ঢাকা ০৪:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo সুনামগঞ্জে মাঠ জুড়ে রোপা আমন চারার সবুজের সমারোহ Logo পাবনার রুপপুরে পৌঁছেছে ইউরেনিয়ামের ২য় চালনের গাড়িবহর Logo অবশেষে উদ্ধার হলো নাজিরপুরের আলোচিত ট্রলার ডুবির নিখোঁজ রিনা বেপারীর মৃত দেহ Logo রায়পুরে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা Logo বিজয়া দশমীতে নিমাগাছী মাতৃমন্দিরের উদ্যোগে ৬৩ অসহায় পরিবারের মাঝে বস্ত্র বিতরণ Logo সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় মসজিদের ধানক্ষেতে তৃতীয়বার বিষ প্রয়োগের অভিযোগ! Logo দিনাজপুরে সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় Logo সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন এখন বাংলাদেশ-আমান উল্লাহ আমান Logo বুড়িচংয়ে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে র‌্যালি-আলোচনা সভা Logo মেলান্দহে অসহায় বৃদ্ধের পাশে ইউএনও জিন্নাতুল আরা, খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাবুই পাখির বাসা এখন আর চোখে পড়ে না

আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নিপুণ বাসা তৈরিতে দক্ষ কারিগর বাবুই পাখি ও এর বাসা এখন আর আগের মত চোখে পড়ে না। পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজার, নতুন বনায়নে বাসযোগ্য পরিবেশ ও খাদ্যের অভাব, নির্বিচারে তালগাছ কর্তন, অসাধু শিকারীর ফাঁদসহ বহুবিধ কারণে কালের আবর্তে প্রকৃতির স্থপতি, বয়ন শিল্পী এবং সামাজিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি বাবুই পাখি ও এর দৃষ্টিনন্দন বাসা ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগেও গ্রামগঞ্জে ব্যাপক ভাবে বাবুই পাখির বাসা চোখে পড়ত। নিরীহ, শান্ত প্রকৃতির এই বাবুই পাখি উচু এবং নিরিবিলি পরিবেশে বাসা তৈরি করে। এরা গ্রামগঞ্জের তাল, সুপারি, নারিকেল, খেজুর গাছে বাসা তৈরি করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। এ সব গাছের সংকটে মাঝে মাঝে হিজল গাছেও বাসা বাধতে দেখা যায়। কিন্তু কালের বিবর্তনে বড় বড় গাছ নিধন ও পাখি শিকারের কারণে পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি। উঁচু তাল, নারিকেল ও খেজুর গাছে বাসা বাঁধলেও ওইসব গাছ বিলুপ্ত হওয়ায় বাবুই পাখিও হারিয়ে যেতে বসেছে প্রকৃতি থেকে। এই পাখি বাসা তৈরির কাজে ব্যবহার করে খড়ের ফালি, ধানের পাতা, তালের কচি পাতা, ঝাউ ও কাঁশবনের লতা। চমৎকার আকৃতির এই বাসা বিশেষ করে তাল গাছের ডালে এমনভাবে সাটানো থাকে যাতে কোনো ঝড়-তুফানে সহসাই ছিড়ে না পড়ে। এদের বাসা শুধু শৈল্পিক নিদর্শনই নয়, মানুষের মনে চিন্তার খোরাক জোগায় এবং স্বাবলম্বী হতে উৎসাহিত করে। ঠোট দিয়ে বাবুই পাখি আন্তর ছড়ায়। পেট দিয়ে ঘঁষে তা আবার মসৃণ করে। বাসা বানাতে শুরুতই দুটি নিম্নমুখী গর্ত করে থাকে। পরে তা একদিকে বন্ধ করে ডিম পাড়ার জায়গা করে। অন্যদিকে লম্বা করে প্রবেশ ও প্রস্থান পথ তৈরি করে। ব্যালেন্স করার জন্য বাসার ভিতরে কাদার প্রলেপ দেয়। আধুনিক যুগে যা বড়ই যুক্তি সংগত। বাসার ভিতরে ঠিক মাঝখানে একটি আড়া তৈরি করে বাবুই পাখি। কি অপূর্ব বিজ্ঞান সম্মত চেতোনাবোধ। ছোট হলেও বুদ্ধিতে সব পাখিকে হার মানায়। বাবুই ডিমে তা