পরিবার হলো মানবসমাজের প্রথম প্রতিষ্ঠান, যেখানে ভালোবাসা, দায়িত্ব ও বিশ্বাস একত্রে গড়ে তোলে নৈতিক ভিত্তি। ইসলাম এই ভিত্তিকে সুদৃঢ় করতে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও পারস্পরিক কর্তব্য নির্ধারণ করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো—ভারসাম্যপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ পারিবারিক জীবন।
দায়িত্বের স্বাভাবিক পার্থক্য
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পুরুষগণ নারীদের অভিভাবক, কারণ আল্লাহ তাদের একাংশকে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে।
’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত : ৩৪)
অতএব, পরিবারের উপার্জন, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ পুরুষের দায়িত্ব। তবে এর অর্থ এই নয় যে, পুরুষ কর্তৃত্ব করবে; বরং সে একজন রক্ষক, অভিভাবক ও সহযোগী।
ইমাম আল-গায্জালী বলেন, “স্বামী পরিবারে নেতা, কিন্তু সে একনায়ক নয়। বরং দায়িত্বশীল অভিভাবক, যে ভালোবাসা ও পরামর্শের মাধ্যমে পরিবার পরিচালনা করে।
”নারীর ভূমিকা ও মর্যাদা
নারীকে ইসলাম গৃহের নৈতিক ও মানসিক ভারসাম্যের কেন্দ্র হিসেবে সম্মান দিয়েছে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘নারী তার স্বামীর গৃহে অভিভাবক, এবং তার দায়িত্বাধীন বিষয়ে সে জবাবদিহি করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯৩)
অর্থাৎ, ঘরকে নৈতিক ও আবেগীয় নিরাপত্তার আশ্রয়ে পরিণত করা নারীর দায়িত্ব। ইমাম ইবনে কাসির ব্যাখ্যা করেন—“পুরুষ রক্ষা করে বাহ্যিক নিরাপত্তা, নারী সংরক্ষণ করে অন্তরের প্রশান্তি।
”পারস্পরিক সমঝোতা
ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে সমান মর্যাদা দিয়েছে, দায়িত্ব আলাদা করেছে স্বভাব ও ভূমিকার কারণে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “বিশ্বাসী নারী ও বিশ্বাসী পুরুষ একে অপরের সহযোগী; তারা সৎকাজে উৎসাহ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা আত-তাওবা, আয়াত : ৭১)
এই আয়াত পারিবারিক জীবনের মূল দর্শন তুলে ধরে—পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা, দয়া ও সহযোগিতা।
সন্তান প্রতিপালনে যৌথ দায়িত্ব
পিতা-মাতা উভয়ের দায়িত্ব সন্তানকে ঈমান, নৈতিকতা ও শিক্ষার আলোয় বড় করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করবে।
” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯৩)
ইমাম নববী বলেন, “যে পরিবারে পিতা-মাতা দু’জনই দায়িত্ব পালন করে, সে পরিবারে সন্তানরা হয় সমাজের নৈতিক সম্পদ।”
ইসলামী ভারসাম্যের দৃষ্টি
আজকের যুগে নারী-পুরুষের দায়িত্বের প্রশ্নে অনেকে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। কেউ নারীর স্বাধীনতাকে দায়িত্বহীনতা মনে করে, কেউ আবার দায়িত্বকে বঞ্চনা ভাবে। কিন্তু ইসলাম শিক্ষা দেয়—স্বাধীনতা ও দায়িত্ব একই মুদ্রার দুই পিঠ।
সাইয়িদ কুতুব বলেন, “ইসলাম এমন এক পরিবারের কথা বলে যেখানে ভালোবাসা নেতৃত্ব দেয়, দায়িত্ব নয়; আর পরস্পর শ্রদ্ধা বোঝাপড়ার চেয়ে শক্তিশালী বন্ধন।”
পরিবারে ইসলামী ভারসাম্যের অর্থ হলো—পুরুষ ও নারী উভয়েই একে অপরের অধিকার রক্ষা করবে, দায়িত্ব পালন করবে, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একসঙ্গে জীবন গড়ে তুলবে।
পবিত্র কোরআনের ভাষায়— “তোমরা একে অপরের জন্য পোশাকস্বরূপ।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত :১৮৭)
এই আয়াতের মধ্যেই নিহিত আছে ইসলামী পারিবারিক জীবনের মহত্তম শিক্ষা—ভালোবাসা, দায়িত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের পবিত্র ভারসাম্য।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com