# জেলায় মামলা গ্রহণ ও নিস্পত্তিতে শীর্ষে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা
# পর্যাপ্ত প্রচারণা না থাকায় এখনো অনেক মানুষই গ্রাম আদালত সম্পর্কে জানে না
# প্রচারণা বাড়ানো প্রয়োজন মনে করছেন সচেতন মহল
পূর্ব পরিচয়ের সূত্রে মাড্ডা গ্রামের বাবুল মিয়া থেকে দুই লাখ টাকা ধার নেন ধর্মপুর গ্রামের হাসমত আলী। উভয়ে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। এরই মধ্যে বাবুল মিয়া ইন্তেকাল করেন। দীর্ঘদিনেও টাকা ফেরত না দেয়ায় গ্রাম আদালতের দ্বারস্থ হন বাবুল মিয়ার ছেলে সালা উদ্দিন। একই ইউনিয়নের আবাসপুর গ্রামে দোকানে মাল কিনতে গিয়ে বাক বিতন্ডার জেরে দুই পক্ষের হাতাহাতি হয়। এতে জাহিদ হোসেনের হামলায় হেলাল মিয়ার ছেলে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়। গ্রাম আদালতে জাহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন হেলাল মিয়া। সম্প্রতি দুইটি ঘটনা সহজে নিস্পত্তি হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন প্যানেল চেয়ারম্যান জাকির মাহমুদ। শুধু সালা উদ্দিন ও হেলাল মিয়া নয়, গত সেপ্টেম্বর মাসে চৌদ্দগ্রাম পৌরসভাসহ উপজেলার তের ইউনিয়নে গ্রাম আদালতে দায়েরকৃত ৮৮ মামলার মধ্যে নিস্পত্তি হয়েছে ৮২ মামলা। কুমিল্লা জেলার ১৭ উপজেলায় হয়েছে ৫৪২ মামলা। একই সাথে বাড়ছে মামলা নিস্পত্তির সংখ্যাও। জানা গেছে, কুমিল্লা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রাম আদালত সাধারণ মানুষের কাছে ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব, ছোট আর্থিক লেনদেন ও জমিজমা নিয়ে বিরোধসহ আইন অনুযায়ী বিচারযোগ্য বিভিন্ন বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। আদালতকেন্দ্রিক দীর্ঘসূত্রতা, যাতায়াতের খরচ ও ভোগান্তি কমানোর আশায় অনেক মানুষ সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাম আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন। গত সেপ্টেম্বর মাসে জেলার ১৭ উপজেলায় গ্রাম আদালতে মামলা হয়েছে ৫৪২টি। এছাড়া উচ্চ আদালত থেকে প্রেরণকৃত মামলাসহ মোট মামলার সংখ্যা ছিল ৯৩৬টি। এরমধ্যে নিস্পত্তি হয়েছে ৫৭০টি। জেলায় মামলা গ্রহণ ও নিস্পত্তিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা। এ উপজেলায় ৮৮ মামলার মধ্যে নিস্পত্তি হয়েছে ৮২টি। নিস্পত্তির হার ৯৩ ভাগ। জেলার মধ্যে এ উপজেলায় সর্বোচ্চ মামলা গ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ আদায় হয়েছে। আদায়কৃত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ২৯ লাখ ৫৩ হাজার ৫’শ টাকা।
সূত্র জানায়, গ্রামাঞ্চলে ছোটখাটো বিরোধ অনেক সময় বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দেয়। সামান্য জমি নিয়ে বিরোধ, টাকা ধার দিয়ে ফেরত না পাওয়া কিংবা দৈনন্দিন নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী ও স্বজনদের মধ্যে তৈরি হয় দূরত্ব। এসব বিরোধ দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা সম্ভব হলে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার পাশাপাশি কমে আসে মামলা-মোকদ্দমার চাপ। এ ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত স্থানীয় বিচার ব্যবস্থায় একটি কার্যকরী ভুমিকা পালন করছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত আইন ও বিধি অনুযায়ী অভিযোগ গ্রহণ করা হয়। অভিযোগ পাওয়ার পর তা গ্রাম আদালতের এখতিয়ারভুক্ত কি না, তা যাচাই করা হয়। এখতিয়ারভুক্ত হলে বিধি অনুসারে শুনানি ও নিষ্পত্তির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য শোনা, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ বিবেচনা এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ-৩য় পর্যায় প্রকল্পের কুমিল্লা জেলার সেপ্টেম্বর মাসের তথ্য সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন ইউপি কার্যালয়ে গ্রাম আদালতে চৌদ্দগ্রামে ৮৮, ব্রাহ্মণপাড়ায় ৩৪, আদর্শ সদরে ২২, লাকসামে ২১, চান্দিনায় ৪৪, বরুড়ায় ৫২, লালমাই ২৩, সদর দক্ষিণে ১৩, তিতাসে ২৫, হোমনায় ২৩, বুড়িচংয়ে ১৪, দেবিদ্বারে ৩৫, মেঘনায় ২১, দাউদকান্দিতে ৩০, নাঙ্গলকোটে ৩০, মুরাদনগরে ৪৪ ও মনোহরগঞ্জে ২৩টি মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। অপরদিকে উচ্চ আদালত থেকেও সহজে নিস্পত্তি ও ভুক্তভোগীদের খরচ কমানোর জন্য সংশ্লিষ্ট গ্রাম আদালতে মামলা পাঠানোর সংখ্যা বাড়ছে। একই সাথে বাড়ছে মামলা নিস্পত্তির সংখ্যাও। ১৭ উপজেলায় মামলার বিবাদীদের থেকে ৯৫ লাখ ৩৪ হাজার ৬’শ ২টা ক্ষতিপূরণ আদায় করে আবেদনকারীকে প্রদান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রাম আদালতের ফৌজধারী মামলা করতে ফি ১০ টাকা ও দেওয়ানী মামলা করতে ফি ২০ টাকা। এখানে মামলা নিস্পত্তিতে সর্বোচ্চ ৯০-১২০ দিন সময় লাগে। এর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগকারী ও প্রতিপক্ষ উভয়ের বক্তব্য শোনার সুযোগ, আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নারী, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। তবে গ্রাম আদালত সব ধরনের মামলা নিষ্পত্তি করতে পারে না। এর এখতিয়ার ও ক্ষমতা আইন দ্বারা নির্ধারিত। তাই গুরুতর অপরাধ কিংবা গ্রাম আদালতের এখতিয়ারবহির্ভূত বিরোধের ক্ষেত্রে উপযুক্ত আইনগত কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। আফরিন জাহান ও আছলাম মিয়াসহ অধিকাংশ উপকারভোগী জানান, গ্রাম আদালতে ন্যায়বিচার শুধু আদালতের রায় নয়, বরং সাধারণ মানুষের কাছে সহজে, স্বল্প ব্যয়ে ও সম্মানজনকভাবে বিচার পাওয়ার সুযোগ। গ্রাম আদালতের কার্যকর ব্যবহার সেই প্রত্যাশা পূরণের পথকে আরও সুগম করতে পারে। অভিযোগ গ্রহণে সহজলভ্যতা, দ্রুত শুনানি, আইনসম্মত নিষ্পত্তি এবং ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা নিশ্চিত করা গেলে এই ব্যবস্থা সমাজে বিরোধ নিরসন ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রতিষ্ঠায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। মানবাধিকার কর্মী জহিরুল ইসলামের ভাষ্যমতে, এখনো অনেক মানুষ জানে না, কোন ধরনের বিরোধ গ্রাম আদালতে নিষ্পত্তিযোগ্য। কিভাবে অভিযোগ করতে হয় এবং কি কি নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেকে প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই, গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে প্রচারণা ও জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কালিকাপুর ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান জাকির মাহমুদ বলেন, অল্প সময়ে ও স্বল্প খরচে ন্যায় বিচার পেতে গ্রাম আদালত কার্যকরী ভুমিকা পালন করছে। সম্প্রতি কালিকাপুর ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি ঘটনা গ্রাম আদালতের মাধ্যমে নিস্পত্তি হয়েছে। এতে বাদি ও বিবাদী সকলেই খুশি। ফলে ছোট বিষয় নিয়ে দূরত্ব বন্ধ হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত প্রচারণা না থাকায় মানুষ গ্রাম আদালত সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি জানে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কথা বিবেচনা করে প্রত্যেক সেক্টরে গ্রাম আদালত সম্পর্কে আরও সচেতনতা বাড়াতে সরকারের নিকট আহবান জানাচ্ছি। শনিবার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘গ্রাম আদালত গ্রামীণ জনপদে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সাধারণ মানুষের বিচারপ্রাপ্তি সহজীকরণ এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার একটি কার্যকর উদ্যোগ। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ছোটখাটো বিরোধ ও বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো স্বল্প সময়ে এবং সহজ পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষকে সামান্য বিরোধের জন্য দূরবর্তী আদালতে গিয়ে সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হচ্ছে না। বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠী গ্রাম আদালতের মাধ্যমে সহজে বিচার পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ নিরসন, পারস্পরিক বিরোধের অবসান এবং সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করতেও গ্রাম আদালত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গ্রাম আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ইউনিয়ন পরিষদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আরও দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে এ কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা সম্ভব। আমরা চাই, চৌদ্দগ্রাম উপজেলার প্রতিটি মানুষ গ্রাম আদালতের সুফল সম্পর্কে জানুক এবং আইনানুগভাবে স্থানীয় পর্যায়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ গ্রহণ করুক’।
মোঃ এমদাদ উল্যাহ কুমিল্লা 


















