ঢাকা ০৯:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo পুঁজিবাজার প্রাতিষ্ঠানিক ও পুরোপুরি কাগজবিহীন করার আহ্বান অর্থমন্ত্রীর Logo ভিন্নমত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের শক্তি : মাহদী আমিন Logo রাজনৈতিক পরিচয়ে কারো প্রতি বৈষম্য হবে না : ৪৯তম বিসিএস প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo শাপলা এখন শরীয়তপুরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবিকায়নের অংশ Logo বিনিয়োগ, এলএনজি সরবরাহ ও দক্ষতা উন্নয়নে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান রাষ্ট্রপতির Logo সরকার সর্বশক্তি দিয়ে দেশে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে: প্রধানমন্ত্রী Logo দল ছেড়ে ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞার শঙ্কায় রোনালদো Logo কতদিন পরপর ফোন বদলাবেন? Logo মিষ্টি ভালো লাগলেও কম খাবেন যারা Logo ‘দুনিয়াদারি হোক যাই ভেতরে রবের জিকির চাই’, মিশা সওদাগর

বাড়ছে লোডশেডিং, গ্রামাঞ্চলে দুর্ভোগ চরমে

গরমের এই সময়ে দেশে বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের তীব্র ঘাটতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সরকার এখন অফ-পিক সময়ের সাধারণ চাহিদাও পূরণ করতে পারছে না। গত সপ্তাহের মতো এই সপ্তাহেও প্রতিদিন পিক-আওয়ারে (বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়) ঘাটতি দেড় হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। এই ঘাটতির কারণে কিছু এলাকায় গড়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, তবে বিতরণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অন্যুায়ী, গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের স্থায়িত্ব অনেক বেশি।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন গ্রাহকরা জানিয়েছেন, তাদের প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং সহ্য করতে হচ্ছে
গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় দিনের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১৪ হাজার ৬৯ মেগাওয়াট; ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় এক হাজার ৪৬২ মেগাওয়াটে।
গত বৃহস্পতিবার প্রায় প্রতি ঘণ্টায় এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি ছিল, যা রাত ৯টায় সর্বোচ্চ এক হাজার ৮৪০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, গতকাল মধ্যরাতে ঘাটতির পরিমাণ দুই হাজার ৯৩২ মেগাওয়াট রাখার কথা ছিল, যা থেকে বোঝা যায় রাতের বেলাতেও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ মিলছে না।
এই সপ্তাহে গড় ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৭ মেগাওয়াট, যা গত সপ্তাহের ৩৪৩ মেগাওয়াট এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের ৩৫৮ মেগাওয়াটের তুলনায় অনেক বেশি।
তথ্যানুযায়ী, খুলনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর এবং কুমিল্লার গ্রামাঞ্চলগুলো সবচেয়ে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার হয়েছে; এসব অঞ্চলে বিদ্যুতের ঘাটতি ২০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে।
বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৭১টি হয় অচল হয়ে আছে, নয়তো সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করছে। অকেজো বা ধুঁকতে থাকা এই কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৪৫টি ফার্নেস অয়েলচালিত, ২৩টি গ্যাসচালিত এবং তিনটি কয়লাভিত্তিক।
পিডিবির একটি অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, গ্রীষ্মের পিক-আওয়ারে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট প্রাক্কলিত চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানোর জন্য প্রতিদিন অন্তত এক হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাসের প্রয়োজন। কয়লা ও ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে যদি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, তবেই পিডিবির গ্যাসের চাহিদা এই পর্যায়ে থাকবে।
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ বর্তমানে প্রতিদিন ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা দিয়ে পিডিবি সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। সরকার অন্তত দুটি সার কারখানা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এই গ্যাস সরবরাহ আরও কমবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে দুর্ভোগ বেশি
খুলনার গ্রামাঞ্চলে লাগাতার লোডশেডিংয়ে জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সেখানকার বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না; বিশেষ করে বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া ও কয়রা অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও শোচনীয়।
চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীরা এই পরিস্থিতির অন্যতম বড় ভুক্তভোগী।
বটিয়াঘাটার চাকশোলমারি গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী তৃণা বৈরাগী বলেন, ‘গত এক সপ্তাহ ধরে সন্ধ্যার পর থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই লোডশেডিং হচ্ছে। এতে আমার পড়াশোনার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।’
তার মা তৃপ্তি বৈরাগী জানান, তাদের চিংড়ির খামারও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে আমরা এয়ারেশন মেশিন (অক্সিজেন সরবরাহের যন্ত্র) চালাতে পারি না, ফলে মাছ মারা যায়। এই প্রচ- গরমে বেশিক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকলে খামারের সব মাছ মরে যেতে পারে।’
যদিও ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের সরকারি তথ্যে গত কয়েক দিনে মাত্র ছয় থেকে সাত মেগাওয়াটের সামান্য ঘাটতি দেখানো হয়েছে।
রাজশাহীতে তাপমাত্রা ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন বারবার লোডশেডিং হচ্ছে এবং প্রতিবার অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এর ফলে ঘুম ও স্বাভাবিক কাজকর্মের পাশাপাশি বোরো মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ কাজও দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কিছু গ্রামীণ এলাকায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
ময়মনসিংহে এক হাজার ৭৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল মাত্র ৭৫০ মেগাওয়াট, অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ ৩২৫ মেগাওয়াট। এর ফলে শহর এলাকায় প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে এবং গ্রামাঞ্চলে এর পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ।
রংপুরের গ্রামীণ গ্রাহকরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকট এখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
মিঠাপুকুর উপজেলার মিলনপুর গ্রামের মহিবুর রহমান জানান, বিদ্যুৎ ছাড়া এই অসহ্য গরম সহ্য করা যাচ্ছে না। তিনি জানান, সারা দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
তার ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম যোগ করেন, লোডশেডিং আর গরমে রাতে পড়াশোনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলাম জানান, এক সপ্তাহ ধরে তার ঘুমের কোনো ঠিক নেই, কারণ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব মিলিয়ে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
লালমনিরহাট শহরের স্কুলশিক্ষক মনিরুল ইসলাম জানান, গত রোববার থেকে লোডশেডিংয়ের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। দিনের বেলা কোনোমতে মানিয়ে নেওয়া গেলেও বারবার রাতের অন্ধকার ও ভ্যাপসা গরমে জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
রংপুর শহরে টানা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানপাট, বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
পায়রা চত্বরের ব্যবসায়ী সোলায়মান আলী বলেন, ‘বাড়তি খরচের কারণে জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে, আর জেনারেটরের বিকট শব্দে রাস্তাঘাট ও আশপাশের পরিবেশ অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে।’
রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক খুরশীদ আলম এই ভোগান্তির কথা স্বীকার করে বলেন, ‘এই কষ্ট শুধু রংপুরে নয়, সারা দেশেই এখন বিদ্যুৎ সংকট চলছে। মানুষ আমাদের ফোন করে তাদের যন্ত্রণার কথা জানাচ্ছে। এমনকি আমার নিজের বাড়িতেও এখন বিদ্যুৎ নেই।’
রংপুর নেসকোর প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম জানান, সোমবার রাতে রংপুর শহর ও আশপাশের এলাকায় চাহিদা ছিল প্রায় ৭৫ মেগাওয়াট, যেখানে গড়ে সরবরাহ ছিল মাত্র ৪৫ মেগাওয়াট।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে গ্রামীণ গ্রাহকরা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘লোডশেডিং এমনভাবে বণ্টন করা হয় যাতে বেশি চাহিদাসম্পন্ন শহুরে ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোকে সচল রাখা যায়, আর গ্রামাঞ্চলের ফিডারগুলো দীর্ঘক্ষণ বন্ধ রাখা হয়। বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে জাতীয় পর্যায়ে মাঝারি ধরনের ঘাটতি হলেও গ্রামে তা দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ে রূপ নেয়।’
তিনি আরও যোগ করেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়িয়েও একটি সুষম লোড ম্যানেজমেন্ট বা বণ্টন নীতি অনুসরণ করলে মানুষের এই ভোগান্তি অনেকটা কমানো সম্ভব।
তার মতে, ‘দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আকার অনুযায়ী এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ঘাটতি খুব বড় কোনো বিপর্যয় তৈরির কথা নয়। মূলত লোডশেডিং বণ্টনের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য করা হচ্ছে, সেটিই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের প্রধান কারণ।
তথ্যের গরমিল
সরকারি তথ্যে নানা অসঙ্গতি থাকায় বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে। সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় আরইবি (পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড) দুই হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি রেকর্ড করে, যা একই সময়ের জন্য জাতীয়ভাবে রিপোর্ট করা এক হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট ঘাটতির তুলনায় অনেক বেশি।
কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদার সরাসরি পরিমাপ না করে কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করায় তথ্যে এই ধরনের তফাত দেখা দিচ্ছে।
অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘জাতীয় পর্যায়ের তথ্যগুলো মূলত একটি নির্দিষ্ট সময়ে কতটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, প্রকৃত চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নয়।’
তিনি ব্যাখ্যা করেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন চাহিদার পরিবর্তে জ্বালানির সহজলভ্যতা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে; আর জ্বালানি খরচ ও ব্যয় সামাল দেওয়ার একটি হাতিয়ার হিসেবে লোডশেডিংকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, তথ্যের এই অমিল খতিয়ে দেখতে পিডিবি চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিমের নেতৃত্বে মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘আরইবির (ঘাটতির) দাবিটি যৌক্তিক বলে মনে হচ্ছে না।’ সূত্র: ডেইলি স্টার

