দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গতকাল খালেদা জিয়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার এভারকেয়ার হসপিটালে ইন্তেকাল করেছেন। তার চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তাররা বারবার বলেছিলেন, তার স্বাস্থ্যের অবস্থা স্থিতিশীল আছে ও তিনি চিকিৎসা নিতে সক্ষম। এটাই ছিল আশাবাদের কথা। কিন্তু সেভাবে আশাবাদী হওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না। কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ এবং তার স্বাস্থ্যগত জটিলতা বহুবিধ। তিনি ডায়াবেটিস, হৃদরোগে, কিডনি জটিলতা, লিভারের সমস্যায় ভুগছিলেন। দেহের স্পর্শকাতর অঙ্গগুলো যখন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে যায় তখন স্বাভাবিকভাবেই একজন মানুষের জীবনদীপ নিভে যেতে খুব সময় নেয় না। তার পরও তিনি রোগশোকের সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়াই করেছেন। যেভাবে তিনি স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, একইভাবে রোগের বিরুদ্ধেও অত্যন্ত দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছেন। এ কারণে খালেদা জিয়াকে একজন অকুতোভয় ও আপসহীন নেত্রী হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি রাজনীতির মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সামরিক কর্মকর্তা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। তিনি একজন নিছক সংসারী মহিলা ছিলেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তার রাজনৈতিক দল বিএনপি একটা সংকটের মধ্যে পড়ে যায়। কে এ দলের নেতা হবে তা নিয়ে প্রচ- প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি হয়। এমন এক পরিস্থিতিতে বিএনপির একদল তরুণ নেতৃত্ব বেগম জিয়াকে রাজনীতিতে যোগদানের ও দলের দায়িত্ব নেয়ার অনুরোধ জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেগম জিয়া চিন্তা করেন এবং জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর সাত মাস পর বিএনপিতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে তিনি দলের প্রাথমিক সদস্য হন এবং পরবর্তী সময়ে দলের প্রধান হন। এ সময় বিএনপি যে খুব সংগঠিত ছিল, তা নয়। কিন্তু এ অসংগঠিত দল নিয়ে তিনি এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াইয়ে নেমেছিলেন। এ লড়াই করতে গিয়ে তাকে বহু প্রতিকূল অবস্থার মোকাবেলা করতে হয়েছিল। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী অংশগ্রহণ করে। এ দুই দলের অংশগ্রহণের ফলে এরশাদের স্বৈরশাসন বৈধতা পেয়েছিল। কিন্তু খালেদা জিয়া সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। উল্লেখ্য, সে নির্বাচনের একদিন আগে শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের এক জনসভায় বলেছিলেন যে যারা এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে তারা হবে জাতীয় বেইমান। কিন্তু পরদিন তিনি সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ঘোষণা দেন। এটাই হচ্ছে শেখ হাসিনার রাজনীতির নমুনা। তিনি একের পর এক এরশাদবিরোধী লড়াই সংগ্রাম করেছিলেন। কোনো নির্বাচনে পরবর্তী সময়ে তিনি আর অংশগ্রহণ করেনি। ১৯৯০ সালে পরিস্থিতি কিছুটা পরিপক্ব হয়ে উঠেছিল। ছাত্ররা ব্যাপকভাবে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েছিল। সে সময় এরশাদ সরকার আন্দোলন দমন করার জন্য কারফিউ জারি করেছিল। ছাত্ররা কারফিউ ভঙ্গ করলে ছাত্র হত্যার ঘটনাও ঘটেছিল। ডা. মিলন হত্যার ঘটনা ঘটল। এটি আগুনে ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। আন্দোলনের শিখা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তারা আর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দায়িত্ব বহন করবে না। ফলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। এরপর গঠন করা হয়েছিল বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। যদিও সে সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে স্বীকৃত ছিল না। কিন্তু এ ব্যাপারে দেশের প্রধান জোটগুলো সাত দলীয় জোট, আটদলীয় জোট এবং পাঁচদলীয় জোট ঐকমত্যে পৌঁছানোর ফলে এ রকম একটি সরকার গঠন সম্ভব হয়েছিল। এ থেকে দেখা যায় যে একটা দেশের সংবিধানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতিগত ঐক্য, জাতীয় ঐক্য। ১৯৯১ সালে এটিই হয়েছিল। