বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী ২০২১, ০৪:০৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম ::
টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পিকআপ থেকে ব্যবসায়ীদের ফেলে দিতো ওরা  করোনার করাল গ্রাসে নিম্ন আয়ের মানুষ টাইম স্কেলের মামলা ৩ সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ ৩ কোটি ডোজ করোনা ভ্যাকসিন সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান : প্রধানমন্ত্রী সেবাকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতে হবে : সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান গরিবদের আগে করোনা ভ্যাকসিন দিয়ে সরকার দেখবে মানুষ বাঁচে না মরে: রুহুল কবির রিজভী আগ্রহী হলে বিএনপিকে যেন আগে ভ্যাকসিন দেয়া হয় : তথ্যমন্ত্রী ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে দুর্ব্যবহার : কুষ্টিয়ার এসপিকে হাইকোর্টে তলব আসাদের স্মৃতিস্তম্ভে ছাত্রদলের শ্রদ্ধা কড়াইল বস্তিবাসীর পাশে জামায়াত নেতা সেলিম উদ্দিন




শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর নাটক ও উত্তর-প্রজন্ম

মোহাম্মদ জয়নুদ্দীন :
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২০




বাংলাদেশ, বাঙালি ও বাংলাভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির সমৃদ্ধিসাধন এবং জাগরণ-ইতিহাসে শহীদ সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর কীর্তি সুবিদিত। তাঁর সৃজনশীল ও মননধর্মী সাহিত্যিনির্মাণ এবং জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পমানস গঠনে সক্রিয় ছিলো পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক, আর্থসামাজিক, রাষ্ট্রিক ও বৈশ্বিক স্তরবহুল ঘটনাপ্রবাহ। সমকাল, ইতিহাস, ঐতিহ্য, পুরাণ ও মিথাশ্রয়ী জীবনভাবনা তাঁকে করেছে অসাম্প্রদায়িক, উদারমান বিক ও বস্তুবাদী শিল্পস্রষ্টা। ত্নী মননের সাথে সম্পৃক্ত ছিলো সূক্ষ্ম রসবোধ, যা তাঁর সাহিত্যকর্মকে করেছে প্রাণবন্ত এবং ভিন্নমাত্রিক। তিনি এদেশের আধুনিক নাট্যকার, সফল অনুবাদক, বিজ্ঞ গবেষক- প্রাবন্ধিক এবং নিপুণ গল্পকার। তবে শেষোক্ত পরিচয়কে খানিকটা আড়াল করে অধিক সমুজ্জ্বল হয়েছে তাঁর নাট্যচর্চা সম্পর্কিত কার্যক্রম। তিনি একই সাথে নাট্যকার, অভিনেতা, নাট্যনির্দেশক ও নাট্যসংগঠক। বিদগ্ধ এই নাট্যজনের নাটক বর্তমান প্রজন্মের কাছে কীভাবে গৃহীত, চর্চিত ও অনুপ্রেরণার উৎস হচ্ছে সেটাই বিবেচ্য এবং আলোচ্য বিষয়।
