মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল ২০২১, ০১:৫৭ পূর্বাহ্ন




শীর্ষ উদ্যোক্তা ও নির্বাহী তৈরির পাঠশালা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ

খবরপত্র ডেস্ক:
  • আপডেট সময় রবিবার, ২৮ মার্চ, ২০২১




স্বাধীনতার পর দেশে ব্যক্তি খাতের বিকাশের পথ ধরে গড়ে উঠেছে উদ্যোক্তা শ্রেণী। প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রয়োজন হয়েছে দক্ষ শীর্ষ নির্বাহীর। উদ্যোক্তার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের বড় অংশই জোগান দিয়েছে ষাটের দশকের শেষভাগে যাত্রা করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ)। দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ও দিচ্ছেন এমন অনেকেই আইবিএ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। সরকারের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার আইবিএ গ্র্যাজুয়েট। বর্তমানে অর্থ বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। দেশের উদ্যোক্তা শ্রেণীর শীর্ষদের মধ্যেও রয়েছে আইবিএ গ্র্যাজুয়েট। দেশের অন্যতম বৃহৎ কনগ্লোমারেট সামিট গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আজিজ খান আইবিএ গ্র্যাজুয়েট। এ প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণকারী পোশাক খাতের উদ্যোক্তা অধ্যাপক আবদুল মোমেন বর্তমানে বিজিএমইএর পরিচালক। অন্যতম শীর্ষ জব পোর্টাল বিডি জবসের শীর্ষ নির্বাহী একেএম ফাহিম মাশরুরও রয়েছেন এ তালিকায়।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে আইবিএ থেকে গ্র্যাজুয়েশন বা পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী নাসের এজাজ বিজয়, ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আরএফ হুসেইন, আইপিডিসি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমিনুল ইসলাম, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।
শুধু দেশের মধ্যেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেয়া বাংলাদেশী ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন আইবিএ গ্র্যাজুয়েট। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক মালয়েশিয়ার প্রধান নির্বাহী আবরার আনোয়ার আইবিএ গ্র্যাজুয়েট। এছাড়া এ প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন ইউনিলিভার দক্ষিণ এশিয়ার হেড অব মার্কেটিং ট্রান্সফরমেশন জাভেদ আখতার ও বিএটির মানবসম্পদ বিভাগের রুমানা রহমান।
বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্বে থাকা আইবিএ গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে আরো রয়েছেন সিঙ্গার বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী হামিম রহমাতুল্লাহ, নিয়েলসন বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী আনাম মাহমুদ, বিএটিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেহজাদ মুনিম, ডিএইচএল এক্সপ্রেস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিয়ারুল হক আইবিএর সাবেক শিক্ষার্থী।
দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন খাতের ১৩২টি কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের ঘোষিত শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য বিশ্লেষণ করে বণিক বার্তা। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন ৮৮ জন। এর মধ্যে ৫৭ জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, যাদের ১৫ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর প্রাক্তন ছাত্র।
জানতে চাইলে আইবিএ পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে করপোরেট প্রতিষ্ঠান তেমন ছিল না, অর্থনীতির আকারও ছিল ছোট। পরবর্তী সময়ে কার্যক্রম শুরু করা শিল্প-ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনেক আইবিএ গ্র্যাজুয়েট ছিলেন। তখন ব্যাংক খাতে প্রয়োজনও ছিল মানসম্মত কর্মীর। এছাড়া বাংলাদেশে এসসিবি, সিঙ্গার, বাংলাদেশ অক্সিজেন ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ইস্পাহানিতেও আইবিএ গ্র্যাজুয়েট ছিলেন।
আইবিএ শিক্ষার্থী-কর্মীদের মধ্যেও অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন জানিয়ে সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার বলেন, খাজা নাজিমুদ্দিন ভূইয়া ছিলেন আইবিএর তৃতীয় ব্যাচের ছাত্র। পরে তিনি বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন। এছাড়া বীর প্রতীক শাহজামান মজুমদার ও সেলিম আকবর ছিলেন যথাক্রমে আইবিএর ১১ ও ১২তম ব্যাচের ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপকদের অনেকেই আইবিএ গ্র্যাজুয়েট ছিলেন। সেই ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছে আইবিএ। বর্তমান রাজনীতিবিদদের মধ্যেও অনেক আইবিএ গ্র্যাজুয়েট পাওয়া যাবে। শাহরিয়ার আলম ও নাজমুল হক পাপন তাদের অন্যতম। এভাবে ব্যবসা ও রাজনীতি থেকে শুরু করে আমলাতন্ত্র সব ক্ষেত্রে আইবিএ গ্র্যাজুয়েটদের উজ্জ্বল উপস্থিতি রয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আইবিএ গ্র্যাজুয়েটরা স্থান করে নিয়েছেন। আইবিএ ব্যাপ্তি ও সরব উপস্থিতি বেড়েছে ১৯৯৩ সালে বিবিএ চালুর পর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসন বিষয় চালু করার পরিকল্পনা শুরু হয় পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। ১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মসূচির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন আইবিএর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক এম শফিউল্লাহ। সেখানেই তিনি এমবিএ চালু করার বিষয়ে উৎসাহ পান। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে প্রফেসর শফিউল্লাহ তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে নতুন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি হিসেবে এমবিএ চালু করার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে সম্মত হয়ে উপাচার্য এম শফিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে দেন। যার সম্ভাব্যতা যাচাই হয় ফোর্ড ফাউন্ডেশনের কারিগরি এবং আর্থিক সহায়তায়। সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে ২৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে একটি আলাদা ইনস্টিটিউট গঠনের বিষয়ে পরামর্শ উঠে আসে।
আইবিএ-সংশ্লিষ্টদের মতে, এমবিএর ধারণাটাই ছিল যারা বিভিন্ন ডিসিপ্লিন থেকে পাস করেছেন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছেন এমন ব্যক্তিদের জন্য একটা পেশাদার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এ ধারণাকে কেন্দ্র করেই দুই বছরের এমবিএর প্রচলন শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৬৩ সালে এ উপমহাদেশে ধারণাটার বাস্তবায়ন হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে। কিন্তু তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন স্থাপন করা হয় করাচিতে।
বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইবিএর কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৬৬ সালে। দুই বছরের মাস্টার অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এমবিএ ডিগ্রি দিয়ে যাত্রা করে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনের সঙ্গে অংশীদারিত্বে গড়ে তোলা আইবিএ। ১৯৭০ সালে আইবিএ চালু করে মাস্টার অব ফিলোসফি (এমফিল) ও ডক্টর অব ফিলোসফি (পিএইচডি)। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে আবার গতিশীল হয় আইবিএ। এরপর ১৯৯৩ সালে শুরু হয় ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ)। ২০০৭ সালে চালু হয় এক্সিকিউটিভ এমবিএ। আর ২০১৩ সালে চালু হয় ডিবিএ বা ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন।-বণিকবার্তা




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com