কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম হত্যার ঘটনায় কিছু ক্লু পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
গতকাল শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন।
মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে গিয়ে নিখোঁজ হয় অপ্রতীম। এর পর আর বাড়িতে ফেরেনি সে। পরে তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
সদর দক্ষিণ মডেল থানা পুলিশ জানিয়েছে, নিখোঁজের পর অপ্রতীমের মুঠোফোনের সর্বশেষ অবস্থান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন সামাজিক বনায়ন এলাকায় শনাক্ত হয়। ওই অবস্থানের ভিত্তিতে শনিবার ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ওই এলাকায় তল্লাশি চালান। ম্যাজিক প্যারাডাইস-সংলগ্ন পশ্চিম সানন্দা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিল ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম। সে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানিয়েছেন, অপ্রতীমের কাছে থাকা তার মায়ের আইফোনটিও পাওয়া যায়নি। আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণা করছেন তারা।
কোথায় নিখোঁজ শিশুরা, অপ্রতিমের মৃত্যুতে প্রশ্ন তুলছেন লেখক-শিল্পীরা
গত শুক্রবার নিখোঁজ হয়েছিল লেখক নাহিদা নাহিদের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়েক শাহরিয়ার অপ্রতিম। নিখোঁজের এক দিন পর তাকে খুঁজে পাওয়া গেলÑতবে জীবিত নয়, মৃত। গতকাল শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ির দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশের জঙ্গল থেকে পুলিশ অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে।
অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই পরিবার, স্বজন, সহপাঠী ও পরিচিতজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। তাকে খুঁজে পেতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে নানা আবেদন ও তথ্য শেয়ার করেন। কিন্তু এক দিন পরই সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে মর্মান্তিকভাবে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া। গায়ক, অভিনেতা, লেখক-সাংবাদিক থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষÑঅনেকেই অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশের পাশাপাশি শিশু নিখোঁজের ঘটনা, তাদের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বিশেষ করে শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের মানুষের মধ্যে এ ঘটনা গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। অপ্রতিমের মৃত্যু যেন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা এবং নিখোঁজ শিশুদের সবাইকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে না পারার বিষয়টি। কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, নিখোঁজ শিশুরা কোথায়? নির্বিকার রাষ্ট্র কী করছে? কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহিদা নাহিদের কিশোরপুত্র গতকাল বাসা থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি। আজ তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কী বলব বুঝতে পারছি না।
পোস্টে তিনি সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পুলিশ সদর দপ্তরের প্রকাশিত একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও তুলে ধরেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান এখনো মেলেনি।
এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে পুলিশের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আহমাদ মোস্তফা কামাল। তিনি লেখেন, এই ২ হাজার ৩৮ জনের কী হলো? এই সংখ্যা তো বিশাল। একজন শিশুও যদি নিখোঁজ থাকে, তাহলে তার দায় রাষ্ট্রের। পুলিশ বাহিনী এই দায় এড়াবে কী করে?
পোস্টে তিনি বর্তমান ও বিগত দুই সরকারেরও সমালোচনা করেন। তার ভাষ্য, তার মানে নিখোঁজ হওয়ার এই ঘটনা নিয়মিতই ঘটে চলেছে এবং তাদের অনেককে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও সবাইকে ফিরে পাওয়া যাচ্ছে না। নির্বিকার, দায়িত্বহীন এই রাষ্ট্রযন্ত্র কী জবাব দেবে এর? এই পরিসংখ্যান সামনে এনে আহমাদ মোস্তফা কামাল শিশু নিখোঁজের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে না দেখে এর ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে এর মোকাবিলার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অপ্রতিমের মৃত্যুতে কবি, কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক মাসুদুজ্জামান ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন ‘এই বাংলাদেশকে আর নিতে পারছি না। এই বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম? এরকম একটা ১৩ বছরের ফুটফুটে শিশু অপ্রতিম লাশ হয়ে গেল! দুই ফোঁটা চোখের পানি ফেলারও জায়গা নেই। সর্বত্রই ঘাতক!!’