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে এমন ধারণা সবার মনে ছিল। কিন্তু সবার সেই চিন্তাকে ভুল প্রমাণ করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট ছিল না। যে কারণে সরকার গঠনের জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিতে হয়েছিল। সরকার গঠনের পর তিনি দেশ গঠনে মনোনিবেশ করেছিলেন।
এর অংশ হিসেবে প্রথমেই প্রবর্তন করা হয়েছিল মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট সিস্টেম। কিন্তু এর ?বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ তুমুল প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। কিন্তু খালেদা জিয়ার সরকার সে আন্দোলনের প্রতি কান না দিয়ে, কোনো রকম দুর্বলতা প্রদর্শন না করে দৃঢ?ভাবে এ পথে অটল ছিলেন। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে এ কর ব্যবস্থা বাংলাদেশের মতো ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে এবং আওয়ামী লীগ সরকারও এ ভ্যাট প্রথা বিলোপ করেনি।
এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। প্রথমদিকে বেগম জিয়ার অবস্থান ছিল এমন যে যেহেতু সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই, সুতরাং তিনি সংবিধানের বাইরে এক পাও রাখবেন না। কিন্তু আন্দোলনটা ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছিল। অফিসগামী ব্যক্তিকে দিগম্বর করা, ১৭৩ দিন হরতাল, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বাসে অগ্নিসংযোগ, চট্টগ্রাম বন্দর অবরোধ করার মতো সব ঘটনা ঘটেছিল। অর্থনীতি প্রচ-ভাবে স্থবির হয়ে পড়েছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যে কর্মচাঞ্চল্য কমে আসে। এমন পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত বেগম জিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে দেশকে আর ধ্বংস হতে দেয়া যায় না এবং এ কারণে ১৯৯৬ সালে একটা নির্বাচন আয়োজন করেন। যদিও সেটা এক প্রকার একতরফা নির্বাচন ছিল বলা যায় এবং সে নির্বাচন করতে গিয়েও তাকে প্রচুর বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গণকারফিউ জারি করে সে নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও নির্বাচনটা হয়েছিল এবং এর মধ্য দিয়ে গঠিত সংসদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল সংবিধানে সংযোজন করেছিল। এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই খালেদা জিয়ার সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যাবেন এবং দেশে নতুন করে নির্বাচন আয়োজন করা হবে। সেই নির্বাচন হবে তার সরকারের দ্বারা প্রণীত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছিল আর বিএনপি ১১৬টি আসন পেয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরোধী দল হিসেবে ১১৬টি আসন পাওয়া ছিল একটা ব্যতিক্রমী ব্যাপার। তা সত্ত্বেও খালেদা জিয়ার একটা বিশ্বাস ছিল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও সেটি সম্পূর্ণ সুষ্ঠু ছিল না। যে কারণে এক্ষেত্রেও তিনি প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিলেন এবং সংসদে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এতে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে দুশ্চিন্তার সৃষ্টি হয়েছিল। নয়টি দেশের কূটনীতিকরা বেগম জিয়ার বাসায় ছুটে যান তাকে সংসদে আসার জন্য অনুরোধ জানাতে। এছাড়া বিএনপির বাইরে আমরা অনেকেই তাকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য আবেদন করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত তিনি সবার কথা বিবেচনা করে সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