দেয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা ফোটে। কৃষকের ধান ঘরে ওঠার মৌসুম হল বাবুই পাখির প্রজনন মৌসুম। বাবুই পাখির বাসা শুধু শৈল্পিক নিদর্শনই না, মানুষকে আত্মনির্ভশীল হতে উৎসাহ দেয়। কৃষ্ণনগর গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি অলেক মিয়া বলেন- “গত কয়েক বছর ধরে তাদের গ্রামের কয়েকটি তালগাছে বাবুই পাখিন বাসা দেখছেন। পাখি ও পাখির বাসা দেখতে এবং কিচির মিচির শব্দ শুনতে খুবই ভাল লাগে। গৃহিনী আসমা বেগম বলেন, তাদের বাড়ির সামনের তাল গাছে বাবুই পাখি বাসা বানিয়েছে। সাংস্কৃতিককর্মী মাহমুদ জানান, দিন দিন তাল গাছ নিধন ও অবাধে পাখি শিকারের ফলে বাবুই পাখি আজ বিলুপ্তির পথে। তাই বড় বড় তাল গাছ রক্ষা ও নতুন করে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পাখি সংরক্ষণের দাবি জানান তিনি। সুর স¤্রাট আলাউদ্দীন খাঁ ডিগ্রি কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, “সারাবিশ্বে বাবুই পাখির প্রজাতির সংখ্যা ১১৭টি। তবে বাংলাদেশে তিন প্রজাতির বাবুই পাখির বাস। তিনি আরও বলেন, বাবুই পাখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো রাতের বেলায় ঘর আলোকিত করার জন্য এরা জোনাকি পোকা ধরে নিয়ে বাসায় রাখে এবং সকাল হলে আবার তাদের ছেড়ে দেয়। ধান, চাল, গম ও পোকা-মাকড় প্রভৃতি তাদের প্রধান খাবার। বাবুই পাখির জন্মগত ভাবেই শৈল্পিক দক্ষতা থাকে। কিভাবে বাসা বাঁধবে এটা তারা তাদের মায়ের কাছ থেকেই শিখে নেয়। এই গুণ আর অন্য পাখির মধ্যে নেই। এরা সমাজবদ্ধ ভাবে বসবাস করে বলে তাদের সামাজিক পাখিও বলা হয়। এরা শস্য দানা, ধান, গম ইত্যাদি খেয়ে জীবনধারণ করে। তিনি বলেন, এ পাখির মধ্যে একটি বৈজ্ঞানিক গুণও আছে। পুরুষ পাখিরা বিশ্রামের জন্য বাসা বাঁধে আর নারী পাখিরা বাসা বাঁধে ডিম ফুটানো ও বাচ্চা সংরক্ষণের জন্য। যখন বাচ্চা ফোটার সময় হয় তখন মা পাখিরা এক টুকরা গোবর নিয়ে বাসায় রাখে। যাতে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে বাচ্চাদের ক্ষতি করতে না পারে”।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

সুনামগঞ্জে মাঠ জুড়ে রোপা আমন চারার সবুজের সমারোহ

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাবুই পাখির বাসা এখন আর চোখে পড়ে না

আপডেট সময় ০৩:০০:২৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নিপুণ বাসা তৈরিতে দক্ষ কারিগর বাবুই পাখি ও এর বাসা এখন আর আগের মত চোখে পড়ে না। পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজার, নতুন বনায়নে বাসযোগ্য পরিবেশ ও খাদ্যের অভাব, নির্বিচারে তালগাছ কর্তন, অসাধু শিকারীর ফাঁদসহ বহুবিধ কারণে কালের আবর্তে প্রকৃতির স্থপতি, বয়ন শিল্পী এবং সামাজিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি বাবুই পাখি ও এর দৃষ্টিনন্দন বাসা ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগেও গ্রামগঞ্জে ব্যাপক ভাবে বাবুই পাখির বাসা চোখে পড়ত। নিরীহ, শান্ত প্রকৃতির এই বাবুই পাখি উচু এবং নিরিবিলি পরিবেশে বাসা তৈরি করে। এরা গ্রামগঞ্জের তাল, সুপারি, নারিকেল, খেজুর গাছে বাসা তৈরি করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। এ সব গাছের সংকটে মাঝে মাঝে হিজল গাছেও বাসা বাধতে