ঢাকা ০৪:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুনামগঞ্জের কৃষকদের অভিযোগ : ফসলহানির জন্য পাউবোর পিআইসি বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সদস্যরাই দায়ী

ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জ জেলায় এবার মোট ১৩৭টি হাওরের মধ্যে ৫২টি হাওরেই প্রথমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে বর্তমানে শিলাবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। ইতিমধ্যে জেলার অন্যতম টাংগুয়ার হাওর,দেখার হাওর,চন্দ্রসোনারতল হাওরসহ বেশ কয়েকটি বড় হাওরে পানি বৃদ্ধি পেয়ে কৃষকের ক্ষেতের ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। মধ্যনগর উপজেলার আবিদনগরে জিনারিয়া বাঁধ ভেঙে হাওরে ডুকছে পানি। ডুবছে কৃষকের স্বপ্ন। দিরাইয়ে অতিবৃষ্টির কারণে ৭০% ভাগ ফসল এখনও গোলায় তুলতে পারেনি কৃষক। টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নদীর পানি বাড়ায় পানির তীব্র চাপে ভেঙে গেছে বাঁধ। সেই ভাঙন দিয়ে ঢুকে পড়া পানিতে তলিয়ে গেছে জিনারিয়া হাওরের বিস্তীর্ণ বোরো ধানক্ষেত। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে,হাওরে চাষাবাদের জন্য উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের বোলাই নদীর তীরে মুখশেদপুর এলাকায় বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা কৃষকেরা ছয় মাসের জন্য অস্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। জীবিকার তাগিদে স্থায়ী বাড়িঘর ছেড়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে বসবাস করে তারা হাওরের বুকে সোনালী ফসল ফলান। এ জন্য অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের পড়াশোনাও বন্ধ রাখাসহ নানান প্রতিকূলতা অতিক্রম করতে হয় তাদেরকে। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের চাপে বুধবার সকালে বোলাই নদীর পাশের একটি খালের বাঁধ ভেঙে যায়। এতে পানি ঢুকে জিনারিয়া হাওরের ফসলি জমি তলিয়ে যায়। হাওরের অধিকাংশ জমিতেই জিরাতি করতে আসা কৃষকেরা চাষাবাদ করে থাকেন। হঠাৎ এ বিপর্যয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। জিরাতি করতে আসা কৃষকেরা জানান,দীর্ঘদিন ধরে তারা নিজ গ্রাম ছেড়ে এখানে অস্থায়ী বসতি গড়ে ফসল ফলিয়ে আসছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন ভালো ফলনের আশায়। কিন্তু বাঁধ ভাঙনের পর সবকিছুই পানিতে ভেসে গেছে। মুখশেদপুরের কৃষক ভক্তরঞ্জন সরকার বলেন, “আমরা অনেক কষ্ট করে এই জমিতে ধান ফলিয়েছি। মাসের পর মাস বাড়িঘর ছেড়ে এখানে থাকছি। এখন সব পানির নিচে, আমরা একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। আরেক কৃষক ছলিম উদ্দিন বলেন,আমরা ধারদেনা করে জমি চাষ করেছি। ধান পাকাই ছিল, কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকায় কাটতে পারিনি। বাঁধ ভেঙে আমার ২০ কাটা জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না। উপজেলা কৃষি উপ-সহকারী কর্মকর্তা কবির হোসেন জানান,জিনারিয়া হাওরের ২৬ হেক্টর জমির মধ্যে বাঁধ ভাঙার আগেই জলাবদ্ধতায় ৮ হেক্টর তলিয়ে ছিল। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর আরও প্রায় ৩ হেক্টর জমি পানির নিচে চলে গেছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ ফেদাউর রহমান বলেন, সুনামগঞ্জে আগাম বন্যায় আবারও পানিতে ডুবে যাচ্ছে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন। মাঠভরা সোনালি ফসল আজ পানির নিচে, চোখে শুধু হতাশা আর অনিশ্চয়তা। প্রতিবারই একই চিত্র। বাঁধ নির্মাণের নামে অনিয়ম আর দুর্নীতি। কিন্তু টেকসই কোনো সমাধান নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবহেলা আর দুর্নীতির খেসারত দিচ্ছে নিরীহ কৃষকেরা। কৃষকের ঘাম আর পরিশ্রমের কোনো মূল্য কি নেই? এই দুঃখ, এই ক্ষতি কি শুধুই দেখার জন্য? এখনই সময় জবাবদিহিতা আর কার্যকর পদক্ষেপের নইলে প্রতিবছরই এভাবেই ডুবে যাবে আমাদের কৃষি আর কৃষকের ভবিষ্যৎ। এই বৎসর নতুন নিয়ম হচ্ছে ধান কাটার মেশিনগুলো তেলের জন্য প্রতি দিন দরখাস্ত দিবে। কৃষি অফিস তা মঞ্জুর করলে তার পরে তেলের পাম্পে লাইনে দাঁড়াতে হবে এই নিয়মগুলোর কারণে প্রতি দিন ৩ বা ৪ ঘন্টা মেশিন মালিক গুলোর সময় নষ্ট হচ্ছে। আপনারা অফিস করবেন ৯ টা বা ১০ টার দিকে মেশিন মালিকের তেলের দরকার সকালে ৬ টায় এইখানে ৩ বা ৪ ঘন্টা সময় নষ্ট হচ্ছে এইখানে দরকার ছিল কৃষি অফিস থেকে সকাল ৬ টার দিকে পাম্পে একজন লোক রাখা এক মাসের জন্য মেশিন মালিক গুলো তেলের জন্য যাবে সাথে সাথে তেল পাবে তাহলে সুনামগঞ্জের জন্য অনেক উপকার হইত। নতুন নিয়মের কারণে আজকের অনেক ধান কাটার মেশিন হাওরে থাকার পরেও ধান সময়মত কাটতে পারেনি। নিয়ম দরকার ছিল পাম্পে ধান কাটার মেশিনগুলো কে তেল দিতে পাম্পগুলোকে সকাল থেকে প্রস্তুত রাখা। আল্লাহ তুমি আমাদের সুনামগঞ্জ বাসি কে হেফাজত করেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের সংগীত পরিচালক মোঃ আপ্তাব মিয়া বলেন,হায়রে মানুষের কান্না,ভাষা নেই কিছু লিখার। কার দৃষ্টি আকর্ষণ করব তাও তো বুঝি না। আল্লাহ তুমি রক্ষা করো। হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জ এর সভাপতি রাজু আহমেদ বলেন-কৃষকের এই দূর্যোগের দায় সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা-উপজেলা প্রশাসন, পিআইসি ও মনিটরিং কমিটিসমূহ। কেননা এখন পর্যন্ত যেসকল হাওরের ফসলহানী হয়েছে তার উল্লেখযোগ্য কারণ সমূহ হলো, নির্ধারিত সময়ে ও বর্ধিত সময়ের মধ্যেও কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন না করা, বাঁধের দুর্বল অবকাঠামো,বাঁধে মাটির পরিমান কম ও উচ্চতা ওয়ার্ক ওয়ার্ডার অনুসারে না হওয়া,বাঁধে কোন প্রকারের কম্প্যাকশন না করা, ক্লোজারগুলিতে নিম্নমানের জিও কাপড়ের ব্যবহার, বড় বড় ক্লোজারগুলিতে নিম্নমানের বাঁশের ব্যবহার,পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসনের, উপজেলা প্রশাসনের ও মনিটরিং কমিটির গুলির যথাযথ তদারকির অভাব,পিআইসি কমিটিসমূহ গঠনে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অনিয়ম-দুর্নীতি। এসব বিষয়ে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন গত ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে কথা বলে আসছে। কিন্তু দায়িত্বশীল যারা তারা আমাদের এসব প্রতিবাদে,সুপারিশ ও দাবীসমূহে সুনজর রাখেননি। কৃষক আলাল হোসেন বলেন, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ আমাদের সোনালী ফসল রক্ষা করতে পারবেনা। সব চুরেরা স্থায়ী সমাধান না করে প্রতি বছর বাজেট আনে আর খায়। তিনি সুনামগঞ্জের এই ফসলহানীর জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সকল চিহ্নিত সদস্যদেরকেই দায়ী উল্লেখ করে অবিলম্বে তাদের গ্রেফতারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এদিকে আবহাওয়া অফিসসূত্রে জানা যায়,দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকার সুরমা-কুশিয়ারা ও ধনু এবং বৌলাই নদীর পানি সমতল রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নদীসমূহ প্রাক-মৌসুমী বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) এমন তথ্য জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উজানে মাঝারি-ভারি থেকে ভারি এবং অভ্যন্তরে হাওর অববাহিকায় ভারি থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়েছে। পাউবো জানিয়েছে, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, এ অঞ্চলে আগামী ৩রা মে পর্যন্ত ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল জিহান বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকার সিলেট, সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা-কুশিয়ারা পানির সমতল আগামী ৩ দিন বৃদ্ধি পেতে পারে। ৩য় দিন কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল প্রাক-মৌসুমি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং সুরমা নদীর পানির সমতল সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে, ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের দাবী আবাদ করা বোরো ধানের ৫০ শতাংশ কাটা শেষ হয়েছে উল্লেখ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন,আমরা জেলার ৫১টি হাওরে পিআইসি বাস্তবায়ন করলেও বর্তমানে সবগুলো হাওরই জলমগ্ন ও জলাবদ্ধতাপূর্ণ। এ অবস্থায় ক্ষেতের ধান ৮০ ভাগ পাকলেই কাটার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন হাওরের কৃষকরা বলেন,এখন ৫০ শতাংশ ধান পাকলেই তা কাটার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা কৃষকরা চেষ্টা করলেও তাতে কোনো লাভ হচ্ছে না। কারণ, বৃষ্টির প্রভাবে কাটা যাচ্ছে না হাওরের ধান। আসলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কারো কিছুই করার থাকে না। যদি আবহাওয়া একটু ভালো হয়, দ্রুত বাকি ধানগুলোও কেটে ফেলতে হবে। সুনামগঞ্জের সচেতন নাগরিকবৃন্ধের দাবী, এবারের ফসলহানীর জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির চিহ্নিত সুবিধাভোগী সদস্যরাই দায়ী। কারণ তাদের মধ্যে গোটাকয়েক পোষ্য সাংবাদিক ছাড়া প্রকৃত কৃষকের উপস্থিতি নেই। এদের একজনও প্রকৃতপক্ষে কোন হাওর পরিদর্শণ করেনি। দুর্নীতিবাজদের তেলমারা ও বরাদ্দের টাকার পার্সেন্টিজের ভাগ ভাটোয়ারা নিয়ে পকেটভারী করাই ছিল তাদের আজ। তথাকথিত মনিটরিং কমিটির সদস্যদেরকে গ্রেফতারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সুনামগঞ্জবাসী।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

সুনামগঞ্জের কৃষকদের অভিযোগ : ফসলহানির জন্য পাউবোর পিআইসি বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সদস্যরাই দায়ী

আপডেট সময় ০৯:৩৩:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জ জেলায় এবার মোট ১৩৭টি হাওরের মধ্যে ৫২টি হাওরেই প্রথমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে বর্তমানে শিলাবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। ইতিমধ্যে জেলার অন্যতম টাংগুয়ার হাওর,দেখার হাওর,চন্দ্রসোনারতল হাওরসহ বেশ কয়েকটি বড় হাওরে পানি বৃদ্ধি পেয়ে কৃষকের ক্ষেতের ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। মধ্যনগর উপজেলার আবিদনগরে জিনারিয়া বাঁধ ভেঙে হাওরে ডুকছে পানি। ডুবছে কৃষকের স্বপ্ন। দিরাইয়ে অতিবৃষ্টির কারণে ৭০% ভাগ ফসল এখনও গোলায় তুলতে পারেনি কৃষক। টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নদীর পানি বাড়ায় পানির তীব্র চাপে ভেঙে গেছে বাঁধ। সেই ভাঙন দিয়ে ঢুকে পড়া পানিতে তলিয়ে গেছে জিনারিয়া হাওরের বিস্তীর্ণ বোরো ধানক্ষেত। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে,হাওরে চাষাবাদের জন্য উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের বোলাই নদীর তীরে মুখশেদপুর এলাকায় বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা কৃষকেরা ছয় মাসের জন্য অস্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। জীবিকার তাগিদে স্থায়ী বাড়িঘর ছেড়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে বসবাস করে তারা হাওরের বুকে সোনালী ফসল ফলান। এ জন্য অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের পড়াশোনাও বন্ধ রাখাসহ নানান প্রতিকূলতা অতিক্রম করতে হয় তাদেরকে। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের চাপে বুধবার সকালে বোলাই নদীর পাশের একটি খালের বাঁধ ভেঙে যায়। এতে পানি ঢুকে জিনারিয়া হাওরের ফসলি জমি তলিয়ে যায়। হাওরের অধিকাংশ জমিতেই জিরাতি করতে আসা কৃষকেরা চাষাবাদ করে থাকেন। হঠাৎ এ বিপর্যয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। জিরাতি করতে আসা কৃষকেরা জানান,দীর্ঘদিন ধরে তারা নিজ গ্রাম ছেড়ে এখানে অস্থায়ী বসতি গড়ে ফসল ফলিয়ে আসছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন ভালো ফলনের আশায়। কিন্তু বাঁধ ভাঙনের পর সবকিছুই পানিতে ভেসে গেছে। মুখশেদপুরের কৃষক ভক্তরঞ্জন সরকার বলেন, “আমরা অনেক কষ্ট করে এই জমিতে ধান ফলিয়েছি। মাসের পর মাস বাড়িঘর ছেড়ে এখানে থাকছি। এখন সব পানির নিচে, আমরা একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। আরেক কৃষক ছলিম উদ্দিন বলেন,আমরা ধারদেনা করে জমি চাষ করেছি। ধান পাকাই ছিল, কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকায় কাটতে পারিনি। বাঁধ ভেঙে আমার ২০ কাটা জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না। উপজেলা কৃষি উপ-সহকারী কর্মকর্তা কবির হোসেন জানান,জিনারিয়া হাওরের ২৬ হেক্টর জমির মধ্যে বাঁধ ভাঙার আগেই জলাবদ্ধতায় ৮ হেক্টর তলিয়ে ছিল। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর আরও প্রায় ৩ হেক্টর জমি পানির নিচে চলে গেছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ ফেদাউর রহমান বলেন, সুনামগঞ্জে আগাম বন্যায় আবারও পানিতে ডুবে যাচ্ছে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন। মাঠভরা সোনালি ফসল আজ পানির নিচে, চোখে শুধু হতাশা আর অনিশ্চয়তা। প্রতিবারই একই চিত্র। বাঁধ নির্মাণের নামে অনিয়ম আর দুর্নীতি। কিন্তু টেকসই কোনো সমাধান নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবহেলা আর দুর্নীতির খেসারত দিচ্ছে নিরীহ কৃষকেরা। কৃষকের ঘাম আর পরিশ্রমের কোনো মূল্য কি নেই? এই দুঃখ, এই ক্ষতি কি শুধুই দেখার জন্য? এখনই সময় জবাবদিহিতা আর কার্যকর পদক্ষেপের নইলে প্রতিবছরই এভাবেই ডুবে যাবে আমাদের কৃষি আর কৃষকের ভবিষ্যৎ। এই বৎসর নতুন নিয়ম হচ্ছে ধান কাটার মেশিনগুলো তেলের জন্য প্রতি দিন দরখাস্ত দিবে। কৃষি অফিস তা মঞ্জুর করলে তার পরে তেলের পাম্পে লাইনে দাঁড়াতে হবে এই নিয়মগুলোর কারণে প্রতি দিন ৩ বা ৪ ঘন্টা মেশিন মালিক গুলোর সময় নষ্ট হচ্ছে। আপনারা অফিস করবেন ৯ টা বা ১০ টার দিকে মেশিন মালিকের তেলের দরকার সকালে ৬ টায় এইখানে ৩ বা ৪ ঘন্টা সময় নষ্ট হচ্ছে এইখানে দরকার ছিল কৃষি অফিস থেকে সকাল ৬ টার দিকে পাম্পে একজন লোক রাখা এক মাসের জন্য মেশিন মালিক গুলো তেলের জন্য যাবে সাথে সাথে তেল পাবে তাহলে সুনামগঞ্জের জন্য অনেক উপকার হইত। নতুন নিয়মের কারণে আজকের অনেক ধান কাটার মেশিন হাওরে থাকার পরেও ধান সময়মত কাটতে পারেনি। নিয়ম দরকার ছিল পাম্পে ধান কাটার মেশিনগুলো কে তেল দিতে পাম্পগুলোকে সকাল থেকে প্রস্তুত রাখা। আল্লাহ তুমি আমাদের সুনামগঞ্জ বাসি কে হেফাজত করেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের সংগীত পরিচালক মোঃ আপ্তাব মিয়া বলেন,হায়রে মানুষের কান্না,ভাষা নেই কিছু লিখার। কার দৃষ্টি আকর্ষণ করব তাও তো বুঝি না। আল্লাহ তুমি রক্ষা করো। হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জ এর সভাপতি রাজু আহমেদ বলেন-কৃষকের এই দূর্যোগের দায় সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা-উপজেলা প্রশাসন, পিআইসি ও মনিটরিং কমিটিসমূহ। কেননা এখন পর্যন্ত যেসকল হাওরের ফসলহানী হয়েছে তার উল্লেখযোগ্য কারণ সমূহ হলো, নির্ধারিত সময়ে ও বর্ধিত সময়ের মধ্যেও কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন না করা, বাঁধের দুর্বল অবকাঠামো,বাঁধে মাটির পরিমান কম ও উচ্চতা ওয়ার্ক ওয়ার্ডার