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

পুঁজিবাজার প্রাতিষ্ঠানিক ও পুরোপুরি কাগজবিহীন করার আহ্বান অর্থমন্ত্রীর

বাড়ছে লোডশেডিং, গ্রামাঞ্চলে দুর্ভোগ চরমে

আপডেট সময় ১১:১৬:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

গরমের এই সময়ে দেশে বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের তীব্র ঘাটতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সরকার এখন অফ-পিক সময়ের সাধারণ চাহিদাও পূরণ করতে পারছে না। গত সপ্তাহের মতো এই সপ্তাহেও প্রতিদিন পিক-আওয়ারে (বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়) ঘাটতি দেড় হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। এই ঘাটতির কারণে কিছু এলাকায় গড়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, তবে বিতরণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অন্যুায়ী, গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের স্থায়িত্ব অনেক বেশি।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন গ্রাহকরা জানিয়েছেন, তাদের প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং সহ্য করতে হচ্ছে
গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় দিনের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১৪ হাজার ৬৯ মেগাওয়াট; ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় এক হাজার ৪৬২ মেগাওয়াটে।
গত বৃহস্পতিবার প্রায় প্রতি ঘণ্টায় এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি ছিল, যা রাত ৯টায় সর্বোচ্চ এক হাজার ৮৪০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, গতকাল মধ্যরাতে ঘাটতির পরিমাণ দুই হাজার ৯৩২ মেগাওয়াট রাখার কথা ছিল, যা থেকে বোঝা যায় রাতের বেলাতেও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ মিলছে না।
এই সপ্তাহে গড় ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৭ মেগাওয়াট, যা গত সপ্তাহের ৩৪৩ মেগাওয়াট এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের ৩৫৮ মেগাওয়াটের তুলনায় অনেক বেশি।
তথ্যানুযায়ী, খুলনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর এবং কুমিল্লার গ্রামাঞ্চলগুলো সবচেয়ে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার হয়েছে; এসব অঞ্চলে বিদ্যুতের ঘাটতি ২০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে।
বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৭১টি হয় অচল হয়ে আছে, নয়তো সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করছে। অকেজো বা ধুঁকতে থাকা এই কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৪৫টি ফার্নেস অয়েলচালিত, ২৩টি গ্যাসচালিত এবং তিনটি কয়লাভিত্তিক।
পিডিবির একটি অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, গ্রীষ্মের পিক-আওয়ারে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট প্রাক্কলিত চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানোর জন্য প্রতিদিন অন্তত এক হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাসের প্রয়োজন। কয়লা ও ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে যদি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, তবেই পিডিবির গ্যাসের চাহিদা এই পর্যায়ে থাকবে।
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ বর্তমানে প্রতিদিন ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা দিয়ে পিডিবি সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। সরকার অন্তত দুটি সার কারখানা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এই গ্যাস সরবরাহ আরও কমবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে দুর্ভোগ বেশি
খুলনার গ্রামাঞ্চলে লাগাতার লোডশেডিংয়ে জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সেখানকার বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না; বিশেষ করে বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া ও কয়রা অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও শোচনীয়।
চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীরা এই পরিস্থিতির অন্যতম বড় ভুক্তভোগী।
বটিয়াঘাটার চাকশোলমারি গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী তৃণা বৈরাগী বলেন, ‘গত এক সপ্তাহ ধরে সন্ধ্যার পর থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই লোডশেডিং হচ্ছে। এতে আমার পড়াশোনার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।’
তার মা তৃপ্তি বৈরাগী জানান, তাদের চিংড়ির খামারও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে আমরা এয়ারেশন মেশিন (অক্সিজেন সরবরাহের যন্ত্র) চালাতে পারি না, ফলে মাছ মারা যায়। এই প্রচ- গরমে বেশিক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকলে খামারের সব মাছ মরে যেতে পারে।’
যদিও ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের সরকারি তথ্যে গত কয়েক দিনে মাত্র ছয় থেকে সাত মেগাওয়াটের সামান্য ঘাটতি দেখানো হয়েছে।
রাজশাহীতে তাপমাত্রা ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন বারবার লোডশেডিং হচ্ছে এবং প্রতিবার অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এর ফলে ঘুম ও স্বাভাবিক কাজকর্মের পাশাপাশি বোরো মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ কাজও দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কিছু গ্রামীণ এলাকায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
