ঢাকা ০১:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাতের স্পর্শেই উঠে যাচ্ছে সড়কের পিচ : কয়রায় আড়াই কোটি টাকার প্রকল্পে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’

তপ্ত পিচ আর পাথরের মিশ্রণে যে সড়ক হওয়ার কথা ছিল টেকসই ও মজবুত, খুলনার কয়রা উপজেলায় তা রূপ নিয়েছে এক পশলা তামাশায়! এলজিইডির অধীনে নির্মাণাধীন একটি সড়কে ধুলোবালি পরিষ্কার না করেই ঢালাই দেওয়ায়, হাতের সামান্য স্পর্শেই উঠে আসছে পিচের আস্তরণ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এমন ‘মশকরা’ দেখে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী কাজ বন্ধ করে দিলে, তড়িঘড়ি করে স্থান ত্যাগ করেছেন শ্রমিকরা। উপজেলার উত্তর মাদারবাড়ী সীমানা থেকে রোনবাগ কেয়ার অভিমুখে ১ কিলোমিটারের এই সড়ক সংস্কারে ব্যয় হচ্ছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা। কিন্তু উদ্বোধনের আগেই সড়কের কঙ্কাল দশা দেখে ক্ষোভের আগুনে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কয়রা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল দপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, মেসার্স কামরুল এন্ড ব্রাদার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উত্তর মাদারবাড়ী থেকে রোনবাগ কেয়ার সড়ক এবং হড্ডা-বেদকাশী সড়ক পাঁকাকরণের কাজ পায়। যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া এই কাজ একই বছরের নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও ঠিকাদার তা করতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে ‘রিপ্যাকেজিং’-এর মাধ্যমে হড্ডা-বেদকাশী অংশটি বাদ দিয়ে শুধু মাদারবাড়ী-রোনবাগ ১ কিলোমিটার সড়কের জন্য সময় বাড়ানো হয়। তবে রহস্যজনক কারণে এলজিইডি অফিস থেকে বর্ধিত সময় ও সংশোধিত বরাদ্দের সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। সোমবার (২৪ জুন) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক অদ্ভুত দৃশ্য। মাত্র ৫০০ মিটার পিচ ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যেই অন্তত চারটি বড় স্থানে কার্পেটিং পুরোপুরি উঠে গেছে। কাজ শেষ হওয়ার আগেই ভেঙে পড়ছে গাইডওয়াল, দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। রাস্তার ওপর পড়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা পর্যন্ত পরিষ্কার করা হয়নি। নামমাত্র ‘প্রাইম কোড’ (বিটুমিনের আঠালো স্তর) দিয়ে তার ওপর পিচ ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। পাথরের মিশ্রণে বিটুমিনের পরিমাণ এতটাই কম যে, এক সপ্তাহ আগের ঢালাইও হাত দিয়ে টান দিলেই উঠে আসছে। এটা রাস্তা নয়, আমাদের সাথে প্রতারণা! এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, ঢালাইয়ের সময় এলজিইডির তদারকি প্রকৌশলীদের উপস্থিত থাকার নিয়ম থাকলেও সাইটে তাদের দেখাই মেলে না। এই সুযোগে ঠিকাদারের লোকজন নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজ করেছে এবং প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই মোটা অঙ্কের বিল তুলে নিয়েছে। কাজের মান নিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য জামাল ফারুক জাফরিন বলেন, একেবারে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে দায়সারা কাজ করা হচ্ছিল। জনগণের টাকায় এই হরিলুট মেনে নেওয়া যায় না বলেই স্থানীয়রা কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। ?তবে সাব-ঠিকাদার হাসান শেখের দাবি ভিন্ন। তিনি বৃষ্টির ওপর দায় চাপিয়ে বলেন, প্রাইম কোড ঠিকই দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে। আমরা ১৮ মাইলের বাবলু ভাইয়ের প্ল্যান্ট থেকে মিক্সচার এনেছি। যেখানে যেখানে ত্রুটি হয়েছে, সেগুলো ঠিক করে দেওয়া হবে। এদিকে বিটুমিনের রাস্তা হাত দিয়ে উঠে যাওয়াকে এক প্রকার স্বাভাবিক দাবি করে কয়রার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা প্রকৌশলী শাফিন শোয়েব বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। বিটুমিনের রাস্তা জমাট বাঁধতে কিছুটা সময় লাগে। তবে প্রাইম কোড কম দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখে ত্রুটিপূর্ণ স্থানে পুনরায় ঢালাইয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঠিকাদারের ‘বৃষ্টির অজুহাত’ আর প্রকৌশলীর ‘জমাট বাঁধার তত্ত্ব’ স্থানীয়দের ক্ষোভ থামাতে পারছে না। কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল উত্তোলন এবং দৃশ্যমান অনিয়মের বিরুদ্ধে একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন কয়রার সচেতন মহল। টেকসই সড়ক না হলে এই আড়াই কোটি টাকা সরাসরি সরকারের অপচয় এবং জনগণের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন তারা।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

