যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে ১২৩ বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে বেলারুশ। মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী মানবাধিকারকর্মী আলেস বিআলিয়াতস্কি এবং শীর্ষ বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোলেসনিকোভা। এর বিনিময়ে বেলারুশের ওপর পটাশ রপ্তানিসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা।
এতে বলা হয়, শনিবার বেলারুশ বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত জন কোয়েল মিনস্কে দেশটির প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোর সঙ্গে দুই দিনব্যাপী আলোচনার পর এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। বেলারুশ বিশ্বে পটাশ উৎপাদনে অন্যতম শীর্ষ দেশ। যা সার তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এই বন্দিমুক্তিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লুকাশেঙ্কোর সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২০ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর বিরোধীদের দমন-পীড়ন ও ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সমর্থনের কারণে পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে তাকে একঘরে করে রেখেছিল।
এদিকে ইউক্রেনের যুদ্ধবন্দি সমন্বয় কেন্দ্র জানিয়েছে, বেলারুশ ১১৪ জন বন্দিকে তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। এদের মধ্যে ইউক্রেনের নাগরিক ছাড়াও ইউক্রেনের গোয়েন্দাদের সঙ্গে কাজের অভিযোগে আটক ব্যক্তি এবং বেলারুশের রাজনৈতিক বন্দিরা রয়েছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে পাঁচজন ইউক্রেনীয় নাগরিক রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বৃটেন ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফলকে কারচুপিপূর্ণ বলে প্রত্যাখ্যান করে লুকাশেঙ্কোকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। একই সঙ্গে আরোপ করা হয় কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। ফলে বেলারুশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশটির প্রধান আন্তর্জাতিক মিত্র হিসেবে এখনও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনই রয়েছেন।
পোল্যান্ডের ওয়ারশ থেকে আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বেলারুশের সাবেক কূটনীতিক পাভেল স্লুনকিন বলেন, এই বন্দিমুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও বেলারুশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার ভাষায়, এর ফলে লুকাশেঙ্কো ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বৈধতা ফিরে পেতে পারেন এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হতে পারে।
নির্বাসিত বিরোধী নেত্রী স্বিয়াতলানা তিখানোভস্কায়া এই উদ্যোগের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, পটাশ নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে বন্দিমুক্তি প্রমাণ করে যে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর চাপ হিসেবে কাজ করে। তবে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন।
মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিদের গন্তব্য নিয়ে শুরুতে স্পষ্টতা না থাকলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নয়জন লিথুয়ানিয়ায় এবং ১১৪ জন ইউক্রেনে গেছেন। লিথুয়ানিয়ার ভিলনিয়াস থেকে সাবেক জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রতিবেদক আনাইস মারিন বলেন, এটি অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্ত। অনেক বন্দির পরিবারের সদস্যরা পাঁচ বছর ধরে কোনো খোঁজ পাননি।
শান্তিতে নোবেলজয়ী আলেস বিআলিয়াতস্কির স্ত্রী নাতালিয়া পিনচুক জানান, তিনি সুস্থ আছেন এবং লিথুয়ানিয়ার পথে রয়েছেন। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি তার মুক্তিতে গভীর স্বস্তি ও আনন্দ প্রকাশ করেছে এবং বেলারুশে সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তির আহ্বান জানিয়েছে।
মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে আরও রয়েছেন ২০২০ সালের গণআন্দোলনের অন্যতম নেতা মারিয়া কোলেসনিকোভা এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুকাশেঙ্কোর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া বিরোধী রাজনীতিক ভিৎকার বাবারিকা। ইউক্রেনে পৌঁছে কোলেসনিকোভা বলেন, স্বাধীন প্রথম সূর্যাস্ত দেখার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এটি অসাধারণ আনন্দের মুহূর্ত। বিশ্লেষকদের মতে, এই বন্দিমুক্তি ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্ত বেলারুশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।