সোমবার, ০১ জুন ২০২০, ১০:৫৯ অপরাহ্ন




রমযান : কুরআন নাযিল ও বিজয়ের মাস

প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১০ মে, ২০২০
  • ৩০ বার পঠিত




 

|| প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী ||

রমযাস মাসেরই এক মহিমান্বিত রজনীতে মহান আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে মুহাম্মদ (সা)-এর উপর অবতীর্ণ হয় সর্বশেষ কিতাব আল কুরআন। মানবজাতির জন্য আল্লাহতায়ালার সবচেয়ে বড় নেয়ামত হলো হেদায়াত। আদি পিতা হযরত আদম (আ)-কে বেহেশত থেকে চলে আসার কথা বলা হলে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তাঁকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অভয়বাণী শোনানো হয়, ‘আমার পক্ষ থেকে যে হেদায়াত যাবে যারা তা অনুসরণ করবে তাদের কোনো ভয় নেই’। যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রসুল ও কিতাব দুনিয়ার বুকে প্রেরিত হয়েছে এবং সর্বশেষ রসুল হলেন মুহাম্মদ (সা) ও সর্বশেষ কিতাব হলো আল কুরআন।

মুহাম্মদ (সা) ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং সততা ও বিশ^স্ততার প্রতীক হিসেবে তাঁর জাতির কাছ থেকে আল-আমিন ও আস-সাদিক খেতাবপ্রাপ্ত। তিনি ছিলেন জাতির শ্রেষ্ঠ বন্ধু ও কল্যাণকামী এবং বিবাদ-বিসংবাদের মিমাংসাকারী ও মাল-সম্পদের হেফাজতকারী। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য! নবী হওয়ার পর জাতির কাছে ইসলামের দাওয়াত দানের সাথে সাথে তিনি ভয়ানক শত্রæ হয়ে পড়েন। সুদের বিরুদ্ধে কোনো কথা নেই, পর্দাহীনতার বিরুদ্ধে কথা নেই, দাসপ্রথার বিরুদ্ধেও কোনো কথা নেই, সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে তিনি আহবান জানান, ‘হে দুনিয়ার মানব সকল! তোমরা বলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তাহলেই তোমরা সফলকাম হবে’। এ কালেমা নিছক কোনো ধর্মীয় বাণী ছিল না, এ ছিল তাগুতের বিরুদ্ধে এক বিপ্লবাত্মক ঘোষণা। আরবের মুশরিকরা তাঁর এ আহবানের মর্ম উপলব্ধি করতে পেরেছিল। তাই শুরুতেই তারা প্রচন্ড বিরোধীতা করেছিল।

যুগে যুগে আগত সকল নবী-রসুলের একই দাওয়াত ছিল এবং সকলের সাথে যে আচরণ করা হয়েছিল মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে তার কোনো ব্যতিক্রম ছিল না। জাতির সাথে তাঁর গাদ্দারির কোনো প্রমাণ নেই এবং কিশোর বয়স থেকেই তিনি জাতির নানা খেদমত করে গেছেন। আরবের কুরাইশরা তাঁর সকল খেদমত এবং সততা ও বিশ^স্ততাকে ভুলে গিয়ে বিরুদ্ধাচরণ অব্যাহত রাখে। তাঁর দাওয়াত যত সম্প্রসারিত হতে থাকে বিরোধীতাও তত বাড়তে থাকে এবং সঙ্গী-সাথীরা নানাভাবে নির্যাতিত হতে থাকেন। হক ও বাতিলের এ দ্ব›দ্ব-সংগ্রাম চিরন্তন। দ্ব›দ্ব-সংগ্রাম এড়িয়ে পথ চলার কোনো কৌশল অতীতে কোনো নবী-রসুল গ্রহণ করতে পারেননি এবং মুহাম্মদ (সা)-কেও আল্লাহপাক শিখিয়ে দেননি। কিয়ামত পর্যন্ত যারাই নবী মুহাম্মদ (সা)-এর উত্তরসূরী হিসেবে যমিনে দায়িত্ব পালন করবেন তাদের সবার পরিণতি একই হবে এবং এটিই হকের মানদন্ড।

রসুল (সা)-এর দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল তাওহিদ, রেসালত ও আখিরাত। আল্লাহকে ইলাহ, মুহাম্মদ (সা)-কে রসুল ও আখিরাতে বিশ^াসের প্রতি আহবানের প্রেক্ষিতে কিছু সত্যপন্থী যুবক সাড়া দিয়ে মুহাম্মদ (সা)-এর দলভুক্ত হন। অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেলে এক পর্যায়ে আবিসিনিয়ায় অনেকে হিজরত করেন। সামাজিক বয়কটের কারণে ক্ষুধা-দারিদ্রসহ নানা ধরনের কষ্টের সম্মুখিন হন এবং শেষ পর্যায়ে কুরাইশরা তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করে। আরবের সকল গোত্র ও বংশে মুহাম্মদ (সা)-এর দাওয়াত পৌঁছে যায়। মদীনায় তাঁর দাওয়াতে বেশ সাড়া পড়ে। নবুয়তের দ্বাদশ বর্ষে মদীনা থেকে ৭৫ জন হজ্জ করতে এসে মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করে ইসলাম কবুল করেন এবং নবী (সা)-কে সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রæতি প্রদান করেন।