মুনীর চৌধুরীর নাট্যচর্চার কাল ১৯৪২ থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। উল্লিখিত কালপরিসরে আমাদের নাটক ছিলো নানা ধারায় বাঁধা। জাতীয় জীবনের পশ্চাৎপদতা, সমাজের রক্ষণশীলতা, অনুদার মনোভাব এবং নাট্যশালা সৃষ্টির প্রয়াসহীনতাকে অগ্রাহ্য করে যাঁরা নাট্যউত্তরণের ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন, মুনীর চৌধুরী তাঁদের মধ্যে পুরোধাপুরষ। তখন সারাদেশেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাট্যগোষ্ঠী নাট্যমঞ্চায়নে মনোযোগী হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক নাট্যচর্চাই নাট্যউত্তরণে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। ১৯৫৬ র্খ্রিস্টাব্দে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল নাট্যোৎসাহী ছাত্র প্রতিষ্ঠা করেন গ্রুপ থিয়েটারমেজাজী গোষ্ঠী ‘ড্রামা সার্কেল’। উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-নাট্যকর্মী নুরুল মোমেন ও আসকার ইবনে শাইখের অবদান স্বীকার করেও মুনীর চৌধুরীকেই উচ্চাসনে বসাতে হয়। তাঁর মেধাবী নেতৃত্বে ও পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা মুগ্ধ নাট্যানুরাগী ছাত্রের সংখ্যাই ছিলো বেশি। মমতাজউদ্দীন আহমদ, আবদুল্লাহ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার, সেলিম আল দীন প্রমুখ নাট্যব্যক্তিত্ব তার প্রমাণ। মুনীর চৌধুরীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মমতাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন, ‘বাংলা নাটক পাঠের আনন্দবোধ আমার জাগতই না, যদি না তিনি , বাংলা নাটকের ুদ্র, সামান্য ও অকিঞ্চিৎকর নাট্য ঘটনাগুলো আমার দৃষ্টির মধ্যে এনে দিতেন। তিনিই আমাদের স্বদেশী ও বিদেশী নাট্য বিষয় সম্পর্কে সচেতন করেছেন। … আমি নাটক বানাতে বসে বারবার মুনীর চৌধুরীর কাছে উপস্থিত হই (গ্রন্থ-হৃদয় ছুঁয়ে আছে)। আবদুল্লাহ আল মামুনের ভাষায়, ‘তিনি যে কোন নতুনকে, যে কোন নবীনকে অভিনন্দন জানাবার, অনুপ্রাণিত করবার এবং আপন হৃদয়ে সেই আধুনিকতা লালন করে আরো ত্নীতা দানের আশ্চর্য উদারতা ও ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।’ (থিয়েটারঃ মুনীর চৌধুরী স্মারক সংখ্যা)। রামেন্দু মজুমদারের স্বীকারোক্তি, ‘আমরা লাভ করেছি তাঁর কাছ থেকে আমাদের অভিনয় জীবনের সত্যিকার শিক্ষা।’ (থিয়েটার, ঐ)। আর সেলিম আল দীন- এর মূল্যায়ন, ‘ছাত্র জীবনে শ্রদ্ধেয় মুনীর চৌধুরী নাট্যরচনায় শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতেন এবং আমি স্বয়ং এর স্বাক্ষী। (গ্রন্থ- মুনীর চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম)। অর্থাৎ মুনীর চৌধুরী ছিলেন নাট্যগতপ্রাণ। নাটক সম্পর্কিত প্রচুর পড়াশুনা করেছেন, অভিজ্ঞতার আলোকে নাটক লিখেছেন, ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী ও স্বজনদের নিয়ে তা মঞ্চস্থ করেছেন এবং এভাবেই নাটকের প্রাণপুরুষ হয়ে উঠেছেন। মানুষ হিসেবেও তিনি বড় মাপের। অন্যকে সহজেই কাছে টানতে পারতেন। অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের অভিমত, ‘মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা সবাই বুঝি জীবন্মৃত। কিন্তু যখন মুনীর চৌধুরীর মত মানুষের সংস্পর্শে আসি, তখন জীবনের অর্থ খুঁজে পাই।’ (থিয়েটার, ঐ) অর্থাৎ মুনীর চৌধুরী মানুষের মধ্যে জীবনবোধ ও নাট্যপ্রীতি জাগাতে সক্ষম হন, যা প্রজন্ম পরম্পরায় সঞ্চারিত হতে থাকে।