হাতের স্পর্শেই উঠে যাচ্ছে সড়কের পিচ : কয়রায় আড়াই কোটি টাকার প্রকল্পে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’

আপডেট সময় ০৩:৫০:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

তপ্ত পিচ আর পাথরের মিশ্রণে যে সড়ক হওয়ার কথা ছিল টেকসই ও মজবুত, খুলনার কয়রা উপজেলায় তা রূপ নিয়েছে এক পশলা তামাশায়! এলজিইডির অধীনে নির্মাণাধীন একটি সড়কে ধুলোবালি পরিষ্কার না করেই ঢালাই দেওয়ায়, হাতের সামান্য স্পর্শেই উঠে আসছে পিচের আস্তরণ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এমন ‘মশকরা’ দেখে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী কাজ বন্ধ করে দিলে, তড়িঘড়ি করে স্থান ত্যাগ করেছেন শ্রমিকরা। উপজেলার উত্তর মাদারবাড়ী সীমানা থেকে রোনবাগ কেয়ার অভিমুখে ১ কিলোমিটারের এই সড়ক সংস্কারে ব্যয় হচ্ছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা। কিন্তু উদ্বোধনের আগেই সড়কের কঙ্কাল দশা দেখে ক্ষোভের আগুনে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কয়রা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল দপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, মেসার্স কামরুল এন্ড ব্রাদার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উত্তর মাদারবাড়ী থেকে রোনবাগ কেয়ার সড়ক এবং হড্ডা-বেদকাশী সড়ক পাঁকাকরণের কাজ পায়। যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া এই কাজ একই বছরের নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও ঠিকাদার তা করতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে ‘রিপ্যাকেজিং’-এর মাধ্যমে হড্ডা-বেদকাশী অংশটি বাদ দিয়ে শুধু মাদারবাড়ী-রোনবাগ ১ কিলোমিটার সড়কের জন্য সময় বাড়ানো হয়। তবে রহস্যজনক কারণে এলজিইডি অফিস থেকে বর্ধিত সময় ও সংশোধিত বরাদ্দের সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। সোমবার (২৪ জুন) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক অদ্ভুত দৃশ্য। মাত্র ৫০০ মিটার পিচ ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যেই অন্তত চারটি বড় স্থানে কার্পেটিং পুরোপুরি উঠে গেছে। কাজ শেষ হওয়ার আগেই ভেঙে পড়ছে গাইডওয়াল, দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। রাস্তার ওপর পড়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা পর্যন্ত পরিষ্কার করা হয়নি। নামমাত্র ‘প্রাইম কোড’ (বিটুমিনের আঠালো স্তর) দিয়ে তার ওপর পিচ ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। পাথরের মিশ্রণে বিটুমিনের পরিমাণ এতটাই কম যে, এক সপ্তাহ আগের ঢালাইও হাত দিয়ে টান দিলেই উঠে আসছে। এটা রাস্তা নয়, আমাদের সাথে প্রতারণা! এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, ঢালাইয়ের সময় এলজিইডির তদারকি প্রকৌশলীদের উপস্থিত থাকার নিয়ম থাকলেও সাইটে তাদের দেখাই মেলে না। এই সুযোগে ঠিকাদারের লোকজন নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজ করেছে এবং প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই মোটা অঙ্কের বিল তুলে নিয়েছে। কাজের মান নিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য জামাল ফারুক জাফরিন বলেন, একেবারে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে দায়সারা কাজ করা হচ্ছিল। জনগণের টাকায় এই হরিলুট মেনে নেওয়া যায় না বলেই স্থানীয়রা কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। ?তবে সাব-ঠিকাদার হাসান শেখের দাবি ভিন্ন। তিনি বৃষ্টির ওপর দায় চাপিয়ে বলেন, প্রাইম কোড ঠিকই দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে। আমরা ১৮ মাইলের বাবলু ভাইয়ের প্ল্যান্ট থেকে মিক্সচার এনেছি। যেখানে যেখানে ত্রুটি হয়েছে, সেগুলো ঠিক করে দেওয়া হবে। এদিকে বিটুমিনের রাস্তা হাত দিয়ে উঠে যাওয়াকে এক প্রকার স্বাভাবিক দাবি করে কয়রার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা প্রকৌশলী শাফিন শোয়েব বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। বিটুমিনের রাস্তা জমাট বাঁধতে কিছুটা সময় লাগে। তবে প্রাইম কোড কম দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখে ত্রুটিপূর্ণ স্থানে পুনরায় ঢালাইয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঠিকাদারের ‘বৃষ্টির অজুহাত’ আর প্রকৌশলীর ‘জমাট বাঁধার তত্ত্ব’ স্থানীয়দের ক্ষোভ থামাতে পারছে না। কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল উত্তোলন এবং দৃশ্যমান অনিয়মের বিরুদ্ধে একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন কয়রার সচেতন মহল। টেকসই সড়ক না হলে এই আড়াই কোটি টাকা সরাসরি সরকারের অপচয় এবং জনগণের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন তারা।