ঘূর্ণিঝড় আইলার প্রলয়ঙ্করী তান্ডবের পর দেখতে দেখতে ১৭টি বছর পার হয়ে গেছে। দীর্ঘ এই সময়ে দেশের অনেক উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই বেড়িবাঁধ ও অবকাঠামো গড়ে উঠলেও, খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের শাকবাড়িয়া বদ্ধ নদী তীরের দৃশ্যপট আজও বদলায়নি। প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন ভাঙন কবলিত অংশে একটি স্থায়ী বাঁধ ও সড়ক নির্মাণ না হওয়ায় প্রতিনিয়ত জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে হাজারও মানুষকে। বিশেষ করে ড্রামের তৈরি নড়বড়ে ভেলায় চড়ে দড়ি টেনে পার হতে গিয়ে প্রতিদিন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে কোমলমতি স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতের পর কয়রার মহারাজপুর ইউনিয়নের পবনা এলাকায় বেড়িবাঁধ মারাত্মকভাবে ভেঙে যায়। জোয়ারের তান্ডবে বাঁধের ভেতরে পানি ঢুকে এক নিমেষেই মুছে যায় আশপাশের সড়ক যোগাযোগ। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য স্থানে উপকূল রক্ষা বাঁধ দেওয়া সম্ভব হলেও প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন প্রায় ১৭০ মিটারের ভাঙা অংশটি আজও অরক্ষিত থেকে গেছে। সংস্কারের অভাবে রাস্তাটি এখন আস্ত এক নদীতে পরিণত হয়েছে। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ১৭০ মিটারের সেই খালের এপার থেকে ওপারে টাঙানো রয়েছে একটি মাত্র রশি। নদীর একপাড়ে রয়েছে প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি কমিউনিটি ক্লিনিক। প্রতিদিন সকালে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার জন্য শিশু শিক্ষার্থীদের প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে তৈরি একটি নড়বড়ে ভেলায় উঠতে হয়। ভেলায় উঠে নদীর দুই তীরে বাঁধা রশি হাত দিয়ে টেনে টেনে ওপারে পৌঁছাতে হয় তাদের। একটু অসাবধানতা কিংবা ভারসাম্য হারালেই ঘটে যায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা। ড্রামের ভেলায় চড়ে স্কুলে যাওয়ার ভীতি প্রকাশ করে প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহসিন বলে, প্রতিদিন এই ভেলায় চড়ে পার হতে হয়। পার হওয়ার সময় ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে, কখন যে ভেলা উল্টে যায়! আমাদের দাবিÑ দ্রুত যেন এখানে রাস্তা তৈরি করে দেওয়া হয়। একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী সাদিয়া। তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সে বলে, একবার ভেলা উল্টে নদীতে পড়ে গিয়েছিলাম। বইয়ের ব্যাগ থেকে শুরু করে জামাকাপড় সব ভিজে গিয়েছিল। পাশে লোকজন ছিল বলে সে যাত্রা বেঁচে যাই। আমরা শুধু একটা নিরাপদ রাস্তা চাই, যেন শান্তিতে স্কুলে যেতে পারি। অভিভাবকদের দুশ্চিন্তাও এখন চরমে। শিক্ষার্থী অভিভাবক হোসনেয়ারা খাতুন আক্ষেপের সুরে বলেন, “বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে আমরা বাড়িতে দুশ্চিন্তায় থাকি। একদিন নদী পার হতে গিয়ে আমার মেয়েসহ কয়েকটি শিশু পানিতে পড়ে যায়, অলৌকিকভাবে তারা রক্ষা পায়। নতুন সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, শিশুদের সুরক্ষায় এই রাস্তাটি যেন দ্রুত নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরও এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানান শিক্ষকরা। প্রতাপ স্মরণী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রণজিৎ কুমার মন্ডল বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এখানে একটি বাঁধ বা রাস্তা নির্মাণ করা হলো না। শিশুদের প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণভাবে খালের ওপর দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। পারাপারের ভয় ও যোগাযোগের চরম অব্যবস্থার কারণে অনেক অভিভাবকই এখন আর এই স্কুলে সন্তান ভর্তি করাতে চান না। ক্ষুদ্র বাজেটে স্থানীয়ভাবে এই বিশাল ক্ষতের সমাধান সম্ভব নয় জানিয়ে মহারাজপুর ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু সাঈদ বলেন, ভাঙন অংশটি ১৭০ মিটারেরও বেশি এবং বেশ গভীর। ইউনিয়ন পরিষদের সামান্য বরাদ্দ দিয়ে এটি মেরামত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এখানে একটি স্থায়ী বাঁধ বা অন্তত একটি ভাসমান সেতু তৈরি করা গেলে হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হতো। জনদুর্ভোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ নির্মাণ না হওয়া অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এভাবে ড্রামের ভেলায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচলের চিত্র মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি নিয়ে আমরা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলছি। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য যাতায়াত নিশ্চিত করতে অতিদ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। অন্যদিকে পান উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) খুলনা উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ সুলতান মাহমুদ জানান, প্রতাপ স্মরণী বিদ্যালয় সংলগ্ন ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধটি আমরা ইতোমধ্যে সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। জরুরি ভিত্তিতে সেখানে বাঁধ পুনঃনির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দের আবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বাজেট বা বরাদ্দ অনুমোদন পেয়ে গেলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে। আইলা-বিধ্বস্ত উপকূলীয় এই জনপদের মানুষ কতদিন আর এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হবেÑএখন সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপই পারে অবহেলিত এ জনপদের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ শিক্ষা জীবনের নিশ্চয়তা দিতে।
সংবাদ শিরোনাম
আইলার ১৭ বছর: নদী পেরোতে ড্রামের ভেলাই সম্বল, আতঙ্কে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা
-
কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি - আপডেট সময় ০৩:৪৩:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 12
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