প্রগতিশীল স্বাধীনতাকামী মুনীর চৌধুরীর কার্যক্রম পাকিস্তানপন্থী দল মেনে নিতে পারে নি বলেই ১৯৭১ এ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সাথে তাঁকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। যিনি বৈরী পরিবেশে, সীমিত সুযোগে নাট্যচর্চার সুষ্ঠু পথ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, স্বাধীন দেশে সে পথ যখন আলোকিত হতে থাকে, তখন তিনি কেবলি স্মৃতি, সম্বল শুধু তাঁর রচিত নাট্যরাজি। স্বাধীন দেশে কেউ বলেছেন, যুদ্ধ করে স্বাধীন হলো বাংলাদেশ, বাংলাদেশে নাটক এলো- যেনো হৈ হৈ করে রাজার হাতি ছুটে এলো। কেউ বলেন, একদল তরুণ মুক্তিযোদ্ধা, যাঁরা যুদ্ধকালে পশ্চিমবঙ্গে নাটক দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন, তাঁরাই বাংলাদেশের নাটকে নতুন বিষয় ও আঙ্গিক আনেন। এ বক্তব্য অমূলক নয়, আবার পুরো সত্যও নয়। কারণ, পঞ্চাশ-ষাটের দশকেই মুনীর চৌধুরী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সাঈদ আহমদ আধুনিকমনস্ক ও নিরীক্ষাপ্রিয় নাট্যকার হিসেবে প্রশংসিত হন। তবে তখনও আমাদের পাঠক-দর্শক পুরোপুরি পাশ্চাত্য নিরীক্ষাধর্মী নাটকের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন নি। এ্যাবসার্ড, অস্তিত্ববাদ, চেতনাপ্রবাহ, অতিব্যক্তিবাদ, স্যুরিয়ালিজম সম্পর্কিত নাটক তাঁদের কাছে প্রায় অচেনা-অজানা। তাই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ফ্রান্সে একাধিকবার মঞ্চস্থ হওয়া ‘উজানে মৃত্যু’র মতো আরো আটটি নাটক লিখতে চেয়েছিলেন, অথচ এদেশে নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়া তো দূরের কথা, অনেকেই পড়েও দেখেন নি জানতে পেরে হতাশ হয়েছিলেন। কিন্তু মুনীর চৌধুরী ছিলেন সর্বদা আশাবাদী। তিনি দেশের সহজ সরল মানুষকে ভালো ভাবেই জানতেন। তাই বশ্বনাটকের কলাকৌশল সম্পর্কে অভিজ্ঞ হয়েও নাটকে সরাসরি তার প্রয়োগ করেন নি। তিনি দেশের ইতিহাস, পুরাণ, ঐতিহ্য, মিথ ও সমকালীন ঘটনাপ্রবাহ নির্দিষ্ট মাত্রায়, সুনিপুণ দক্ষতায় কোনো কোনো নাটকে প্রয়োগ করেছেন। তাঁর এ নাট্যসৃষ্টি বিষয়ের গুরুত্বে ও শিল্পগুণে কালোত্তীর্ণ। তাঁর অবিস্মরণীয়, শুদ্ধচেতনাসঞ্চারী ও ‘দৃষ্টি উন্মোচনকারী’ নাটক ‘কবর’। তাই ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত এ নাটকের গুলিবিদ্ধ লাশের কন্ঠে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়, ‘আমরা কবরে যাব না। আমরা বাঁচবো।’ এই বাঁচা-লড়াইয়ের ফলশ্রুতিই একাত্তরের স্বাধীনতা অর্জন। এখানেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্যাপী মুনীর চৌধুরীর নাটক গুরুত্ববহন করে আসছে। একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই আজও আমাদের ফিরে যেতে হয় ‘কবর’ নাটকের কাছে, হতে হয় উজ্জীবিত।
