মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজে যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। অমর একুশের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে কলেজ প্রাঙ্গণ সাজানো হয়েছিল বর্ণিল সাজে। একুশের প্রথম প্রহরে কলেজের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণে এক বিশাল প্রভাত ফেরি বের করা হয়। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ এই কালজয়ী গানের সুরে সুরে নগ্ন পায়ে সবাই কলেজের শহীদ মিনারে উপস্থিত হন এবং পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে একটি বিশেষ ‘দেয়ালিকা’ উন্মোচন করা হয় যা ছিলো শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। অমর একুশে উপলক্ষে কলেজ ক্যাম্পাসে আয়োজন করা হয় বিশেষ আলোচনা সভার। কলেজের রেক্টর প্রফেসর তরুণ কান্তি বড়ুয়ার সভাপতিত্বে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কলেজের অধ্যক্ষ ড. সঞ্জয় কুমার ধর এবং মাতৃভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে তথ্যবহুল বক্তব্য দেন শিক্ষক প্রতিনিধি মোস্তাকিয়া মাহমুদা পারভীন ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. শাফাকাত চৌধুরী সয়াদ।
স্বাগত বক্তব্যে কলেজের অধ্যক্ষ ড. সঞ্জয় কুমার ধর বলেন, ‘ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং ভাষা হলো একটি জাতির প্রাণের স্পন্দন ও আত্মপরিচয়। যারা নিজ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না কিংবা ভাষাকে সম্মান জানাতে জানে না; তারা মূলত নিজেদের শিকড়, গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এবং পূর্বপুরুষদের মহান আত্মত্যাগকেই অস্বীকার ও অসম্মান করে। তাই বর্তমান প্রজন্মের উচিত এই ভাষার সঠিক চর্চা ও সংরক্ষণে ব্রতী হওয়া’। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ভেন প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো মধ্যযুগের প্রখ্যাত কবি আব্দুল হাকিমের পঙক্তি ‘যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’ স্মরণ করে উপস্থিত সবাইকে দেশপ্রেমে প্রাণিত হওয়ার আহবান জানান। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, ‘মাতৃভাষা কেবল কথা বলার মাধ্যম নয়, আমাদের আত্মপরিচয়, আবেগ ও চিন্তার প্রকাশে প্রধান ভিত্তি’। ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাস, প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন অনুষ্ঠানের সভাপতি রেক্টর প্রফেসর তরুণ কান্তি বড়ুয়া। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক আন্দোলন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবী, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলন ও বিজয়। প্রফেসর তরুণ কান্তি বড়ুয়া বলেন ২০২৪ সালে সংঘঠিত ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের কথা যার মাধ্যমে এদেশের মানুষ পেয়েছে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন। তিনি নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং ন্যায় ভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা বাস্তবায়নের অনুরোধ করেন। প্রফেসর তরুণ কান্তি বড়ুয়া এসময় মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বঙ্গভাষা’ কবিতা থেকে আবৃত্তি করেন প্রথম চার চরণ। ‘হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন/ তা সবে অবহেলা করি/ পরধন লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ/ পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি’ এই আবৃত্তির মাধ্যমে প্রফেসর তরুণ কান্তি বড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দেন যে, পৃথিবীর যেখানেই আমরা যাই না কেন, নিজ দেশ ও মাতৃভাষার টান কখনও ভোলা সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানের শেষাংশে কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়, যেখানে ছিল দেশাত্মবোধক গান ও কবিতা আবৃত্তি। অনুষ্ঠানের সার্বিক সাফল্য কামনা করে এবং উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন কলেজে জাতীয় দিবস উদযাপন কমিটির আহবায়ক ও বাংলা বিভাগের সিনিয়র প্রভাষক রতন কুমার ধর। সমগ্র অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সাবলীল ও প্রাণবন্তভাবে সঞ্চালনা করেন সহকারী শিক্ষক রানজুনি চাকমা। উল্লেখ্য যে, মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে গত ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি কলেজ প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের চিত্রাঙ্কন ও সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল।