শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ০৯:৫৭ অপরাহ্ন




মদিনা রাষ্ট্র ও কুফার গভর্নর

হামিদ মীর:
  • আপডেট সময় শনিবার, ১৩ মার্চ, ২০২১
মদিনা রাষ্ট্র ও কুফার গভর্নর - ফাইল ছবি




আব্বাসী খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর সমকালীন অন্যতম বিখ্যাত মুহাদ্দিস শারিক বিন আবদুল্লাহ রাহ:কে অনুরোধ করলেন, তিনি যেন কুফার কাজী হন। (কাজী অর্থ বিচারপতি। অত্যন্ত সম্মানিত পদ। ইংরেজদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে এটি বিয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবে আমাদের সমাজে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। -অনুবাদক) শারিক বিন আবদুল্লাহ রাহ: ইমাম আবু হানিফা রাহ:-এর মতো অপারগতা প্রকাশ করলেন। মানসুর ইমাম আবু হানিফা রাহ:-এর অস্বীকৃতি মেনে নেননি। তবে তিনি শারিক রাহ:-এর প্রতি কঠোরতা অবলম্বনের পরিবর্তে জোরালো অনুরোধ করেন, রাষ্ট্রের এমন বিচারকদের প্রয়োজন, যারা ইসলামী শরিয়তের চাহিদা মোতাবেক জনগণকে খুব দ্রুত ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা করে দেবেন। খলিফার চাপাচাপিতে শারিক বিন আবদুল্লাহ রাহ: কাজীর পদ গ্রহণ করেন। খলিফা মানসুরের ইন্তেকালের পর তার পুত্র মাহদি মসনদে বসলে তিনিও শারিক বিন আবদুল্লাহ রাহ:-এর পদ বহাল রাখেন। একবার শারিক বিন আবদুল্লাহর আদালতে একজন নারী এলো এবং কুফার গভর্নর মুসা বিন ঈসার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করল যে, ‘তিনি আমার খেজুর বাগান জোরপূর্বক ক্রয় করতে চেয়েছেন। আমি তা বিক্রয় করতে অস্বীকার করলে তিনি আমার বাগানের দেয়াল ভেঙে দেন, যাতে বাধ্য হয়ে তার কাছে বাগান বিক্রয় করে দিই।’ বিষয়টা হলো, ফোরাত নদীর তীরে ওই নারীর পিতার একটি খেজুর বাগান ছিল। পিতার ইন্তেকালের পর এ বাগান ভাইবোনদের মাঝে বণ্টন করা হলে ওই নারী তার বাগানের চারধারে দেয়াল তুলে দেয়। গভর্নর মুসা এই নারীর ভাইদের থেকে এই বাগান ক্রয় করে নেন। কিন্তু সেই নারী তার অংশ গভর্নরের কাছে বিক্রয় করতে অস্বীকৃতি জানায়। সে গভর্নরের জোরজবরদস্তি থেকে মুক্তির জন্য কাজী শারিক বিন আবদুল্লাহর রাহ:-এর কাছে ফরিয়াদ জানায়। কাজী গভর্নর মুসাকে তার আদালতে তলব করেন। কাজীর দূত তলবের নির্দেশনামা নিয়ে তার কাছে গেলে গভর্নর ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি তার এক রক্ষীকে বললেন, কাজী সাহেবের কাছে যাও এবং তাকে বলো, তিনি যেন আমার পদের প্রতি খেয়াল রাখেন এবং এক মিথ্যাবাদী নারীর পাশে যেন আমাকে দাঁড় না করান। রক্ষী গভর্নর সাহেবের পয়গাম নিয়ে কাজী শারিক বিন আবদুল্লাহ রাহ:-এর কাছে গেলে কাজী সাহেব তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে বন্দী রাখার নির্দেশ দিলেন। গভর্নর যখন জানতে পারলেন, তার রক্ষীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তখন তিনি আরো রেগে গেলেন। তিনি একজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে কাজী সাহেবের কাছে পাঠালেন। ওই কর্মকর্তা কাজী সাহেবকে বললেন, ‘আমাদের রক্ষী তো শুধু গভর্নর সাহেবের একটি পয়গাম নিয়ে এসেছিল। আপনি তাকে কেন গ্রেফতার করলেন?’ কাজী বললেন, ‘আপনি একটি নাজায়েজ দাবি নিয়ে আমার কাছে এসেছেন এবং শরিয়তের চাহিদার বিরোধিতা করছেন।’ কাজী সাহেব ওই কর্মকর্তাকেও গ্রেফতার করলেন। গভর্নর যখন জানতে পারলেন, তার পাঠানো দ্বিতীয় দূতকেও গ্রেফতার করা হয়েছে, তখন তিনি আহত সাপের মতো মোচড়াতে লাগলেন। তিনি কুফার কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ডেকে বললেন, আপনারা কাজী সাহেবের কাছে যান এবং তাকে বলুন, তিনি আমাকে অপমানিত করেছেন। আমার পদের প্রতি কোনো খেয়ালই করা হচ্ছে না। আমি সাধারণ নাগরিক নই যে, আদালতে হাজিরা দেবো।’ এই বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গভর্নরের পয়গাম নিয়ে কাজী সাহেবের কাছে গেলে কাজী শারিক বিন আবদুল্লাহ রাহ: তাদের বললেন, ‘আপনারা বিশৃঙ্খলপরায়ণ মানুষ। সত্যের বিপক্ষে বিক্ষোভ করছেন এবং শরিয়তের আইন বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। আপনাদেরও কারাদ- ভোগ করতে হবে।’ কাজী সাহেব এই বিশিষ্ট নাগরিকদেরও গ্রেফতার করলেন। এই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেফতারের সংবাদ শোনার পর গভর্নর দিশেহারা হয়ে গেলেন। তিনি খলিফা মাহদির চাচা। ক্ষমতার নেশায় বুঁদ হয়েছিলেন। তিনি তার ঘোড়সওয়ার দল নিয়ে কারাগারে পৌঁছেন। কাজী সাহেব যাদের গ্রেফতার করেছিলেন তিনি তাদের সবাইকে মুক্ত করলেন।
পরের দিন কোতোয়াল কাজীকে অবহিত করলেন, গত রাতে গভর্নর সাহেব তার সব দূতকে কারাগার থেকে বের করে নিয়ে গেছেন। কাজী সাহেব আদালত স্থগিত করে দিলেন। তিনি বললেন, ‘এ পদ আমিরুল মুমিনিনের কাছে চেয়ে নিইনি। বরং তিনিই এ শর্তে এ পদ আমাকে সোপর্দ করেন যে, তিনি বা তার কোনো আমলা আদালতের কর্মে হস্তক্ষেপ করবেন না।’ শারিক বিন আবদুল্লাহ রাহ: কাজীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বাড়িতে গেলেন এবং বাগদাদ সফরের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলেন। যাতে আমিরুল মুমিনিনকে ইস্তফার কারণ অবহিত করতে পারেন। গভর্নর মুসা জানতে পারলেন, কাজী সাহেব ইস্তফা দিয়ে বাগদাদ যাচ্ছেন, তখন তার জ্ঞান ফিরে এলো। তিনি দ্রুত কাজী সাহেবের কাছে গেলেন এবং ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। কাজী সাহেব বললেন, যাদের আপনি কারাগার থেকে বের করে নিয়ে গেছেন, তাদের কারাগারে আবার পৌঁছিয়ে দিন। গভর্নর তাদের সবাইকে কারাগারে বন্দী করে দিলেন। এরপর গভর্নর আদালতে উপস্থিত হলেন। তাকে ফরিয়াদি নারীর সামনে দাঁড় করানো হলো। গভর্নর স্বীকার করলেন, ওই নারী সত্য বলছে। কাজী সাহেব ওই নারীর বাগানের দেয়াল পুনরায় নির্মাণ করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। গভর্নর নির্দেশ পালন করলেন এবং এভাবে এই ঘটনাটি ইসলামী ন্যায়বিচারের এক আলোকোজ্জ্বল দৃষ্টান্তে পরিণত হলো।