ময়মনসিংহে এক হাজার ৭৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল মাত্র ৭৫০ মেগাওয়াট, অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ ৩২৫ মেগাওয়াট। এর ফলে শহর এলাকায় প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে এবং গ্রামাঞ্চলে এর পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ।
রংপুরের গ্রামীণ গ্রাহকরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকট এখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
মিঠাপুকুর উপজেলার মিলনপুর গ্রামের মহিবুর রহমান জানান, বিদ্যুৎ ছাড়া এই অসহ্য গরম সহ্য করা যাচ্ছে না। তিনি জানান, সারা দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
তার ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম যোগ করেন, লোডশেডিং আর গরমে রাতে পড়াশোনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলাম জানান, এক সপ্তাহ ধরে তার ঘুমের কোনো ঠিক নেই, কারণ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব মিলিয়ে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
লালমনিরহাট শহরের স্কুলশিক্ষক মনিরুল ইসলাম জানান, গত রোববার থেকে লোডশেডিংয়ের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। দিনের বেলা কোনোমতে মানিয়ে নেওয়া গেলেও বারবার রাতের অন্ধকার ও ভ্যাপসা গরমে জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
রংপুর শহরে টানা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানপাট, বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
পায়রা চত্বরের ব্যবসায়ী সোলায়মান আলী বলেন, ‘বাড়তি খরচের কারণে জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে, আর জেনারেটরের বিকট শব্দে রাস্তাঘাট ও আশপাশের পরিবেশ অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে।’
রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক খুরশীদ আলম এই ভোগান্তির কথা স্বীকার করে বলেন, ‘এই কষ্ট শুধু রংপুরে নয়, সারা দেশেই এখন বিদ্যুৎ সংকট চলছে। মানুষ আমাদের ফোন করে তাদের যন্ত্রণার কথা জানাচ্ছে। এমনকি আমার নিজের বাড়িতেও এখন বিদ্যুৎ নেই।’
রংপুর নেসকোর প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম জানান, সোমবার রাতে রংপুর শহর ও আশপাশের এলাকায় চাহিদা ছিল প্রায় ৭৫ মেগাওয়াট, যেখানে গড়ে সরবরাহ ছিল মাত্র ৪৫ মেগাওয়াট।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে গ্রামীণ গ্রাহকরা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘লোডশেডিং এমনভাবে বণ্টন করা হয় যাতে বেশি চাহিদাসম্পন্ন শহুরে ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোকে সচল রাখা যায়, আর গ্রামাঞ্চলের ফিডারগুলো দীর্ঘক্ষণ বন্ধ রাখা হয়। বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে জাতীয় পর্যায়ে মাঝারি ধরনের ঘাটতি হলেও গ্রামে তা দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ে রূপ নেয়।’
তিনি আরও যোগ করেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়িয়েও একটি সুষম লোড ম্যানেজমেন্ট বা বণ্টন নীতি অনুসরণ করলে মানুষের এই ভোগান্তি অনেকটা কমানো সম্ভব।
তার মতে, ‘দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আকার অনুযায়ী এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ঘাটতি খুব বড় কোনো বিপর্যয় তৈরির কথা নয়। মূলত লোডশেডিং বণ্টনের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য করা হচ্ছে, সেটিই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের প্রধান কারণ।
তথ্যের গরমিল
সরকারি তথ্যে নানা অসঙ্গতি থাকায় বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে। সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় আরইবি (পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড) দুই হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি রেকর্ড করে, যা একই সময়ের জন্য জাতীয়ভাবে রিপোর্ট করা এক হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট ঘাটতির তুলনায় অনেক বেশি।
কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদার সরাসরি পরিমাপ না করে কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করায় তথ্যে এই ধরনের তফাত দেখা দিচ্ছে।
অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘জাতীয় পর্যায়ের তথ্যগুলো মূলত একটি নির্দিষ্ট সময়ে কতটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, প্রকৃত চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নয়।’
তিনি ব্যাখ্যা করেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন চাহিদার পরিবর্তে জ্বালানির সহজলভ্যতা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে; আর জ্বালানি খরচ ও ব্যয় সামাল দেওয়ার একটি হাতিয়ার হিসেবে লোডশেডিংকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, তথ্যের এই অমিল খতিয়ে দেখতে পিডিবি চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিমের নেতৃত্বে মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘আরইবির (ঘাটতির) দাবিটি যৌক্তিক বলে মনে হচ্ছে না।’ সূত্র: ডেইলি স্টার