বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪, ০৫:৫৭ অপরাহ্ন

নবী-রাসূলদের প্রতি ঈমান

নূরুল ইসলাম খলিফা :
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

ফেরেশতা ও কিতাবের প্রতি ঈমানের অপরিহার্য দাবি হয়ে যায় নবুয়ত বা রিসালাতের প্রতি ঈমান আনা। পৃথিবীতে মানুষ আল্লাহর বড়ই প্রিয় সৃষ্টি। বহুমুখী দায়িত্ব ও কর্তব্য দেয়া হয়েছে মানুষের ওপর। কেননা মর্যাদার দিক দিয়ে মানুষই সেরা এবং তাকে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধিত্বের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। পৃথিবীতে এই গুরুদায়িত্ব পালন শেষে মানুষ ফিরে যাবে তাদের ‘রব’ বা পালনকর্তার কাছে। যারা এ দায়িত্ব পালনে সফল হবে, তাদের জন্য রয়েছে অফুরন্ত নেয়ামতে ভরা জান্নাত যেখানে তারা চিরকাল থাকবে। মৃত্যুহীন সে জীবনের কোনো সময়সীমা নেই। আর যারা ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ফিরে যাবে তাদের জন্যও রয়েছে অবর্ণনীয় শাস্তি ও আজাব। জাহান্নাম বা দোজখের সেই ভয়াবহতম শাস্তির মাঝেই থাকতে হবে চিরকাল-অন্তহীন সেই জীবন। এই সফলতা ও ব্যর্থতার মাপকাঠি কী সে কথাগুলোই আল্লাহ তাঁর কিতাবে খুবই স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। ঘটনা এ পর্যন্তই শেষ হতে পারত। আল্লাহ ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাঁর কিতাব কোনো নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দিয়ে মানুষকে জানিয়ে দিতে পারতেন যে, কিতাব অমুখ স্থানে আছে তোমরা সে কিতাব মেনে চলো এবং মেনে চললে শান্তি এবং অশেষ পুরস্কার আর না মানলেই আজাব ও ধ্বংস।
কিন্তু আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে বাছাই করে কিছু মানুষের কাছে এই কিতাব পাঠিয়েছেন এবং আসমানি কিতাবের নির্দেশনাগুলো কেমন করে অনুশীলন বা জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে তা হাতে-কলমে দেখিয়ে দেয়ার দায়িত্বও তাঁদের ওপর দিয়েছেন। এরাই হচ্ছেন নবী-রাসূল বা পয়গম্বর। এই মহান মানুষরা অন্যান্য মানষের মতোই রক্ত-মাংসে গড়া ছিলেন এবং সাধারণ মানুষের মতো তারা আহার নিদ্রায় অভ্যস্থ ছিলেন। তাঁরা হাটে বাজারে যেতেন, বিয়ে ও সংসারধর্ম করেছেন। কিন্তু এর পরও তাঁরা ছিলেন মানব জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। তাঁরা আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত, আল্লাহ কর্তৃক প্রশিক্ষিত গোটা মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম নমুনা বা আদর্শ। আল্লাহ প্রদত্ত ওহির নির্দেশনা তাঁরা অক্ষরে অক্ষরে নিজেদের জীবনে পালন করে মানবজাতিকে দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করতে হয়। এ কাজ করতে গিয়ে তারা অসহনীয় দুঃখ কষ্ট বরণ করেছেন; এমনকি যুদ্ধবিগ্রহ পর্যন্ত তাদের করতে হয়েছে। এই মহামানবরা ছিলেন নিষ্পাপ, ত্রুটিহীন এবং নিষ্কলঙ্ক। তাদের জীবনে স্ববিরোধিতা, অন্যায় ও অসত্যের কাছে নতি স্বীকার এগুলো ছিল না। এদের সংখ্যা ছিল অজস্র। প্রচলিত একটি বর্ণনা আছে যে, নবী-রাসূলদের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার বা দুই লাখ ৪০ হাজার। এই নবী-রাসূলদের প্রতি তাদের উল্লিখিত দায়িত্ব ও গুণাবলিসহ বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অপরিহার্য শর্ত। কুরআন মাজিদে সরাসরি নাম পাওয়া যায় এমন নবী-রাসূলের সংখ্যা হচ্ছে ২৫ জন।
দুনিয়ার বুকে প্রথম আগমনকারী মানুষটি কোনো অজ্ঞতার অন্ধকারে পা রাখেননি। তিনি যেমন প্রথম মানুষ তেমনি প্রথম নবীও। