদ্ধকে কখনোই আগ্রাসন বা লালসার হাতিয়ার হিসেবে দেখেনি। যুদ্ধ শুধুই আত্মরক্ষা, নিপীড়ন-প্রতিরোধ বা ন্যায়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যম। পবিত্র কোরআন ঘোষণা করে, ‘যে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরাও আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো; কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৯০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবারা যুদ্ধে প্রবেশের আগে কঠোরভাবে নির্দেশ দিতেন—
‘তোমরা কোনো নারী, শিশু বা বৃদ্ধকে হত্যা করো না; ফলবান গাছ কেটো না, বসতবাড়ি ধ্বংস করো না; কোনো ছাগল বা উট জবাই কোরো না, যদি না তা খাওয়ার জন্য হয়। তোমরা এমন কিছু মানুষ পাবে যারা মঠে আত্মনিয়োগ করেছে (ধর্মযাজক), তাদের ছেড়ে দিও।’ (মুয়াত্তা মালিক, হাদিস: ৯৭২; আল-বায়হাকি, সুনানুল কুবরা, ৯/৮৪)
এটাই ছিল ইসলামী যুদ্ধনীতির মানবিক মুখ। বন্দীদেরও মানবিক মর্যাদা দেওয়া হতো। পবিত্র কোরআন বন্দীদের সম্পর্কে বলে, ‘তারা খাদ্য দেয় নিজেদের ভালোবাসার কারণে দরিদ্র, ইয়াতিম ও বন্দীদের।’ (সূরা আদ-দাহর, আয়াত : ৮)
বদরযুদ্ধের বন্দীদের কেউ শিক্ষা দিয়ে মুক্তি পেয়েছিলেন, কউকে দয়া করে নিঃস্বার্থভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কনভেনশন (Geneva Convention) যে নীতির উপর দাঁড়িয়েছে, তা মহানবী (সা.)-এর এই প্রবর্তিত নীতিরই প্রতিধ্বনি।
শান্তির প্রস্তাব পেলে যুদ্ধবিরতি বাধ্যতামূলক
ইসলামী নীতি যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত নয়, বরং সংক্ষিপ্ত করতে চায়। পবিত্র কোরআনের নির্দেশ- ‘যদি তারা শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তুমিও শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ো এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখো।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ৬১)
অর্থাৎ প্রতিপক্ষ শান্তির ইঙ্গিত দিলেই মুসলমানের দায়িত্ব হচ্ছে- অস্ত্র নামিয়ে শান্তির পথ বেছে নেওয়া। এই নীতি আজকের বিশ্বরাজনীতিতে অনুপস্থিত। এখানে শান্তি নয়, বরং স্বার্থই একমাত্র মাপকাঠি।
ইসলাম বনাম আধুনিক মানবাধিকার
জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (UDHR, ১৯৪৮) যে মৌলিক অধিকারের কথা বলে সেগুলো হচ্ছে- “জীবন, সম্পদ, ধর্ম, মতপ্রকাশ ও ন্যায়বিচার”। অথচ ইসলাম চৌদ্দশ বছর আগে সেগুলোকে আল্লাহপ্রদত্ত দায় বা প্রতিটি ব্যক্তির অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে।
আধুনিক মানবাধিকার দর্শন ‘স্বাধীনতা’কে কেন্দ্রে রাখে, কিন্তু ইসলামী দর্শনে মূল কেন্দ্র দায়িত্ব ও নৈতিক সীমা। কারণ সীমাহীন স্বাধীনতা মানবতার বিনাশ ডেকে আনে, অথচ দায়িত্বনির্ভর স্বাধীনতা সমাজে এনে দেয় স্থিতি।
আধুনিক বাস্তবতায় ইসলামী মানবতার প্রাসঙ্গিকতা
আজকের পৃথিবীতে যখন “মানবাধিকার” রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে গেছে, তখন ইসলামী দৃষ্টিকোণই প্রকৃত মুক্তির পথ দেখায়। গাজায় শিশু হত্যার পরও বিশ্ব নীরব, কিন্তু মহানবী (সা.) যুদ্ধের ময়দানে এক শিশুর মৃতদেহ দেখে কেঁদে উঠেছিলেন। এ দৃশ্যই মানবিকতার সর্বোচ্চ রূপ।
ইসলাম শেখায়—শত্রুও মানুষ, আর মানুষ মানেই মর্যাদাপূর্ণ সৃষ্টির প্রতিনিধি। এজন্যই ইসলামী সভ্যতা যুদ্ধেও শিল্প, সংস্কৃতি, জ্ঞান ও ন্যায়বিচারের প্রসার ঘটিয়েছে।
খলিফা উমর (রা.) জেরুজালেম জয় করে শত্রুর ঘরে প্রবেশের সময় কোনো সৈনিককে লুটতরাজ করতে দেননি; বরং গির্জায় নামাজ না পড়ে তা সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। যেন ভবিষ্যতে মুসলমানরা দখল না নেয়।
এটি ইতিহাসে মানবাধিকারের সবচেয়ে জীবন্ত দলিল।
ইসলাম শুধু শান্তির ধর্ম নয়, বরং ইসলাম ন্যায়নিষ্ঠা ও শান্তির ধর্ম। যুদ্ধের মধ্যেও ইসলাম মানবতার মর্যাদা রক্ষা করেছে, শান্তির সময় তা পূর্ণতা দিয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন— ‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে যুদ্ধে জয়ী হয়; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)
আজকের বিশ্বে ইসলামী মানবাধিকারনীতি শুধুই ইতিহাস নয়, এটি ভবিষ্যতের ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ সভ্যতার ভিত্তি। মানুষ তখনই প্রকৃত নিরাপত্তা পাবে, যখন মানবাধিকার কোনো মানবনির্মিত চুক্তি নয়, বরং আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হবে।




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com