লেখক: জাতীয় অধ্যাপক ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক ড. মাহবুব উল্লাহ গতকাল শনিবার বাসসকে এ কথা বলেছেন।
তিনি আরো বলেছেন, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দিয়েছেন তারেক রহমান। তাঁর ভাষণের প্রেক্ষাপট ছিল ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণে ক্ষতবিক্ষত, বিধ্বস্ত বাংলাদেশ। ফ্যাসিবাদী শাসনের ফলে দেশের অর্থনীতি চরমভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে। এই দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশকে টেনে তোলার জন্য প্রধানমন্ত্রী যে ‘থ্রি-আর’ কৌশল গ্রহণ করেছেন, সেই কথাই তিনি বিশ্ব সভাকে অবহিত করেছেন।
থ্রি-আর কৌশলের তিনটি স্তম্ভ হলো পুনরুদ্ধার (রিকভারি), সংস্কার (রিস্টোরেশন) ও পুনর্গঠন (রিকনস্ট্রাকশন)। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও সমর্থনে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন এই কৌশল তৈরি করেছে। তাঁর সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুহূর্তে দেশকে আবার সক্রিয় গতিতে চলার উপযোগী করার জন্য তিন ধাপের এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। জাতিসংঘের মঞ্চ থেকে তিনি বিশ্ববাসীকে সেই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
এই কৌশল বাস্তবায়নে সরকারকে অনেক কাজ করতে হবে। অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়াতে কর-জিডিপির অনুপাত তিন শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়াতে হবে। মূল্যস্ফীতির অভিঘাত মোকাবিলা করতে হবে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ বাংলাদেশের জ্বালানি সমস্যা আরও প্রকট করে তুলেছে। এই অবস্থায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি না করে সরকারের সামনে আর কোনো উপায় ছিল না।
এর পাশাপাশি দেশের ওপর পুঞ্জীভূত হয়েছে দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা। ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধ আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিতে পারে। তবে ঋণের অর্থ উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার করতে পারলে সমস্যার গভীরতা অনতিক্রম্য হবে না।
জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারকে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সংস্কার করতে হবে। আশার কথা, তারেক রহমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে ধনী দেশগুলোর সাহায্য কামনা করেননি। সংকট কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের নিজস্ব অঙ্গীকারই তাঁর বক্তব্যে প্রাধান্য পেয়েছে। এটা তাঁর ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিরই প্রতিফলন।
রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাংলাদেশের ওপর বিরাট বোঝা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিজ দেশে ফিরে যেতে না পারায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রচণ্ডভাবে বেড়েছে। তারেক রহমান বলেছেন, এই প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মহল ব্যর্থ হলে ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান দাবি করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ফিলিস্তিন প্রশ্নের সমাধান না হলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসবে না এবং বিশ্বশান্তিও হুমকির মুখে পড়বে।
বাংলাদেশ বরাবরই উপনিবেশবাদ ও দখলদারত্বের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছে। গাজা ও ফিলিস্তিনি ভাইদের চরম ট্র্যাজেডিতে বাংলাদেশের জনগণের যে সমবেদনা, তারেক রহমানের বক্তব্যে সেই অনুভূতিই প্রতিফলিত হয়েছে।
তারেক রহমান সমকালীন বিশ্বের গুরুতর সমস্যাগুলোর প্রতি জাতিসংঘভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, নারীশিক্ষা ও শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যৌক্তিক ব্যবহার। বিশ্ব সম্প্রদায় এসব প্রশ্ন মোকাবিলায় এগিয়ে না এলে আমাদের এই পৃথিবী মানবজাতির অস্তিত্বকে হুমকির মধ্যে ফেলবে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ বিপদ সৃষ্টি করেছে।
একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিনিয়োগবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগে গতি সৃষ্টি করতে হলে ফ্যাসিবাদের ধ্বংসযজ্ঞের অবশেষগুলো মিটিয়ে ফেলতে হবে। এটাই হবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বিরোধ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল নিয়ে মন্তব্য করেননি। এসব বিষয়ে বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ন রেখে আগামী দিনে আলোচনার পথ খোলা রেখেছেন তিনি।
প্রতিবেশী ভারত যতই অনুদার হোক না কেন, বাংলাদেশ পাল্টা প্রতিবাদের ভাষা ব্যবহার করতে চায়নি। এটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিরই পরিচায়ক।
এবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে সভাপতির আসনে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো এবং বাংলায় জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছেন তারেক রহমান। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ ঘটনা।
তারেক রহমান আরও বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সমস্যার সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত।’
প্রধানমন্ত্রী এমন একটি শান্তিময় বিশ্বের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, যেখানে গড়ে উঠবে একটি মানবিক বিশ্বসমাজ। সেখানে মারণাস্ত্র নয়, বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তিতর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। এই উত্তরণ প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অবাধ প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে ধারাবাহিক সহায়তা অপরিহার্য।
তবে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত থ্রি-আর কৌশল সময়মতো বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ কঠিন হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর পুরো জাতিকে উজ্জীবিত হয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
জাতিসংঘের মঞ্চে একটি সময়োপযোগী ও সুচিন্তিত ভাষণ দেওয়ার জন্য তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানাই।
সংবাদ শিরোনাম
জাতিসংঘে ভাষণে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী : ড. মাহবুব উল্লাহ
-
খবরপত্র ডেস্ক: - আপডেট সময় ০৮:৫২:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 21
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ



