মুনীর চৌধুরী সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে মাথানত করেন নি। মানবিক উদার চেতনাকে লালন করেছেন। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মুসলমানদের যে বিজয় হয়, তাঁকে দিয়ে সেই বিজয়গাথা রচনার চেষ্টা হয়েছিলো। তিনি সেই যুদ্ধকে প্রেক্ষাপটে রেখে ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটকে যুদ্ধবিরোধী ও হৃদয়বৃত্তিক চেতনার প্রাধান্য দিয়েছেন। গতানুগতিক ঐতিহাসিক নাট্যধারা বহির্ভূত, মিথাশ্রয়ী ট্র্যাজেডিধর্মী নাটকটি ‘কবর’ এর মতোই নবোদ্ভূত আঙ্গিকে গঠিত এবং সমকাল অতিক্রমী নন্দিত শিল্পকর্ম।
মুনীর চৌধুরী গুণিশিক্ষক, ছাত্রদের সঙ্গে ছিলো তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। তিনি ছাত্রছাত্রীদের মান-অভিমান, আনন্দ-বেদনা, স্নেহ-ভালবাসার আলোকে রচনা করেন নাটক ‘চিঠি’, ‘আপনি কে?’ ও ‘দ-ধর’। ‘দ-কারণ্য’ নাট্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেন ছাত্রছাত্রীদের ‘কোমল কঠিন করে।’ নাটক রচনার পর তিনি সমমনা সহকর্মী, ছাত্র ও স্বজনদের পড়ে শোনাতেন। শ্রোতাদের খোলামেলা মতামত প্রত্যাশা করতেন। রণেশ দাশগুপ্ত ও মমতাজউদ্দীন আহমদ ‘কবর’ নাটকের শেষাংশ মূল নাটকের উত্তাপকে খানিকটা শীতল করেছে বলে মন্তব্য করেন। উদারচেতা মুনীর চৌধুরী এর উত্তরে বলেন, প্রয়োজন হলে প্রযোজক নাটকের শেষাংশ বর্জন করতে পারেন। জেলখানায় বসে সীমিত উপকরণ ও আয়োজনে রচিত ‘কবর’ নাটকের পর তিনি আর বড় মাপের মঞ্চের কথা বলেন নি। বর্তমান প্রজন্ম আধুনিক মঞ্চে নাটক করার সুযোগ পেলেও তারা ‘পথনাটক’ মঞ্চায়ন বন্ধ করেন নি। তাঁরা মুনীর চৌধুরীর রাজনৈতিক আদর্শ, প্রতিবাদ ও আধুনিক চেতনায় সমৃদ্ধ হয়েই নাটক রচনা ও মঞ্চায়ন করছেন। মমতাজদ্দীন থেকে মান্নান হীরা পর্যন্ত নাট্যকর্মই তার প্রমাণ।
মুনীর চৌধুরী মৌলিক নাটক রচনার পাশাপাশি বিদেশি নাটকের অনুবাদ ও রূপান্তর করেছেন। এ পর্যায়ের নাটক নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁর গভীর জীবনবোধ, নিখুঁত শিল্পদৃষ্টি ও আধুনিক নাট্যজ্ঞানের পরিচয় মেলে। পশ্চাত্য নাট্যকলা সম্পর্কে বাঙালি নাট্যকর্মীদের অবগত করানো এবং বাংলার নাট্যমঞ্চকে সমৃদ্ধকরণের অভিপ্রায়ে তিনি অনুবাদ-রূপান্তরকর্মে মনোযোগী হন। তাঁর অনূদিত- রূপান্তরিত নাটক বেতার টেলিভিশন মঞ্চে অভিনীত হয়। পাঠক-দর্শক প্রিয়তা পায়। তুলনামূলক বিচারে দেখা গেছে, যদি একই নাটক মুনীর চৌধুরীসহ দুতিনজন অনুবাদ-রূপান্তর করেন, সে ক্ষেত্রে মুনীর চৌধুরীর অনুবাদ রূপান্তরই শ্রেয় বিবেচিত হয়েছে। ট্র্যাজিডির চেয়ে কমেডি নাটকের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিলো বেশি। শেক্সপীয়র, বার্ণার্ড শ, গলসওয়ার্দী, স্ট্রিন্ডবার্গ প্রমুখ নাট্যকারের নাটক তাঁর অনুবাদ রূপান্তরের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বর্তমানে মুনীর চৌধুরীর উত্তরসূরি বহু অনুবাদক বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় নাটক অনুবাদ- রূপান্তর করেছেন। তাঁদের দৃষ্টিও কমেডির দিকে। তাই মলিয়রের নাটক বেশি রূপান্তরিত ও মঞ্চায়িত হচ্ছে এবং এভাবেই মুনীর চৌধুরীর প্রত্যাশিত বাংলা নাট্যভান্ডার সমৃদ্ধ হচ্ছে।
মুনীর চৌধুরী ছিলেন নাট্যসংগঠক ও নিদের্শক। তাঁর অনুপ্রেরণায় মহিলা শিল্পীরা মঞ্চে আসেন। স্ত্রী লিলি চৌধুরী ও বোন ফেরদৌসী মজুমদার তাঁর হাতেই গড়ে ওঠা নন্দিত শিল্পী। তাঁর গুণমুগ্ধ ভক্তরা প্রতিষ্ঠা করেন নাট্যগোষ্ঠী। স্বাধীনতার পর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে থিয়েটার গোষ্ঠী বাংলা একাডেমির উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে মঞ্চস্থ করেন অমর নাটক ‘কবর’। ফেরদৌসী মজুমদারের নির্দেশনায় ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে পাবলিক লাইব্রেরিতে মঞ্চস্থ হয় ‘চিঠি’ নাটক। পরবর্তীতে এ নাটকটি মঞ্চস্থ করে থিয়েটার স্কুল। আশির দশকে ‘থিয়েটার’ মঞ্চে আনে ‘ওথেলো’। ঢাকা টেলিভিশনের প্রথম নাটক ‘একতলা দোতালা’ মুনীর চৌধুরীর রচনা। পরবর্তীতে বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রচার করে তাঁর ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’।
১৯৭২ সালে ‘থিয়েটার’ গোষ্ঠীর নাট্য ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘থিয়েটার’ প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় মুনীর চৌধুরীর স্মারক সংখ্যা হিসেবে। এ গোষ্ঠী ১৯৮৯ থেকে গুণী নাট্যজনদের ‘মুনীর চৌধুরী সম্মাননা’ পদক প্রদানের প্রবর্তন করে। মুনীর চৌধুরীর নাটক এখন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত হচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ‘কবর’, উচ্চ মাধ্যমিকে ‘রক্তাক্ত প্রান্তর, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে তাঁর নাটক পড়ানো হয়। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রছাত্রীরা নোটনির্ভর পড়াশোনোতে অভ্যস্ত হওয়ায় মুনীর চৌধুরীর নাটকের প্রকৃত শক্তি সম্পর্কে সঠিক অবগত হচ্ছে না। অন্যদিকে গবেষক- প্রাবন্ধিকবৃন্দ তাঁর নাটকর্ম মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণে অধিক আগ্রহী হচ্ছেন। মুনীর চৌধুরী সম্পর্কিত এ যাবত প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ: আনিসুজ্জামানের ‘মুনীর চৌধুরী’ (১৯৭৫), কবীর চৌধুরীর ‘মুনীর চৌধুরী’ (১৯৮৭), জিয়াউল হাসানের ‘মুনীর চৌধুরীর নাটক’ (১৯৯০), মোহাম্মদ জয়নুদ্দীনের ‘মুনীর চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম (১৯৯৮, দ্বি.প্র. ২০০৯), রহমান হাবিবের ‘অবিভক্ত বাংলার নাট্যচর্চার পটভূমি এবং মুনীর চৌধুরীর নাটক’ (২০০৫) এবং মোঃ ফরহাদ হোসেনের ‘বাংলা নাট্যসাহিত্যে মুনীর চৌধুরীর অবদান’ (২০০৮)। মোহাম্মদ জয়নুদ্দীন ও ফরহাদ হোসেনের গ্রন্থ দুটি পিআইচডি, অভিসন্দর্ভ। ‘মুনীর চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম’ দেশের সবকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে সহায়কগ্রন্থ হিসেবে পঠিত হচ্ছে।
