মোবাইল ফোনের নীল আলো, রিলসের চটুল মোহে বন্দি শৈশব-কৈশোরকে আবার কাগুজে বইয়ের সুবাসে ফেরানোর এক ঐতিহাসিক বিপ্লব দেখল মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। ভার্চুয়াল দুনিয়র কৃত্রিম সীমানা পেরিয়ে বইয়ের পাতায় ফিরে আসার এই পাঠ-উৎসব ছুঁয়ে ফেলল তার রূপালী প্রাপ্তি। শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসনের অনন্য উদ্যোগে আয়োজিত ‘বই পড়া উৎসব ২০২৬’-এর চূড়ান্ত মূল্যায়নী পরীক্ষা ‘ফল’ গতকাল অভূতপূর্ব সাড়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় শহরের ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মিলনায়তনে বইপ্রেমীদের কলকাকলিতে সৃষ্টি হয়। এক অন্যরকম আলোড়ন। প্রযুক্তির ঘোর কাটিয়ে দুটি কঠিন নির্বাচনী ধাপ পেরিয়ে আসা ৭৬০ জন শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার পাঠক মুখোমুখি হন জ্ঞানের অন্তিম মূল্যায়নে। পুরো আয়োজনের সমন্বয়ে ছিল ‘শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসব’ এবং সার্বিক সহযোগিতায় ছিল ‘উত্তরণ পাঠাগার’। উপজেলার ৩৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীকে স্ক্রিন-আসক্তি থেকে মুক্ত করতে ‘বই পড়ি, মনে গড়ি’ স্লোগানে আহ্বানে গত ২১ জুলাই যাত্রা শুরু করেছিল এই উৎসব। নিছক পরীক্ষার ভয় কাটিয়ে বইয়ের সাথে ভালোবাসার সখ্য গড়ে তুলতে পুরো প্রক্রিয়াকে সাজানো হয় তিনটি অনবদ্য ধাপেÑ‘মুকুল’, ‘ফুল’ ও ‘ফল’। আয়োজক সুত্র জানায়, গত ১৭ আগস্ট প্রথম ধাপ ‘মুকুল’-এ একযোগে অংশ নেয় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী। হাতে তুলে দেওয়া হয়থআবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দীনের আবিষ্কারের নেশায়, এপিজে আবদুল কালামের উইয়ংস অব ফায়ার, শাহেদ আলীর জিবরাইলের ডানা, জুল ভার্নের অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটটিন ডেজ, হুমায়ুন আজাদের লাল নীল দীপাবলী, জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্ম, মুহম্মদ আব্দুল হাইয়ের বিলেতে সাড়ে সাতশ দিন, কাজী নজরুল ইসলামের মরু-ভাস্কর ও মৃত্যুক্ষুধা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাশিয়ার চিঠি, সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে, জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন, আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বজনপ্রীতি যেন মেধার মূল্যায়নকে মলিন করতে না পারে, সেজন্য এক প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা পরিচালনা ও খাতা দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয় অন্য প্রতিষ্ঠানকে। প্রথম ধাপের সুবাস পেরিযয়ে আসা ১ হাজার ৯৫৭ জন শিক্ষার্থী ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় ধাপ ‘ফুল’-এ ডুব দেয়। ফুল পর্বে নির্বাচিত বই ছিলÑআল মাহমুদের পা পাখির কাছে ফুলের কাছে, হুমায়ুন আজাদের ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না ও কতো নদী সরোবর, ডা. লুৎফর রহমানের উন্নত জীবন, সৈয়দ মুজতবা আলীর চাচা কাহিনী, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি, মুনির হাসানের ওরা ১১ বাংলার বিজ্ঞানী, সান জু-র দ্য আর্ট অব ওয়্যার, অদ্বৈত মল্লবর্মনের তিতাস একটি নদীর নাম, অ্যান ফ্রাঙ্কের দ্য ডায়েরি অফ এ ইয়ং গার্ল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতা, জগদীশ চন্দ্র বসুর অব্যক্ত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবি এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথা। সেই জ্ঞানের পথ ধরে চূড়ান্ত ‘ফল’ পর্বে আসা সেরাদের সেরা ৭৬০ জন শনিবার মুখোমুখি হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলেবেলা, ড্যানিয়েল