বেগম জিয়া সংসদে গিয়ে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেন। এ সংসদে তার একটা ঐতিহাসিক বক্তৃতা ছিল দীর্ঘ প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী। সেই বক্তৃতায় তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলের দুঃশাসনের কাহিনী বর্ণনা করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়া যে মুজিব সরকারের শাসনামল কী ধরনের নিপীড়নমূলক এবং অত্যাচারী শাসন ব্যবস্থা ছিল। তার সে বক্তৃতা রচনায় আমি সহায়তা করেছিলাম। মূলত এর তথ্যভিত্তি আমারই রচনা করা। লেখাটাও আমার রচনা করা ছিল। সেদিন সেই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দেশবাসী, বিশেষত নতুন প্রজন্ম জানতে পেরেছিল যে শেখ মুজিব সরকার কতটা অত্যাচারী সরকার ছিল। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি এবং তার জোট বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিল। সংসদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন তারা পায়। রেডিও-টেলিভিশনে যখন এ নির্বাচনের ফলাফল প্রচার হচ্ছিল তখন দেখা গেল শেখ হাসিনা এ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা স্থগিত করার জন্য সেনাপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু তারা দুজনই শেখ হাসিনার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রীয় পলিসিগত ক্ষেত্রে যেসব অবদান সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাজার অর্থনীতিকে বেগবান এবং এটাকে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির একটা কর্নার স্টোন হিসেবে গ্রহণ করা। ফলে মানুষের রুদ্ধ উদ্যোগ মুক্ত হলো। দেশের অর্থনীতিতে নানা ধরনের সৃজনশীল কর্মকা- দেখা গিয়েছিল। দেশের গার্মেন্ট শিল্প, মাছের চাষ, হাঁস-মুরগির চাষ এগুলোর ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ ঘটে। অর্থাৎ বেগম জিয়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছেন। এছাড়া নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করার জন্য ফুড ফর এডুকেশন প্রোগ্রাম ও উপবৃত্তির কর্মসূচি চালু করেন। এগুলো খুবই সফল কর্মসূচি ছিল। নারীরা ক্ষমতায়িত হতে শুরু করেন এবং শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। দেখা গেল গ্রামে গ্রামে মেয়েরা তাদের পোশাক পরে স্কুলে যাচ্ছে দলে দলে, যেটা গ্রামবাংলায় একটা অভূতপূর্ব দৃশ্য ছিল। আমাদের মেয়েরা যে লেখাপড়া করতে এবং স্কুলে যেতে পারে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এগুলো খালেদা জিয়ার অবদান। ২০০৬ সালের রূপান্তরকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে গঠিত হবে সেই নিয়ে যে অচল অবস্থা সৃষ্টি হয় সেই অচল অবস্থার সুযোগ নিয়েই দেশে এক-এগারোর সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সরকার খালেদা জিয়া, তার দল ও তার সন্তানদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন-নিপীড়ন চালায়। বেগম জিয়া ও তার দুই সন্তানকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনজনের মধ্যে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো অসুস্থ ছিল। তার জন্য কারাবরণটা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। অন্যদিকে তারেক রহমান সেভাবে অসুস্থ না হলেও তাকে যেভাবে দৈহিক নির্যাতন করা হয়েছে, সে নির্যাতনে তিনি পঙ্গু হয়ে পড়েন। যখন তারা কারামুক্ত হয়েছিলেন খালেদা জিয়া তারেক রহমানকে দেখতে ছুটে যান। তারেক রহমানের চেহারা দেখে তিনি বসতে পারছিলেন না। অশ্রুসজল হয়ে পড়েছিলেন। খালেদা জিয়ার ওপরও অনেকভাবে অত্যাচার করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে বেগম জিয়াকে তার বাড়ি থেকে অত্যন্ত নির্মমভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ঠুনকো মামলা দিয়ে তাকে দীর্ঘ কারাবাসে পাঠানো হয়েছিল এবং তাকে কারাবাসের জন্য পরিত্যক্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ব্যবহার করা হয়। এখানেই তার ওপর চরম নির্যাতন-নিপীড়ন হয়। অনেকে সন্দেহ করেন যে বন্দি অবস্থায় তার খাদ্যে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। যে