কাজী শারিক বিন আবদুল্লাহ রাহ: ন্যায়বিচারের ব্যবস্থার জন্য ক্ষমতাধর ব্যক্তির সামনে অটল থাকার সিদ্ধান্ত এই জন্য নেন যে, আল্লাহর শেষ নবী হজরত মুহাম্মাদ সা: যে মদিনা রাষ্ট্র কায়েম করেছিলেন, তার ভিত্তিও ছিল ন্যায়বিচার। একবার কুরাইশ বংশের এক নারী চুরি করল। কিছু মানুষ কুরাইশের মান-সম্মান রক্ষার্থে ওই নারীকে দ- থেকে রক্ষা করতে চাচ্ছিলেন। হজরত উসামা বিন জায়েদ রা: ওই নারীর পক্ষে সুপারিশ নিয়ে নবী করিম সা:-এর কাছে হাজির হলেন এবং ওই নারীর জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘বনি ইসরাঈল এ জন্য ধ্বংস হয়েছে যে, তারা দরিদ্রদের ওপর আইন প্রয়োগ করত এবং ধনীদের ক্ষমা করে দিত’। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমাও (অর্থাৎ আমার মেয়েও) চুরি করত, তাহলে আমি তার ওপরও আইন প্রয়োগ করতাম।’
রাসূলুল্লাহ সা: ওই নারীর হাত কর্তনের নির্দেশ দিলেন। ইসলামে কারো পদ, বর্ণ, গোত্র বা ধর্ম দেখে ন্যায়বিচার করা হয় না। কায়্যুম নিজামী তার ‘মুআমালাতে রাসূল সা:’ গ্রন্থে আবু বকর জাসসাসের একটি বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, এক মুসলমান কারো লৌহবর্ম চুরি করেছিল। যখন সে আশঙ্কা করল যে, এই চুরি প্রকাশ পেয়ে যাবে, তখন সে ওই লৌহবর্ম এক ইহুদির ঘরে ছুড়ে ফেলে দিলো। এই লৌহবর্ম ইহুদির ঘর থেকে উদ্ধার করা হলো। তবে ইহুদি চুরির বিষয়টি অস্বীকার করল। আসল চোর ইহুদিকে ফাঁসানোর জন্য অনেক মুসলমানকে সাথে ভিড়িয়ে নেয়। এই সময় আল্লাহ তায়ালা ওহির মাধ্যমে সে ইহুদিকে নিরপরাধ আখ্যায়িত করলেন। তিনি কুরআন মাজিদে বিভিন্ন স্থানে ন্যায়বিচার কায়েম করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর এ নির্দেশই মদিনা রাষ্ট্রে মুসলমান-অমুসলমানের অধিকার সংরক্ষণের নিশ্চয়তা প্রদান করে। এটাই সেই নির্দেশ, যা শারিক বিন আবদুল্লাহ রাহ:সহ অনেক কাজীর ঐতিহাসিক ফায়সালার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু ভাবনার বিষয় হলো, আজ যারা ‘মদিনা রাষ্ট্র’ কায়েম করার দাবি করেন, তাদের কথা ও কাজে কি আপনি শারিক বিন আবদুল্লাহ রাহ:-এর চরিত্রের ঝলক দেখতে পান, কিংবা কুফার গভর্নর মুসার চরিত্রের আলোকচ্ছটা?
নিজের আশপাশে নজর বুলান। নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত কোনো মজলুম নারী বিচারক পর্যন্ত সরাসরি পৌঁছতে পারে কি? উকিলের ফি আদায় ব্যতীত ন্যায়বিচার অর্জন বেশ কঠিন। ন্যাব (ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরো) থেকে ইলেকশন কমিশন অব পাকিস্তান পর্যন্ত কোথাও দ্রুত ন্যায়বিচার মেলে না। শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শিক্ষা দেয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ন্যাবকে। আর এই দফতরের ‘পলিটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ সাক্ষ্য তো সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরাও দিয়েছেন। অবশিষ্ট কর্মটুকু ইলেকশন কমিশন অব পাকিস্তান পুরো করে দিয়েছে। ইলেকশন কমিশনে ২০১৪ থেকে তেহরিকে ইনসাফের বিরুদ্ধে ফরেন ফান্ডিং কেস ঝুলে রয়েছে। মদিনা রাষ্ট্রের পতাকাবাহী তেহরিকে ইনসাফের উচিত ছিল, তারা এই কেস ঝুলে থাকা ও কেসের কার্যক্রম গোপন রাখার আবেদনের পরিবর্তে ইলেকশন কমিশনকে এটা বলা, তারা যেন দ্রুত কেসের ফায়সালা করেন। কিন্তু এই কেস ছয় বছর পর্যন্ত ঝুলিয়ে রেখে ইলেকশন কমিশন নিজেদের তামাশার পাত্র বানিয়েছেই, উপরন্তু পাকিস্তানকে মদিনা রাষ্ট্র বানানোর দাবিদারকে কুফার গভর্নর মুসার সাথে দাঁড়ও করিয়ে দিয়েছে।




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com