বরিশালে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রিপেইড মিটার স্থাপনের দিকে ঝুঁকছে বিদ্যুৎবিভাগ। ইতিমধ্যে নতুন করে বরিশাল নগরীতে স্থাপন করা হয়েছে সাড়ে ৫ হাজার প্রিপেইড মিটার। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এক লাখ গ্রাহকের পোস্টপেইড মিটার পরিবর্তন করে নতুন প্রিপেইড মিটার পুনঃস্থাপন করা হবে।
এ ছাড়া নতুন কোনো সংযোগে গ্রাহকদের পোস্টপেইড মিটার সরবরাহ বন্ধ রেখেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে করে একদিকে যেমন গ্রাহককে মাস শেষে বিলের পরিমাণ নিয়ে নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে না, তেমনি কমছে সরকারের পরিচালন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়। অন্যদিকে সিস্টেম লস বা বিদ্যুৎ অপচয় রোধে লাভের পাল্লা ক্রমান্বয়ে ভারী হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, গ্রাহকদের কাছ থেকে পোস্টপেইড মিটারগুলো তুলে নিচ্ছে সরকার। এ ছাড়া নতুন কোনো সংযোগে পোস্টপেইড মিটার সরবরাহ করা হচ্ছে না। সংযোগ পেতে হলে গ্রাহককে প্রিপেইড মিটার কিনতে হচ্ছে। প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলে মাঠপর্যায়ে মিটার রিডার ও বিল প্রস্তুতকারকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক ব্যয় অনেকাংশে কমে এসেছে।
আগে যেখানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রিডিং নেওয়া, বিল তৈরি ও বিতরণের জন্য বিশাল জনবল ও যাতায়াত খরচের প্রয়োজন হতো, এখন ডিজিটাল ব্যবস্থার কারণে সেই ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে। এ ছাড়া শতভাগ অগ্রিম রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হওয়ায় বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর আর্থিক তারল্য সংকট দূর হয়েছে। বকেয়া বিল আদায়ের পেছনে প্রতি বছর সরকারের যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও আইনি খরচ হতো, তা এখন শূন্যের কোঠায়। ফলে সরকার যেকোনো মূল্যে গ্রাহকদের কাছে প্রিপেইড মিটার পৌছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করছে।
বিদ্যুৎ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রিপেইড মিটার চালুর অন্যতম বড় সাফল্য হলো সিস্টেম লস বা বিদ্যুৎ চুরি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়া। অবৈধ সংযোগ এবং মিটার টেম্পারিংয়ের মতো নন-টেকনিক্যাল ক্ষতি রোধ হওয়ায় উৎপাদিত বিদ্যুতের সঠিক মূল্য সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের অগ্রিম রিচার্জের অভ্যাস বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে উদ্বুদ্ধ করছে, যা জাতীয় গ্রিডের ওপর বাড়তি চাপ কমাচ্ছে।
এদিকে গ্রাহক ভোগান্তি ও অসন্তোষ দূর করতে সরকার প্রিপেইড মিটারের মাসিক অতিরিক্ত চার্জ ও ভাড়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছাড়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানিয়েছে। এতে করে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আরো জনবান্ধব করে তুলেছে বলে মনে করছেন গ্রাহকরা।
গ্রাহকদের মতে, প্রিপেইড মিটারের অন্যতম সুবিধা হলো বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া। মিটারে থাকা ব্যালেন্স দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফলে মাস শেষে হঠাৎ বড় অঙ্কের বিল আসার আশঙ্কাও তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
আগের পোস্টপেইড ব্যবস্থায় অনেক গ্রাহককে নির্দিষ্ট সময়ে বিল হাতে পাওয়া, মিটার রিডিং এবং বিলের পরিমাণ নিয়ে নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হতো। কিন্তু, প্রিপেইড মিটারে সেই আশঙ্কা নেই। এছাড়া বিভিন্ন মাধ্যমে রিচার্জ করার সুযোগ থাকায় অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে বিল পরিশোধের প্রয়োজন হচ্ছে না। এতে সময় ও যাতায়াতের ঝামেলা কমছে।
এ ছাড়া প্রিপেইড মিটারে ব্যালেন্স কমে গেলে গ্রাহক আগে থেকে তা বুঝতে পারেন। ফলে অপ্রয়োজনীয় বাতি, ফ্যান বা অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার কমিয়ে খরচ নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ থাকে।
এ বিষয়ে প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারী বেসরকারি চাকরিজীবী সঞ্জয় হালদার জানান, আগে মাস শেষে মোট কত টাকা বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে, তা বুঝতে অপেক্ষা করতে হতো। এখন মিটারের ব্যালেন্স ও ব্যবহারের তথ্য দেখে প্রতিদিনের খরচ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এতে পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যয়ের হিসাব রাখাও সহজ হয়েছে। মাঝে মধ্যে মিটার চেক করে ব্যালেন্স দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে এ মিটার ব্যবহারে স্বস্তি ফিরে এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাবুল সরকার নামের আরেক গ্রাহক বলেন, পোস্টপেইড মিটারে বিল কম-বেশি হতো। এখন আর সেই অভিযোগ নেই। যত টাকা রিচার্জ করা হয়, সেই টাকার বিদ্যুৎ মেলে।
তিনি বলেন, প্রিপেইড মিটারে মানুষের ভোগান্তি ও হয়রানি অনেক কমেছে। তবে প্রিপেইড মিটার কীভাবে আরো সহজ করা যায়, সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নিলে গ্রাহকরা আরো উপকৃত হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রিপেইড মিটার শুধু বিল পরিশোধের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনেনি, এটি গ্রাহককে নিজের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর আরো সরাসরি নজর রাখার সুযোগ দিয়েছে। পাশাপাশি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের বিল আদায় ও ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রভাব রয়েছে। তবে গ্রাহকের স্বস্তি আরো বাড়াতে সহজ রিচার্জ ব্যবস্থা, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি, মিটারের ত্রুটি দ্রুত সমাধান এবং সব ধরনের চার্জ সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ আগে থেকে নিয়ন্ত্রণ, রিচার্জের সুবিধা এবং বিলসংক্রান্ত কিছু বিড়ম্বনা কমার কারণে প্রিপেইড মিটার ব্যবহারে গ্রাহকদের একটি অংশ ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন। যথাযথ গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা গেলে এই ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরো বাড়বে।
এ বিষয়ে ওজোপাডিকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মঞ্জুরুল ইসলাম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, প্রিডেইড মিটারে ভৌতিক বিলের সুযোগ নেই। বিল বকেয়া রাখারও সুযোগ নেই। গ্রাহক খুশিমতো রিচার্জ করতে পারেন।
তিনি আরো বলেন, বরিশাল নগরীতে দেড় লাখ পোস্টপেইড মিটার রয়েছে। ইতিমধ্যে নগরীতে নতুন সাড়ে ৫ হাজার প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে। আগামী দুই তিন মাসের মধ্যে এক লাখ গ্রাহকের পোস্টপেইড মিটার প্রিপেইড মিটারে রিপ্লেস করা হবে। পরবর্তী পর্যায়ে বাকি ৫০ হাজার পোস্টপেইড মিটার রিপ্লেস করা হবে।
সংবাদ শিরোনাম
প্রিপেইড মিটারে গ্রাহকের স্বস্তি, কমেছে সরকারের ব্যয়
-
খবরপত্র ডেস্ক: - আপডেট সময় ০৬:৪৩:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
- 4
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























