মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:১৪ অপরাহ্ন

লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাটও হাজিমারা রায়পুর স্লুইস গেট এখন কৃষকের গলার কাঁটা

দেলোয়ার হোসেন বিশেষ প্রতিনিধি লক্ষীপুর
  • আপডেট সময় রবিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মালিকানাধীন লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাট ও রায়পুরের হাজিমারা স্লুইস গেট বর্তমানে এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। এক সময় যে স্লুইস গেট কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার আশীর্বাদ ছিল, আজ তা রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও দুর্নীতির কারণে কৃষকদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে লক্ষ্মীপুর সদর ও রায়পুর দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের হাজিমারা এলাকা উপজেলার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলকে মেঘনা নদীর জোয়ার-ভাটা ও আকস্মিক প্লাবন থেকে রক্ষার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড মজু চৌধুরীর হাটে প্রথম স্লুইস গেট নির্মাণ করে। এর আগে মেঘনার জোয়ারে বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার পশ্চিমাঞ্চলসহ লক্ষ্মীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতো। বিশেষ করে আমন ধানের বীজতলা নষ্ট হয়ে যেত এবং উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতো। স্লুইস গেট নির্মাণের পর উজানে জোয়ারের পানি প্রবেশ বন্ধ হওয়ায় কৃষকদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হয়। বর্ষাকালে উজানের অতিরিক্ত পানি মেঘনায় নিষ্কাশিত হতো এবং শুকনো মৌসুমে স্লুইস গেট খুলে দিলে ওয়াপদার খাল ও রহমতখালী খাল দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে শত শত শাখা খাল ভরে যেত। সেই পানির ওপর নির্ভর করেই কৃষকরা ইরি-বোরো ধান চাষ শুরু করেন। ফলে এ অঞ্চলে ইরি, আউশ ও আমন- তিন ফসলের চাষ সম্ভব হয় এবং খাদ্য সংকট অনেকটাই দূরীভূত হয়। পরবর্তীতে পুরাতন স্লুইস গেটের পাশেই নেভিগেশন লক সুবিধাসহ আরও একটি স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি স্লুইস গেট নির্মাণ করলেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে গেট দুটি আজ জনগণ, বিশেষ করে কৃষকদের দুর্ভোগের উৎসে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থা হিসেবে পরিচিত। সংস্থাটির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট গেট অপারেটররা স্লুইস গেট পরিচালনাকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছে। বর্ষাকালে উজানের পানি মেঘনায় নিষ্কাশনের স্বয়ংক্রিয় সুযোগ থাকলেও শুকনো মৌসুমে মেঘনা থেকে জোয়ারের পানি প্রবেশ ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ রাখা হয়। এতে লাখ লাখ কৃষক পানির অভাবে চরম সংকটে পড়েন। স্থানীয়দের অভিযোগ, মজু চৌধুরীর হাট স্লুইস গেট থেকে পূর্বদিকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে হাজার হাজার ইরিগেশন প্রজেক্ট রয়েছে। প্রজেক্ট মালিক সমিতির মাধ্যমে গেট অপারেটরকে টাকা না দিলে জোয়ারের পানি খালে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। ফলে পুরো অঞ্চল কার্যত গেট অপারেটরের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এছাড়াও ওয়াপদার খালজুড়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও জেলেদের হাজার হাজার মাছ ধরার জাগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জেলেদের স্বার্থ রক্ষায় শুকনো মৌসুমে খুব অল্প স্রোতে পানি প্রবেশ করানো হয়, যাতে স্রোতে জাগের মাছ ভেসে না যায়। এর বিনিময়ে গেট অপারেটর জেলেদের কাছ থেকেও অবৈধ সুবিধা নিয়ে থাকেন। গেট অপারেটরের এই নানাবিধ দুর্নীতির বিষয়টি অতীতে সদর উপজেলা নদী রক্ষা কমিটির সভায় একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ দুর্নীতিমুক্তভাবে এবং কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করে স্লুইস গেট পরিচালনার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। দুটি স্লুইস গেট এখন দুর্নীতির আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বর্তমান ইরি-বোরো মৌসুমে রহমতখালী খাল ও ওয়াপদার খালের অধিকাংশ শাখা খাল এখনো শুকনো পড়ে আছে। এরই মধ্যে কৃষকরা পুকুরের পানি সেচ দিয়ে ধানের চারা রোপণ করেছেন। সদর উপজেলার তেওয়ারীগঞ্জ ইউনিয়নের জিল্লাল মিয়ার খালের পানি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইরি ধান চাষ হয়ে আসলেও চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত খালে পানির দেখা মেলেনি। প্রতিবছরের মতো পানি আসবে ভেবে যারা ইরি ধান চাষ করেছেন, তাদের ক্ষেতের চারা ইতোমধ্যেই শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। কৃষকদের অভিযোগ, গেট অপারেটর ইচ্ছাকৃতভাবে প্রজেক্ট ম্যানেজারদের কাছ থেকে টাকা না পেয়ে জোয়ারের সময় খালে পানি প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসডিও’র সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও একাধিকবার ফোন করা সত্ত্বেও তাকে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ক্যাথোয়াইপ্রু মারমাকে অবহিত করা হলে তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। এলাকাবাসী ও কৃষকরা অবিলম্বে স্লুইস গেটের দুর্নীতিমুক্ত পরিচালনা, গেট অপারেটরের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং কৃষি সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com