মঙ্গলবার, ০১ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:৫৯ পূর্বাহ্ন

একমাত্র মেয়েকে নিয়ে অথৈ সাগরে শহীদ জাহিদের স্ত্রী

খবরপত্র ডেস্ক:
  • আপডেট সময় রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনে বাবা জাহিদুল ইসলাম শহীদ হওয়ায় ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে শিশু কন্যা জাহিদার (১০)। ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দিন আশুলিয়া থানার মোড়ে গুলিতে প্রাণ হারান জাহিদ। স্বামীর মৃত্যুতে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে স্ত্রী রিনা যেন অথৈ সাগরে পড়েছেন। অন্ধকার হয়ে পড়েছে ভবিষ্যৎ। উপার্জনক্ষম বড় ছেলেকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন জাহিদের অসুস্থ বাবা-মা’ও।
জাহিদুল ইসলামের (২৮) গ্রামের বাড়ি আমরুলবাড়ী হাঠখোলা পাড়া গ্রামের বদরগঞ্জ থানার রংপুরে। স্ত্রী রিনা আর দশ বছরের কন্যা সন্তান জাহিদাকে নিয়ে থাকতেন আশুলিয়ার বসুন্ধরা নতুনবাজার এলাকায়। বাবার নাম রফিকুল ইসলাম (৬০) এবং মায়ের নাম আমেনা বেগম (৪৪)। দাদা মৃত শাহাবুদ্দিন এবং দাদী মৃত রহিমা খাতুন। নানার নাম মৃত আমীর হোসেন ও নানীর নাম রোকেয়া বেগম (৭০)।
আলমগীর এবং আনোয়ারুল নামের আরও দু’টি ছোট ভাই রয়েছে জাহিদুলের। স্ত্রী আর মেয়ে নিয়ে পেশায় নরসুন্দর (নাপিত) জাহিদুল ইসলামের সংসার ভালোই চলছিল।
বেশ সুখে শান্তিতেই কাটছিল তাদের ৩ জনের ছোট্ট সংসার। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অন্যদের সাথে প্রায়ই অংশ নিতো অদম্য সাহসী জাহিদুল। প্রতিবাদী মিছিলের সামনের সারিতেই দেখা যেত তাকে। বাসায় এসে স্ত্রী-স্বজনদের বলতো সে কথা। ৫ আগস্ট ২০২৪-ও স্থানীয় ছাত্র-জনতার সাথে আন্দোলনে যোগ দেয় সে। মিছিলের সামনের সারিতেই ছিল সে। বিকেলে আশুলিয়া থানার মোড়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন জাহিদুল। ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরন করে শহীদ হন জাহিদুল। জাহিদুলের মৃত্যুতে পুরো পরিবারটিই যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। পরিবার জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ৫ আগস্ট সরাতেই শহীদ জাহিদুল ইসলামকে আশুলিয়ার বসুন্ধরা নতুন বাজার এলাকায় কবরস্ত করা হয়।
বাবার কথা বলতে গিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছে শিশু জাহিদা। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছে। বাবার কথা জিজ্ঞেস করতেই কাদঁতে শুরু করে দেয় সে। কিছুই বলতে পারছে না।
শহীদ জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী রিনা বাসসকে জানান, আমার স্বামী আশুলিয়া এলাকায় নাপিতের কাজ করতো। মাঝে মাঝেই ছাত্র-জনতার সাথে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে চলে যেত সে। নিষেধ করলেও আমার কথা শুনত না। ৫ আগস্টও আন্দোলনরত অন্যদের সাথে আশুলিয়া থানার মোড়ে গেলে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করে সে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিনা বলেন, আমাদের একটি মেয়ে রয়েছে। তার বয়স ১০ বছর। আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। মাদ্রাসায় ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। কীভাবে তাকে নিয়ে বাকিটা জীবন আমাদের চলবে। ভবিষ্যতে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারবো কিনা তাও জানি না। সংসার কিভাবে চলবে? এমন অবস্থায় সংশ্লিষ্টদের কাছে ভবিষ্যতের