দেখা যায়। কিন্তু কালের বিবর্তনে বড় বড় গাছ নিধন ও পাখি শিকারের কারণে পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি। উঁচু তাল, নারিকেল ও খেজুর গাছে বাসা বাঁধলেও ওইসব গাছ বিলুপ্ত হওয়ায় বাবুই পাখিও হারিয়ে যেতে বসেছে প্রকৃতি থেকে। এই পাখি বাসা তৈরির কাজে ব্যবহার করে খড়ের ফালি, ধানের পাতা, তালের কচি পাতা, ঝাউ ও কাঁশবনের লতা। চমৎকার আকৃতির এই বাসা বিশেষ করে তাল গাছের ডালে এমনভাবে সাটানো থাকে যাতে কোনো ঝড়-তুফানে সহসাই ছিড়ে না পড়ে। এদের বাসা শুধু শৈল্পিক নিদর্শনই নয়, মানুষের মনে চিন্তার খোরাক জোগায় এবং স্বাবলম্বী হতে উৎসাহিত করে। ঠোট দিয়ে বাবুই পাখি আন্তর ছড়ায়। পেট দিয়ে ঘঁষে তা আবার মসৃণ করে। বাসা বানাতে শুরুতই দুটি নিম্নমুখী গর্ত করে থাকে। পরে তা একদিকে বন্ধ করে ডিম পাড়ার জায়গা করে। অন্যদিকে লম্বা করে প্রবেশ ও প্রস্থান পথ তৈরি করে। ব্যালেন্স করার জন্য বাসার ভিতরে কাদার প্রলেপ দেয়। আধুনিক যুগে যা বড়ই যুক্তি সংগত। বাসার ভিতরে ঠিক মাঝখানে একটি আড়া তৈরি করে বাবুই পাখি। কি অপূর্ব বিজ্ঞান সম্মত চেতোনাবোধ। ছোট হলেও বুদ্ধিতে সব পাখিকে হার মানায়। বাবুই ডিমে তা দেয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা ফোটে। কৃষকের ধান ঘরে ওঠার মৌসুম হল বাবুই পাখির প্রজনন মৌসুম। বাবুই পাখির বাসা শুধু শৈল্পিক নিদর্শনই না, মানুষকে আত্মনির্ভশীল হতে উৎসাহ দেয়। কৃষ্ণনগর গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি অলেক মিয়া বলেন- “গত কয়েক বছর ধরে তাদের গ্রামের কয়েকটি তালগাছে বাবুই পাখিন বাসা দেখছেন। পাখি ও পাখির বাসা দেখতে এবং কিচির মিচির শব্দ শুনতে খুবই ভাল লাগে। গৃহিনী আসমা বেগম বলেন, তাদের বাড়ির সামনের তাল গাছে বাবুই পাখি বাসা বানিয়েছে। সাংস্কৃতিককর্মী মাহমুদ জানান, দিন দিন তাল গাছ নিধন ও অবাধে পাখি শিকারের ফলে বাবুই পাখি আজ বিলুপ্তির পথে। তাই বড় বড় তাল গাছ রক্ষা ও নতুন করে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পাখি সংরক্ষণের দাবি জানান তিনি। সুর স¤্রাট আলাউদ্দীন খাঁ ডিগ্রি কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, “সারাবিশ্বে বাবুই পাখির প্রজাতির সংখ্যা ১১৭টি। তবে বাংলাদেশে তিন প্রজাতির বাবুই পাখির বাস। তিনি আরও বলেন, বাবুই পাখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো রাতের বেলায় ঘর আলোকিত করার জন্য এরা জোনাকি পোকা ধরে নিয়ে বাসায় রাখে এবং সকাল হলে আবার তাদের ছেড়ে দেয়। ধান, চাল, গম ও পোকা-মাকড় প্রভৃতি তাদের প্রধান খাবার। বাবুই পাখির জন্মগত ভাবেই শৈল্পিক দক্ষতা থাকে। কিভাবে বাসা বাঁধবে এটা তারা তাদের মায়ের কাছ থেকেই শিখে নেয়। এই গুণ আর অন্য পাখির মধ্যে নেই। এরা সমাজবদ্ধ ভাবে বসবাস করে বলে তাদের সামাজিক পাখিও বলা হয়। এরা শস্য দানা, ধান, গম ইত্যাদি খেয়ে জীবনধারণ করে। তিনি বলেন, এ পাখির মধ্যে একটি বৈজ্ঞানিক গুণও আছে। পুরুষ পাখিরা বিশ্রামের জন্য বাসা বাঁধে আর নারী পাখিরা বাসা বাঁধে ডিম ফুটানো ও বাচ্চা সংরক্ষণের জন্য। যখন বাচ্চা ফোটার সময় হয় তখন মা পাখিরা এক টুকরা গোবর নিয়ে বাসায় রাখে। যাতে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে বাচ্চাদের ক্ষতি করতে না পারে”।