এ ঘটনার বিচার চেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন কথাসাহিত্যিক ও মনোশিক্ষাবিদ মোহিত কামাল। তিনি লিখেছেন: ‘এই হিংস্র নৃশংসতার দ্রুত বিচার চাই’।
কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক শাহ্নাজ মুন্নী লিখেছেন: ‘সন্তান হারা মায়ের মন কোথায় খুঁজবে সান্ত¡না? শিশু হত্যার বিক্ষোভে কি এই ধরণী কাঁপবে না?’
কথাসাহিত্যিক শান্তা মারিয়া একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন: ‘কিশোর অপ্রতিমের চেহারাটা যতবার দেখছি অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে। অপ্রতিম হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকটি পিশাচের কঠোর শাস্তি চাই।’
অপ্রতিমের মৃত্যুতে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লেখক ও সাংবাদিক তাপস রয়। নিজের সন্তানের অসুস্থতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি অপ্রতিমের পরিবারের, বিশেষ করে তার মায়ের মানসিক অবস্থার কথা তুলে ধরেছেন।
ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, … একবার ভাবুন অপ্রতিমের মায়ের কথা। কতটা তীব্র ব্যথাতুর ওই পরিবার!
তিনি আরও লেখেন, আমার ছেলে তো ঘরেই আছে। একই বয়স দুজনের। একই ক্লাসে পড়ে। অথচ অপ্রতিম ঘরে নেই। কতটা অসহায় হলে একজন মা বলেন, কোথায় খুঁজব ওকেÑপানিতে নাকি জঙ্গলে? এই হাহাকার প্রতিটি বাবা-মায়ের বুকে শেলসম।
অপ্রতিমের মৃত্যুর খবরে পোস্ট করেছেন কবি জাহিদ জগৎ। অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে তিনি লেখেন, শুধু এই কারণে, নিজেরে দেখার তাড়নায় এই ভিডিও আপলোড দিলাম, যেন বাকি জীবন নিজেরে ঘেন্না করতে পারি যে, এই সমাজে আমরা মাথা উঁচু করে বড় বড় কথা বলে গেছি নির্লজ্জের মতো।
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিশু হত্যা, খুন ও ধর্ষণের মতো নৃশংস অপরাধ নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জনরাষ্ট্র আন্দোলনের মুখপাত্র ও কবি সাম্য শাহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি রাষ্ট্র ও সমাজের বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে নিজের সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘জমা’ রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
ফেসবুক পোস্টে কবি সাম্য শাহ চারপাশের সহিংসতায় নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরে লেখেন, আমি খুব নগণ্য মানুষ। এতটাই নগণ্য যে, আমি আমার সন্তান হত্যা হলেও কোনো পত্রিকা আমাদের হত্যার খবর ছাপাবে না। আমাদের মৃত্যুর খবর আপনাকে শুনতে হবে ফেসবুকে আমার পরিচিত ভাই-বন্ধুর কাছ থেকে। সুতরাং আমার কথার কী দাম!
নাগরিক হিসেবে নিজের এবং নিজের পরিবারের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, সুতরাং আমার সন্তানের হেফাজত করতে এখন আমার উচিত একটা টোকেনের বিনিময়ে রাষ্ট্রের কাছে আমার সন্তান জমা রাখা। অন্তত আমার সন্তান বেঁচে থাকুক।
অপ্রতিমের মৃত্যুতে নতুন করে প্রশ্ন
অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়া এবং পরদিন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে নেট দুনিয়ায়। একটি কিশোর কীভাবে নিখোঁজ হলো, তাকে কীভাবে সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো এবং তার মৃত্যুর পেছনে কী কারণ রয়েছেÑএসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের বিষয় বলেও দাবি জানিয়েছেন ব্যবহারকারীরা।
তবে এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে শিশু নিখোঁজের সামগ্রিক চিত্র। প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগের পাশাপাশি নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান, তাদের দ্রুত উদ্ধার এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান তখনও পাওয়া যায়নি।
অপ্রতিমের মর্মান্তিক পরিণতির পর সেই নিখোঁজ শিশুদের নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অনেকে। তাদের প্রশ্নÑযেসব শিশু এখনো পরিবারের কাছে ফিরে আসেনি, তাদের অবস্থান কী এবং তাদের খুঁজে বের করতে কী ধরনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
খবরপত্র ডেস্ক: 
