আল্লাহপাকের নির্দেশক্রমে মুহাম্মদ (সা) মদীনার হিজরত করার পর আরবের কুরাইশরা উপলব্ধি করে, ইসলামকে প্রতিহত করা তাদের জন্য এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। আরবের কুরাইশদের সিরিয়া থেকে বাণিজ্যের পথ হলো মদীনা এবং ইসলামের উত্থানে তারা বিপদ অনুভব করে। মদীনায় হিজরত করার পর ইসলাম আর কেবল ধর্ম নয়, রাষ্ট্রীয় দ্বীনে পরিণত হয় এবং মুহাম্মদ (সা) ¯্রফে কোনো ধর্মপ্রচারক নয়, নবগঠিত রাষ্ট্রের তিনি রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, প্রধান বিচারপতি, প্রধান সেনাপতি, এককথায় তিনি সর্বেসর্বা। তিনি উপলব্ধি করলেন, মদিনা রাষ্ট্রকে আরবের মুশরিকরা মেনে নেবে না এবং দ্রæত সময়ে তিনি তাঁর সাথীদের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেন। মদীনা এবং মদীনার আশে-পাশে বিশেষ করে বাণিজ্য পথের সন্নিকটের বিভিন্ন গোত্রের সাথে তিনি চুক্তিতে (কোথাও সহযোগিতার চুক্তি আবার কোথাও নিরপেক্ষতার চুক্তি) উপনীত হন। শুরু থেকেই তিনি বাণিজ্য পথে ছোট ছোট বাহিনী দিয়ে ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করেন এবং বাণিজ্য পথ ও আরবের কুরাইশদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য গোয়েন্দা তৎপরতায় মনোযোগ দেন।

হিজরি দ্বিতীয় সনে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কায় ফেরার পথে মদীনার সন্নিকটে পৌঁছে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে সাহায্যের জন্য তিনি মক্কায় লোক পাঠান। তাদের সাথে ছিল এক হাজার উট এবং এ সব উটে ৫০ হাজার স্বর্ণমুদ্রার সমপরিমাণ বিপুল মাল-সামান এবং মক্কার কুরাইশ সরদারদের অনেকের স্বার্থ নিহিত ছিল। আবু সুফিয়ানের আহবানে সাড়া দিয়ে তারা যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে উঠে। আল্লাহপাক বাণিজ্য কাফেলা ও যুদ্ধজয় যে কোনো একটি প্রদানের প্রতিশ্রæতি প্রদান করেন। রসুল (সা) তাঁর সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে যুদ্ধযাত্রার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেই যুদ্ধটি হয় মদীনার দক্ষিণ-পশ্চিমে ৮০ মাইল দূরে বদর উপত্যকায়। দিনটি ছিল ১৭ রমযান (১৭ মার্চ ৬২৪ খৃষ্টাব্দ)। আরবের কুরাইশরা বিপুল রণসম্ভারে সজ্জিত ছিল। আবু জাহল, উতবা ইবনে রাবিয়া ও উমাইয়া ইবনে খালফের নেতৃত্বে ৯৫০ জন সেনা, ১০০ ঘোড়া, ১৭০টি উট, সাথে ছিল ৬০০ লৌহবর্ম; এর বিপরিতে মুহাম্মদ (সা)-এর নেতৃতে ৩১৩ জনের ক্ষুদ্র বাহিনী (মুহাজির ৮২, আওস ৬১ ও খাজরাজ ১৭০) সাথে ২টি ঘোড়া ও ৭০টি উট। এই অসম যুদ্ধে মুসলমানদের ১৪ জন শহীদ হন এবং কুরাইশদের দলপতি আবু জাহলসহ ৭০ জন নিহত ও ৭০ জন বন্দী হয়। মুয়াজ ইবনে আমর ও মুয়াজ ইবনে আফরার দুই বালকের হাতে আবু জাহল, বিলালের (রা) হাতে তার মনিব উমাইয়া ইবনে খালফ ও ওমর (রা)-এর হাতে আপন মামা আস ইবনে হিশাম ইবনে মুগিরা নিহত হয়।

বদরের যুদ্ধে বিজয় মূলত কুরআনের বিজয় সূচিত হয়। আল্লাহপাক তাঁর রসুল (সা)-এর প্রেরণের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করতে গিয়ে একাধিক জায়গায় দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, সকল দ্বীনের ওপর আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করাই তাঁর নবী প্রেরণের উদ্দেশ্য। বদরের যুদ্ধে জয় লাভের মধ্য দিয়ে বিজয়ের সূচনা এবং বিভিন্ন যুদ্ধ-বিগ্রহ মাড়িয়ে অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে মূলত পূর্ণতা পায়। কোনো বাধা-প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই মক্কা বিজয় সংঘটিত হয় এই রমযান মাসে। তাই বলা যায়, রমযান অনেক বরকতের মাস। এই মাসে যেমন কুরআন নাযিল হয়েছে তেমনি কুরআনের বিজয়ও ঘটেছে এই মাসে। এটি আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, কুরআনের কারণেই রমযানের এতো ফজিলত ও মর্তবা এবং ঈমানদারদের প্রতি রোযা ফরজ করা হয়েছে। আল্লাহপাক কুরআনকে পাঠিয়েছেন বিজয়ীর আসনে সমাসীন করার জন্য যাতে কুরআনের হুকুম-আহকাম সমাজে কার্যকর হয়। রমযানের রোযা পালনের মধ্য দিয়ে একদল মুত্তাকী বান্দাহ গড়ে উঠবে যারা জীবনের সকল ক্ষেত্রে কুরআনের বিধান মেনে চলার সাথে সাথে সমাজে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালাবে। আল্লাহপাক আমাদেরকে সেই তাওফিক দান করুন।

লেখক: উপাধ্যক্ষ (অব), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ।




নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..










© All rights reserved © 2018 Daily Khoborpatra
Theme Developed BY ThemesBazar.Com