জন্য স্থায়ী একটা ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি স্বামীর খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে বলেন, কাউকে হত্যা করার আগে অন্যরা যেন এ থেকে শিক্ষা পায়। শহীদ জাহিদুল ইসলামের শ্যালক হাবিব মিয়া বাসসকে বলেন, দুলাভাই ভালো মানুষ ছিলো। তার মৃত্যুতে আমার বোনের পরিবারটি পুরো এলোমেলো হয়ে গেছে। ১০ বছরের ছোট্ট একটি মেয়ে আছে। এমন অবস্থায় মেয়েকে নিয়ে আমার বোনটি এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। তার ভবিষ্যৎই বা কী? তাদের সহায়তায় সমাজের বিত্তবানসহ সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
শহীদ জাহিদুল ইসলামের ছোট ভাই আনোয়ারুল বাসসকে মুঠোফোনে জানান, আমার ভাই ছিল অত্যন্ত সাহসী। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকেই অন্যদের সাথে আন্দোলনে অংশ নিতো সে। ভয় তাকে দমাতে পারেনি। মিছিলের সামনের সারিতেই দেখা যেতো আমার ভাইকে।
ঘাতকরা আমার ভাইকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে’ উল্লেখ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি। আনোয়ারুল বলেন, ঘরে আমার অসুস্থ বাবা-মা। এখন তাদের ভরণ-পোষণই দায় হয়ে পড়েছে। তারা কীভাবে চলবে? চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে গেলে খাবার জোগাড় করতে সমস্যা হয়ে যায়। ভাইয়ের মৃত্যুতে আমার বড় ভাবি ও ভাতিজি অকূল সাগরে পড়েছে। ভাইয়ের মৃত্যু আমাদের সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে।
শহীদ জাহিদুল ইসলামের মা আমেনা বেগম মুঠোফোনে বাসসকে বলেন, আমার ছেলে অনেক ভালো ছিল। আমাদের খোঁজ-খবর রাখতো সবসময়। পরিবারের পাশাপাশি আমাদের ভরণ-পোষণ চালাতো আমার ছেলে। আমার ছেলেকে ওরা মেরে ফেলেছে। এখন আমাদের কী হবে? আমার স্বামী অন্ধ। চোখে দেখতে পায় না। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত। ওষুধ কীভাবে কিনব? খাবারেরই ব্যবস্থা কীভাবে হবে?
সরকারের কাছে জাহিদুলের স্ত্রী-সন্তানসহ নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য স্থায়ী একটা ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে আমি তাদের কঠোর শাস্তি চাই।
শহীদ জাহিদুল ইসলামের বাবা সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ রফিকুল ইসলাম বাসসকে মুঠোফোনে জানান, ছোট বেলা থেকেই আমার ছেলে জাহিদুল অনেক সাহসী ছিল। সব কিছুতেই সে সবার আগে ছুটে যেতো। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনেও ও নাকি সবার আগে মিছিলে চলে যেতো। সামনের দিকে থাকত। পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে মরতে হলো তাকে।
রফিকুল ইসলাম বলেন, অভাব-অনটনের সংসারে এখন আমাদের বেচেঁ থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। আমরা স্বামী-স্ত্রী বৃদ্ধ মানুষ। অসুস্থ থাকায় বারো মাস ওষুধ খেতে হয়। জাহিদুলের পরিবারসহ নিজেদের দেখভালের দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি নিজের মৃত্যুর আগে ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে চান বৃদ্ধ রফিকুল ইসলাম। শহীদ জাহিদুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনায় তার ছোট ভাই আনোয়ারুল বাদী হয়ে ৭৪ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে ৫ লাখ টাকা এবং জামায়াতে ইসলামী থেকে ২ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছে শহীদ জাহিদুল ইসলামের পরিবার।




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com