শহরে যাওয়ার আগে অনেকে বলতেনÑগ্রাম থেকে কাজের একটা ছোট মেয়ে নিয়ে এসো। কিন্তু উপকূলীয় কয়রার বদলে যাওয়া চিত্র এখন সেই পুরনো ধারণাকে পুরোপুরি ভুল প্রমাণ করেছে। অভাব-অনটনের চরম বাস্তবতা সত্ত্বেও জলবায়ু-দুর্গত এ অঞ্চলের বাবা-মায়েরা এখন আর সন্তানদের কাজে পাঠান না, বরং কষ্টের উপার্জনে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন বই ও খাতা। আজ আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস। এ উপলক্ষ্যে খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে এক নতুন স্বপ্নের দিনবদল। সকালে সুর্য ওঠার পরপরই দল বেঁধে বই-খাতা হাতে স্কুলে ছুটছে ছোট ছোট মেয়েরা। কারও গায়ে রঙিন পোশাক, কারও কাঁধে স্কুলের ব্যাগ। চোখে তাদের বড় হওয়ার অদম্য স্বপ্নÑকেউ হতে চায় শিক্ষক, কেউবা চিকিৎসক। বদলে যাওয়া সামাজিক প্রেক্ষাপট একসময় কয়রার মতো প্রত্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলে অভাবের তাড়নায় অনেক অভিভাবকই অল্প বয়সে কন্যা শিশুদের শহরের বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠিয়ে দিতেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার আলো পৌঁছে গেছে এই প্রান্তিক জনপদে। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এখন শিশুরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছে। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে: সরকারি আর্থিক উপবৃত্তি: প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা মাসে ১৫০ টাকা এবং প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা ৭৫ টাকা হারে উপবৃত্তি পাচ্ছে। বিনামূল্যে পাঠ্যবই ও পুষ্টি সহায়তা: বছরের শুরুতেই বিনামূল্যে নতুন বই পাওয়ার পাশাপাশি পুষ্টিকর বিস্কুট বিতরণ করা হচ্ছে। মানসিকতার পরিবর্তন: শিক্ষা ছাড়া ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা অসম্ভবÑএই উপলব্ধি এখন উপকূলের অভিভাবকদের ঘরে ঘরে। জায়গীরমহল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মিনারুল ইসলাম জানান, গ্রামের মানুষ এখন শিক্ষার প্রকৃত গুরুত্ব বুঝতে পারছেন। সরকার বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ দিচ্ছে, অভিভাবকেরাও তাঁদের সাধ্যমতো সাড়া দিচ্ছেন। ফলে এখন আর কয়রার গ্রামগুলোতে গৃহপরিচারিকার কাজের জন্য শিশু খুঁজে পাওয়া যায় না। কলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম নুরুল আমিন নাহিন এবং বামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ দিদারুল ইসলাম একই মত প্রকাশ করেন। তাঁরা জানান, শিক্ষকদের আন্তরিক ব্যবহার ও আনন্দদায়ক পরিবেশের কারণে শিশুরা এখন বিদ্যালয়মুখী। মেয়েরাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সঞ্চয় কয়রার উপকূলবর্তী পরিবারগুলোর প্রতিটি ঘরে ঘরে লুকিয়ে আছে ত্যাগ ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হাওলাদার যেমন একসময় আর্থিক অভাবে পড়ে তাঁর বড় মেয়েদের কাজ করতে শহরে পাঠিয়েছিলেন, আজ তিনি সেই ভুলের জন্য অনুতপ্ত। অনেক সন্তান হওয়ায় একসময় ভুল করে মেয়েদের কাজের জন্য শহরে পাঠিয়েছিলাম, ওরা পড়তে পারেনি। এখন আর সেই ভুল করছি না। চরম কষ্টের মধ্যেও বাকি ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠাচ্ছি, যেন ওরা মানুষের মতো মানুষ হতে পারে। একই সুর দিনমজুর দিদারের কণ্ঠেও। নিজের কোনো জমানো টাকা না থাকলেও কঠোর পরিশ্রমে এক মেয়েকে কলেজের গ-ি পার করিয়েছেন, ছোট মেয়েকেও পড়াচ্ছেন স্কুলে। সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অনুভূতির কথা জানান দিনমজুর মা সবিতা মুন্ডা। অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়েদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া এই মা দৃঢ়তার সাথে বলেন: অন্যের বাড়ি দিনমজুরি করে যা পেয়েছি, তা খেয়েই আমার মেয়েরা পরীক্ষা দিতে গেছে। হাজার কষ্টের মধ্যেও ওদের কাজ করতে পাঠাইনি। আমার ব্যাংকে কোনো টাকা নেই, জমিজমাও নেই; আমার মেয়েরাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সঞ্চয়। চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ ভাবনা কয়রা উপজেলা শিক্ষা অফিসার তপন কুমার কর্মকার জানান, সকল শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনতে শিক্ষা দপ্তর থেকে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যার সুফল এখন দৃশ্যমান। তবে সুশীল সমাজের মতে, ঝরে পড়া রোধ, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এ অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে আরও টেকসই সহায়তা প্রদান করা জরুরি। কেবল ভর্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; নিয়মিত পাঠদান ও উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। দারিদ্র্য হয়তো সাময়িকভাবে জীবনকে থমকে দিতে পারে, কিন্তু শিক্ষা যে একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়Ñআজকের বিশ্ব কন্যা শিশু দিবসে কয়রার এই প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর অদম্য মেয়েরা সেই বার্তাই পৌঁছে দিচ্ছে পুরো দেশকে।
সংবাদ শিরোনাম
দারিদ্র্যকে হারিয়ে বই হাতে স্কুলের পথে কয়রার কন্যা শিশুরা
-
এস এম এ রউফ (কয়রা) খুলনা - আপডেট সময় ০৮:২৬:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
- 5
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