কারণে তিনি পরবর্তী সময়ে ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। বিষের নানা ধরন আছে। কিছু বিষ আছে খুব দেরিতে কাজ করে। কিছু ধীরে কাজ করে। সে ধরনের বিষই তার খাদ্যে প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে সন্দেহ করা হয়। সে সময় তিনি দুই বছর কারাগারে ছিলেন। তারপর তাকে গৃহবন্দি করা হয় এবং তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। বিদেশে স্বাস্থ্য চিকিৎসার জন্য বারবার আবেদন জানানো হলেও তাকে সেই সুযোগ দেয়া হয়নি এবং এ অবস্থাতেই তার দিনগুলো কেটেছে।
অন্যদিকে তারেক রহমান বিদেশে বসে দল পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠার পর সেখান থেকে অনলাইনে বা ভার্চুয়ালি দল ও দেশবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা শুরু করেছিলেন। ফলে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং খালেদা জিয়ার বেঁচে থাকাও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল। এছাড়া খালেদা জিয়ার একটা বড় গুণ ছিল দেশপ্রেম। তিনি দেশের স্বার্থ কোনো বিদেশী শক্তির কাছে বিকিয়ে দিতে চাননি। এজন্য তাকে প্রচুর মূল্য দিতে হয়েছে। বিশেষত ভারতীয় আধিপত্যবাদের কাছে মাথা না নোয়ানো ও দেশটির চাওয়া পাওয়াকে প্রশ্রয় না দেয়ার ফলে আওয়ামী লীগ সরকার তার ওপর নানা ধরনের নির্যাতন-নিপীড়ন চালায়। সেসব থেকে বেগম জিয়া মুক্ত হলেন ২০২৪-এর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে। তিনি বেঁচে থাকতে এ অভ্যুত্থান ও শেখ হাসিনার পতন দেখে গেলেন। তার বিদেশে পলায়ন দেখে গেলেন এবং আওয়ামী লীগের একটা চরম পরিণত দেখে গেলেন। এটা বোধ হয় তার হৃদয়ে নতুন করে আস্থা এবং আশা সৃষ্টি করেছিল এবং তার চিত্তকে আন্দোলিত করেছিল। তবে দুর্ভাগ্য তিনি অসুস্থই থেকে গেলেন। ফলে অভ্যুত্থানের ফলে দেশবাসীর কাছে যে সুযোগ এসেছিল, তা কাজে লাগানোর জন্য তিনি নিজে যেভাবে নেতৃত্ব দিতে পারতেন সেটি সম্ভব হয়নি। এদিক থেকে জাতি হিসেবে আমরা খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। খালেদা জিয়া বিদ্বেষপরায়ণ ছিলেন না। তিনি অন্যের ক্ষতির চিন্তা করতেন না এবং সদালাপী ছিলেন। তিনি বিরোধীদের জন্য, বিরোধীদেরকে লক্ষ্য করেও কোনো খারাপ শব্দ ব্যবহার করতেন না। তার স্বাধীনতাবোধ ছিল খুব উন্নত। ভদ্রতাবোধ ছিল খুব উন্নত, মার্জিত। এ কারণে তিনি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছেও প্রশংসিত হয়েছেন। এছাড়া ব্যক্তিত্বের দিক থেকেও তিনি আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তৃতীয় বিশ্বের ও বড় নেতা হওয়ার জন্য যে বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার সেই বৈশিষ্ট্য তার ছিল। ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের কারণে তিনি যতবার নির্বাচন করেছেন, যতগুলো আসনে করেছেন কখনই পরাস্ত হননি। কিন্তু অন্যদিকে শেখ হাসিনার পরাস্ত হওয়ার ইতিহাস আছে। এমনকি সাদেক হোসেন খোকার কাছেও পরাস্ত হওয়ার ইতিহাসও আছে। এতে প্রমাণিত হয় যে খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা অঞ্চলভিত্তিক ছিল না। তিনি বাংলাদেশের সব অঞ্চলের জেলার মানুষের কাছে সমান প্রিয় ছিলেন এবং দেখা যায় যে আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকাতেও তিনি নির্বাচন করে জয়লাভ করছেন। সুতরাং তিনি একটি ব্যতিক্রমধর্মী নেত্রী ছিলেন। তিনি ছিলেন আপসহীন, দেশপ্রেমিক, নিষ্ঠাবান, চরিত্রবান এবং অনেক ব্যাপারে সার্থক। এ রকম একজন নেত্রী বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে পাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। এমনকি আগামী ১০০ বছরেও পাবে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। তাকে হারিয়ে আমাদের দেশ এবং জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হলো। এ ক্ষতি আমরা খুব সহজে পূরণ করতে পারব না এবং তাকে হারানোর এ শোককে শক্তিতে পরিণত করাই হবে আমাদের কর্তব্য। ড. মাহবুব উল্লাহ্: শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