মুনীর চৌধুরীর অন্তর্দৃষ্টি ছিলো স্বচ্ছ এবং বহুদূরপ্রসারী। তাই তাঁর নাটকের বিষয়মূল্য অসীম-মানবকল্যাণকর, সাহিত্যগুণান্বিত ও চিরায়ত। নাটকের আঙ্গিকে নতুনত্ব আছে, তবে মঞ্চায়ন পরিকল্পনা আড়ম্বরহীন। সংলাপ রচনায় তাঁর সাফল্য তুলনারহিত। অসাধারণ নাটকীয়তাযুক্ত, বেগবান, বুদ্ধিদীপ্ত, বিদ্রƒপ ও হাস্যরসাত্মক এ সংলাপ। কাজেই বর্তমান প্রজন্মের কাছে তাঁর নাটকসমূহ অভিনন্দিত হবারই কথা। মুনীর চৌধুরীর সংলাপরীতি সবচেয়ে বেশি আয়ত্ত করেছেন মমতাজউদ্দীন আহমদ ও আবদুল্লাহ আল মামুন।
সময়ের পরিবর্তনে নাট্যকলারও পরিবর্তন ঘটছে। আধুনিক থেকে উত্তর- আধুনিক ভাবনা নাটককে অধিক সমৃদ্ধ করছে। মঞ্চায়নরীতিতে আসছে আমূল পরিবর্তন। নাট্য-গীতি ও লোককলার অপূর্ব মিশ্রণে নাটক নবরূপ পাচ্ছে। পরিবর্তিত পাশ্চাত্য নাট্যরীতির সাথে এদেশের নাট্যকর্মীরাও আজ একাত্ম। মুনীর চৌধুরীর নাটক মঞ্চায়নেও বর্তমান প্রজন্ম সক্রিয়। গোষ্ঠীগত প্রচেষ্টায় তাঁর নাট্যসমূহ পাঠের আয়োজন হচ্ছে। ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’-কে নবনিরীক্ষায় যাত্রার ঢঙে মঞ্চায়িত হতেও দেখা যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে মুনীর চৌধুরীর নাট্যসাহিত্যের ঘটনাবৃত্ত, চরিত্রগঠন ও ভাষার ঐশ্বর্যকে অস্বীকার করার মতো স্পর্ধা কারো নেই। মুনীর চৌধুরীর নাট্যপ্রেরণা ছিলো বলেই মমতাজউদ্দীন আহমদ, আবদুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশীদ, সেলিম আল দীন এর মতো নাট্যকার পেয়েছি, পেয়েছি আতাউর রহমান, আলী যাকের, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদারের মতো দক্ষ অভিনেতা-নির্দেশক এবং পেয়েছি নাগরিক, থিয়েটার, নাট্যচক্র, ঢাকা থিয়েটার, পদাতিক এর মতো অসংখ্য নাট্যগোষ্ঠী ও নাট্যকর্মী- যারা গ্রুপ থিয়েটারের আদর্শ বিশ্বাসী। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, আজ বিশ্বনাট্য সংস্থার অন্যতম সদস্য এবং বর্তমান বিশ্ব নাট্যসংস্থার সভাপতি মুনীর চৌধুরীর স্নেহধন্য রামেন্দু মজুমদার। মুনীর চৌধুরী বলেছিলেন, আমরা সেই নাটক চাই, যে নাটক আমাদের নাড়াতে পারে, বাড়াতে পারে। আজ শহীদ মুনীর চৌধুরী আমাদের মাঝে নেই, আছে তাঁর অবিনাশী নাট্যকর্ম। প্রত্যাশা রাখি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর নাট্যকর্মকে লালন করে নিজেদের এবং সামগ্রিক নাট্যভুবনকে বিকশিত করবে।




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com