অনুসারে না হওয়া,বাঁধে কোন প্রকারের কম্প্যাকশন না করা, ক্লোজারগুলিতে নিম্নমানের জিও কাপড়ের ব্যবহার, বড় বড় ক্লোজারগুলিতে নিম্নমানের বাঁশের ব্যবহার,পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসনের, উপজেলা প্রশাসনের ও মনিটরিং কমিটির গুলির যথাযথ তদারকির অভাব,পিআইসি কমিটিসমূহ গঠনে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অনিয়ম-দুর্নীতি। এসব বিষয়ে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন গত ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে কথা বলে আসছে। কিন্তু দায়িত্বশীল যারা তারা আমাদের এসব প্রতিবাদে,সুপারিশ ও দাবীসমূহে সুনজর রাখেননি। কৃষক আলাল হোসেন বলেন, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ আমাদের সোনালী ফসল রক্ষা করতে পারবেনা। সব চুরেরা স্থায়ী সমাধান না করে প্রতি বছর বাজেট আনে আর খায়। তিনি সুনামগঞ্জের এই ফসলহানীর জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সকল চিহ্নিত সদস্যদেরকেই দায়ী উল্লেখ করে অবিলম্বে তাদের গ্রেফতারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এদিকে আবহাওয়া অফিসসূত্রে জানা যায়,দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকার সুরমা-কুশিয়ারা ও ধনু এবং বৌলাই নদীর পানি সমতল রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নদীসমূহ প্রাক-মৌসুমী বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) এমন তথ্য জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উজানে মাঝারি-ভারি থেকে ভারি এবং অভ্যন্তরে হাওর অববাহিকায় ভারি থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়েছে। পাউবো জানিয়েছে, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, এ অঞ্চলে আগামী ৩রা মে পর্যন্ত ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল জিহান বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকার সিলেট, সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা-কুশিয়ারা পানির সমতল আগামী ৩ দিন বৃদ্ধি পেতে পারে। ৩য় দিন কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল প্রাক-মৌসুমি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং সুরমা নদীর পানির সমতল সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে, ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের দাবী আবাদ করা বোরো ধানের ৫০ শতাংশ কাটা শেষ হয়েছে উল্লেখ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন,আমরা জেলার ৫১টি হাওরে পিআইসি বাস্তবায়ন করলেও বর্তমানে সবগুলো হাওরই জলমগ্ন ও জলাবদ্ধতাপূর্ণ। এ অবস্থায় ক্ষেতের ধান ৮০ ভাগ পাকলেই কাটার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন হাওরের কৃষকরা বলেন,এখন ৫০ শতাংশ ধান পাকলেই তা কাটার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা কৃষকরা চেষ্টা করলেও তাতে কোনো লাভ হচ্ছে না। কারণ, বৃষ্টির প্রভাবে কাটা যাচ্ছে না হাওরের ধান। আসলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কারো কিছুই করার থাকে না। যদি আবহাওয়া একটু ভালো হয়, দ্রুত বাকি ধানগুলোও কেটে ফেলতে হবে। সুনামগঞ্জের সচেতন নাগরিকবৃন্ধের দাবী, এবারের ফসলহানীর জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির চিহ্নিত সুবিধাভোগী সদস্যরাই দায়ী। কারণ তাদের মধ্যে গোটাকয়েক পোষ্য সাংবাদিক ছাড়া প্রকৃত কৃষকের উপস্থিতি নেই। এদের একজনও প্রকৃতপক্ষে কোন হাওর পরিদর্শণ করেনি। দুর্নীতিবাজদের তেলমারা ও বরাদ্দের টাকার পার্সেন্টিজের ভাগ ভাটোয়ারা নিয়ে পকেটভারী করাই ছিল তাদের আজ। তথাকথিত মনিটরিং কমিটির সদস্যদেরকে গ্রেফতারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সুনামগঞ্জবাসী।