ডিফোর রবিনসন ক্রুসো, জহির রায়হানের গল্পসমগ্র, হেক্টোর গার্সিয়া ও ফ্র্ন্সেস্ক মিরালসের ইকিগাই, পাওলো কোয়েলহোর দ্য আলকেমিস্ট, মাইকেল এইচ. হার্টের বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়র পথের পাঁচালী’র মতো কালজয়ী সৃষ্টিগুলোর। পাশাপাশি, উৎসবকে প্রাণের মেলায় রূপ দিতে খোলা থাকা ‘উন্মুক্ত বিভাগ’-এ শিক্ষক, চাকুরিজীবী, সংবাদকর্মীসহ দেড় শতাধিক বইপ্রেমী কাজী নজরুল ইসলামের রাজবন্দীর জবানবন্দী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরা ও জসীমউদ্দীনের নকশী কাঁথার মাঠ বইগুলোর ওপর মূল্যায়নে অংশ নেন। শুধু সরকারি আদেশ জারি করে একটি আয়োজন সারেননি আয়োজকেরা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান নিজে ছুটে গেছেন একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তরুণ শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি বসে তাদের বুঝিয়েছেন স্ক্রিনের বাইরে বইয়ের পাতার সেই জীবন্ত পৃথিবীর গল্প। প্রশাসনের এই ব্যাকুলতাই মেধা-আন্দোলনকে পৌঁছে দিয়েছে ঘরে ঘরে। চূড়ান্ত মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রতিটি শ্রেণির সেরা ১০ জন এবং উন্মুক্ত বিভাগের সেরা পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে উপহার, সম্মাননা স্মারক, বই ও সনদপত্র। পাঠাভ্যাসের এই শুভ সূচনাকে আরও উদ্বুদ্ধ করতে মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মো. মুজিবুর রহমানচৌধুরী প্রতি ক্যাটাগরির সেরা আট পাঠকের জন্য ব্যক্তিগতভাবে আটটি ল্যাপটপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল ‘ফল’ পর্বের প্রতিটি প্রতিযোগীর জন্যই উপহার ঘোষণা করেছেন বইয়ের ডালি। গতকালের ঐতিহাসিক চূড়ান্ত পরীক্ষা কেন্দ্র সরেজমিনে পরিদর্শনে এসে শুভকামনা জানান স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান চৌধুরী, ইউএনও ও পৌর প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিনহাজুল ইসলাম, শ্রীমঙ্গল পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম, উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী আব্দুর রাকিব, পুলিশ পরিদর্শক আব্দুর রাজ্জাক, উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইয়াকুব আলী ও উপজেলা যুবদল আহ্বায়ক মহিউদ্দিন জারুসহ স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা। এদিকে শ্রীমঙ্গলের প্রায় ২৫ হাজার তরুণ পাঠকের গড়ে তোলা এক নীরব পাঠ-বিপ্লব এখন সারা দেশের জন্য নতুন অনুপ্রেরণা তৈরি করেছে। স্থানীয় লেখক, কবি ও সাহিত্যিকদের মতে, শ্রীমঙ্গলের এই অনন্য উদ্যোগ পুরো দেশের প্রতিটি উপজেলার জন্য একটি অনুসরণীয় ‘জাতীয় মডেল’। এ বিষয়ে বিশিষ্ট সাহিত্যিকেরা জানান, বই পড়ার এই আন্দোলনকে টেকসই করতে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর পাঠাগার চালু রাখা, প্রাতিষ্ঠানিক রুটিনে সপ্তাহে অন্তত একটি ‘পাঠঘণ্টা’ নির্ধারণ করা এবং নিয়মিত বই আলোচনার সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। তাদের প্রত্যাশা, শ্রীমঙ্গলে জ্বালানো এই আলোর প্রদীপ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ুক। প্রতিটি শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীর পড়ার টেবিলে টেবিলে ফিরে আসুক বইয়ের সুবাস, আর এর মাধ্যমেই গড়ে উঠুক এক আলোকিত ও মননশীল প্রজন্ম।
সংবাদ শিরোনাম
শ্রীমঙ্গলে উৎসবমুখর পরিবেশে বই পড়া উৎসবের চূড়ান্ত পরীক্ষা
-
এহসান বিন মুজাহির (শ্রীমঙ্গল) মৌলভীবাজার - আপডেট সময় ০২:৩৭:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 27
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