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ তথা গোটা মানব জীবন কিভাবে পরিচালিত হওয়া দরকার, কোন পথ শান্তি ও সমৃদ্ধির, কোন পথ উন্নতি ও প্রগতির এবং কোন পথ বিভ্রান্তি ও গোমরাহির সে জ্ঞান নিয়েই তিনি এসেছিলেন এবং এই সাথে জীবনের নানা সময়ে নানামুখী সমস্যায় কিভাবে চলতে হবে, কোন কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ক্ষমা এগুলো সময়ে সময়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রতি ওহি নাজিল করেছেন। তিনি তাঁর দায়িত্ব শেষ করে চলে যাওয়ার পর তাঁর সন্তানরা নবুয়াতের সেই রাজপথ ধরে জীবন পরিচালনা করেছেন। এরপর ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি এসেছে, মানুষ তার নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী জীবনযাপনের মধ্যেই তৃপ্তি খোঁজার চেষ্টা করেছে; আল্লাহ প্রদত্ত এবং নবী প্রদর্শিত পথ এভাবে একসময় বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। মানুষ পুরোপুরি গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে এবং মানব জীবন অন্যায়, অনাচার, জুলুম, নিপীড়নে ছেয়ে গেছে। এ অবস্থায় আল্লাহ আবার একজনকে নবী হিসেবে বাছাই করেছেন, মানুষকে পথের সন্ধান দেয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন এবং এ কাজ কিভাবে করতে হবে, হেদায়াতের পথ কী হবে, সে সম্পর্কে পথনির্দেশনা দিয়েছেন। এটাই ওহি বা আসমানি কিতাব। এমনি করেই মানব সভ্যতা অগ্রসর হয়েছে।
এভাবে পর্যায়ক্রমে যখনই দুনিয়ার মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত সঠিক পথ ভুলে চরম গোমরাহির অন্ধকারে ডুবে গেছে, তখন আবার হেদায়াতের উজ্জ্বল আলো নিয়ে আরেকজন নবী এসেছেন। এই ধারাবাহিকতার সমাপ্তি ঘটেছে নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা:-এর মাধ্যমে। একই সাথে আসমানি কিতাব অবতীর্ণ হওয়া তথা সরাসরি ওহি আসার ধারাও বন্ধ হয়ে গেছে। দুনিয়ার শেষ দিন পর্যন্ত মানবজাতিকে পথ দেখানোর জন্য মুহাম্মদ সা:-এর ওপর নাজিলকৃত আল কুরআন তথা আসমানি কিতাবের সর্বশেষ সংস্করণ যথেষ্ট বলেই আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন। এই কিতাব নাজিল করেছেন আল্লাহ এবং তা সংরক্ষণের দায়িত্বও আল্লাহ পাক নিজেই নিয়েছেন। সুতরাং কিতাবের প্রতি ঈমান আনলেই রাসূলের প্রতি ঈমান আনতে হবে। আবার রাসূলের প্রতি ঈমান আনার সাথে ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনা জরুরি। এই তিনটি বিষয় একটি ত্রিভুজ সম্পর্কে জড়িত।
এখন নবী-রাসূলদের প্রতি ঈমানের বিষয়টি কেমন হবে? ঈমানের দাবি হচ্ছে- সব নবী-রাসূলের প্রতিই বিশ্বাস স্থাপন করা। আল্লাহর পরিষ্কার ঘোষণা হলো- নবীদের মধ্যে কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করা যাবে না। নবী-রাসূলগণ আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত এবং আল্লাহ তায়ালার নির্দেশনা মাফিক মানবজাতির হেদায়াতের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছেন- এ বিষয়ে তাঁদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র , সময় ও পরিধি বিবেচনায় আল্লাহ কোনো কোনো নবী-রাসূলের মর্যাদা বেশি দিয়েছেন। যেমন- ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে অনেকের চেয়ে বেশি মর্যাদা দিয়েছেন। তাঁকে আল্লাহ তায়ালা নিজের বন্ধু বা খলিল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর বংশধরদের মধ্যে অসংখ্য নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন। বর্তমান বিশ্বের তিনটি প্রধান একেশ্বরবাদী ধর্মের পূর্বপুরুষ ইবরাহিম (আ:)।
নবী-রাসূলদের প্রতি ঈমানের এই প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন কেউ কেউ উত্থাপন করতে পারে যে, সব নবী-রাসূলই তো আল্লাহ মনোনীত এবং তাঁদের কাছে পাঠানো কিতাবসমূহ আল্লাহর পক্ষ থেকেই নাজিল হয়েছে। এখন আমরা কোন নবীর অনুসরণ করব? এদের যে কোনো একজনকে অনুসরণ করলেই কি চলবে? আমরা সরকারি বিধানের বিষয়ে জানি যে, একই কর্তৃপক্ষ বিধিবিধান জারি করলেও মেনে চলতে হয় সর্বশেষ জারিকৃত বিধান; কেননা সর্বশেষ বিধান জারি হওয়া মানেই আগের বিধান বা নিয়ম বাতিল হয়ে যাওয়া। তেমনি আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বশেষ নাজিলকৃত কিতাবও পূর্ববর্তী বিধানকে বাতিল করে দেয়। সুতরাং কিতাবের মতোই সর্বশেষ নবী বা রাসূলকে মেনে চলা আবশ্যক, কারণ তাঁর মাধ্যমেই আমাদের কাছে কিতাব এসেছে এবং এই কিতাবের বিধিবিধান জীবনে বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে তিনিই আমাদের সামনে মডেল বা নমুনা। এটি কোনো পক্ষপাত বা ভাবাবেগের কথা নয় , যুক্তি-বুদ্ধি ও জ্ঞানের দাবি এটাই। লেখক : সাবেক সিনিয়র ব্যাংকার




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com