তাকওয়া বা পরহেজগারী মূলত আল্লাহকে ভয় করার নাম। আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমের বিভিন্ন আয়াতে তাকওয়া অবলম্বনের কথা বলেছেন। যার যত বেশি তাকওয়া, সে আল্লাহর কাছে তত বেশি মর্যাদাবান। তাই ছোট-বড় সব প্রজন্মকেই তাকওয়ার শিক্ষা দেওয়া জরুরি। কেননা, খাঁটি মুসলিম হওয়ার অন্যতম উপায় হচ্ছে তাকওয়া। কুরআনুল কারিমের একটি সতর্কতামূলক আয়াতে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—
‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর এবং তোমরা আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১০২)
এছাড়া, আল্লাহ তাআলা আরও একটি আয়াতে বলেন
‘আসমান ও জমিনে যা আছে সব আল্লাহরই; তোমাদের আগে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকেও নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। আর তোমরা কুফরি করলেও আসমানে যা আছে ও জমিনে যা আছে তা সবই আল্লাহর এবং আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসাভাজন।’ (সুরা নিসা: আয়াত ১৩১)
তাকওয়া বা আল্লাহকে ভয় করা শুধুমাত্র উপদেশ নয়; এটি আগের এবং পরবর্তী সব নবি-রাসুলের উম্মতের জন্য ফরজ ছিল। তাই উম্মতে মুহাম্মাদির সবার জন্যও তাকওয়া অবলম্বন করা আবশ্যক।
তাকওয়ার মূল কথা
আল্লাহ তাআলার অসিয়ত বা নির্দেশ হচ্ছে তাকওয়া অবলম্বন করা, তার আদেশ মেনে চলা এবং তার নিষেধকৃত বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকা। কুরআনে আরও উল্লেখ রয়েছে—
‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রত্যেকেরই ভেবে দেখা জরুরি যে, আগামীকালের (কেয়ামতের) জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কাজের সব কিছু জানেন।’ (সুরা হাশর: আয়াত ১৮)
হাদিসে প্রিয়নবী (সা.) তার উম্মতকে তাকওয়া অবলম্বন করার ব্যাপারে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। একটি ঘটনার মধ্যে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদের নামাজ শেষে একটি হৃদয়স্পর্শী ভাষণ দিলেন, যা শুনে সাহাবাদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল এবং হৃদয়ে কম্পন শুরু হল। তখন সাহাবারা আবেদন করলেন—
‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! মনে হচ্ছে, এটা যেন আপনার বিদায়ী ভাষণ! সুতরাং আপনি আমাদেরকে কিছু উপদেশ দিন।’ এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন
‘আমি তোমাদেরকে অসিয়ত করছি আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করার জন্য এবং তোমাদের নেতাদের আনুগত্য করার জন্য।’ (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ)
এটি কেবল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে নয়, বরং এটি মানবজাতির জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অসিয়ত। আগের ও পরের সকল নবি-রাসুলও তাদের উম্মতদেরকে তাকওয়ার অসিয়ত করেছেন। এমনকি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি কখনো কোনো সেনাদল পাঠাতেন, তখন তাদেরকেও তাকওয়ার অসিয়ত করতেন। (মুসলিম, আবু দাউদ)
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে অসিয়ত চাইলে তিনি বললেন, ‘তোমার কর্তব্য হবে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করা। আর তুমি প্রতিটি উঁচুস্থানে উঠা বা উল্লেখযোগ্য স্থানে তাকবির বা আল্লাহর শ্ৰেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা।’ (তিরমিজি, মুসনাদে আহমাদ)
তাকওয়ার আবেদন
তাকওয়া শুধুমাত্র মানুষের জন্য নয়, বরং পুরো সৃষ্টিজগতই আল্লাহকে ভয় করে। তাই, তাকওয়া ছিল আগের এবং পরবর্তী সব নবি-রাসুলের উম্মতের জন্য ফরজ, এবং এটি এখনো উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য আবশ্যক। এটি মানুষের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ অসিয়ত ও আমল, যা মানুষকে পাপাচার থেকে মুক্ত রাখবে। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে, তার মাধ্যমে কখনো অন্যায় সংঘটিত হবে না।
মুসলিম জীবনে তাকওয়ার প্রভাব
তাকওয়া মানুষের জীবনকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায় এবং তাকে খাঁটি মুসলমান হিসেবে গড়ে তোলে। তাই মুমিন মুসলমানের উচিত, আল্লাহর কাছে অধিকতর ভয় কামনা করা, যাতে তার অন্তরে আল্লাহর ভয় জেগে ওঠে। হাদিসে এমনই একটি দোয়া এসেছে, যা আমাদের দোয়া হিসেবে বলার জন্য উপযুক্ত—
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা; ওয়াত তুক্বা; ওয়াল আফাফা; ওয়াল গিনা।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে হেদায়েত, তাকওয়া, নৈতিক পবিত্রতা এবং সম্পদ কামনা করছি।’ (মুসলিম, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ)
তাকওয়া বা আল্লাহকে ভয় করা শুধুমাত্র একটি উপদেশ নয়, বরং এটি মুসলিম জীবনের মূল বিষয়। এর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি, পাপ থেকে বাঁচতে পারি এবং সত্যিকারভাবে মুসলিম হয়ে উঠতে পারি। সুতরাং, মুসলিমদের উচিত আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে নিজের জীবনকে পরিশুদ্ধ করা।