প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিনের পরিবেশ সুরক্ষায় বছরব্যাপী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ কার্যক্রমের আওতায় গত ১১ মাসে দ্বীপের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ১০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সংগৃহীত বর্জ্যের বড় অংশ প্লাস্টিকের বোতল ও চিপসের প্যাকেট। এসব বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরির মাধ্যমে পরিবেশদূষণ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পর্যটন মৌসুমে দ্বীপে বর্জ্যের পরিমাণ বেড়ে গেলেও বছরের অন্যান্য সময়েও প্রতিদিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। তাই শুধু পর্যটন মৌসুমকেন্দ্রিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নয়, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজন নিয়মিত ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। সকাল সাড়ে ৮টা থেকেই দ্বীপে পরিচ্ছন্নতার কাজে নেমে পড়েন ব্র্যাকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কর্মীরা। নির্ধারিত রুটে বর্জ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁদের চোখে পড়ে ডিপিএইচইর (জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর) পাবলিক টয়লেটের পাশ থেকে পূর্ব সৈকতমুখী এলাকায় জমে থাকা ময়লার স্তূপ। স্থানীয় বাজারের একাধিক দোকান থেকে নিয়মিত সেখানে বর্জ্য ফেলা হয় বলে জানান পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। এতে স্থানটি অনেকটা অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য ফেলার স্থানে পরিণত হয়েছে। দিনভর ওই স্থানসহ পূর্বপাড়া, বাজার এলাকার চারটি ডাস্টবিন, কবরস্থান রোড, ময়নামতি রোড, পশ্চিম সৈকত, কোনারপাড়া, নজরুলপাড়া ও গলাচিপাসহ দ্বীপের বিভিন্ন এলাকা থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করেন কর্মীরা। পরে এসব বর্জ্য সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে (এসটিএস) নিয়ে পচনশীল ও অপচনশীল অংশ আলাদা করা হয়। সেন্টমার্টিনের মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল দ্বীপে বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার সামুদ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক, খাবারের প্যাকেট এবং স্থানীয় বাজার ও বসতবাড়ির বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা না হলে দূষণের মাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এ বাস্তবতায় ব্র্যাকের চলমান কার্যক্রমে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহের পাশাপাশি নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলা, ডাস্টবিন ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান এবং পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য পৃথকীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্র্যাকের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. ফয়সল বলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় কাজ করার পাশাপাশি নিজের জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিজের জন্মভূমিকে পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে যুক্ত থাকতে পারাও তাঁর কাছে আনন্দের। ব্র্যাকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের আওতায় সংগৃহীত বর্জ্য ডিপিএইচইর কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পচনশীল বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার তৈরি এবং প্লাস্টিকের বোতল পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে প্লাস্টিকের বোতল পুনর্ব্যবহারের কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। ডিপিএইচই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আসন্ন পর্যটন মৌসুম শুরুর পর এ কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে বর্জ্য পৃথকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাত করা গেলে একদিকে পরিবেশদূষণ কমবে, অন্যদিকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ থেকে সম্পদ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। জৈব বর্জ্য থেকে উৎপাদিত কম্পোস্ট সার স্থানীয় কৃষকদের কাছে তুলনামূলক কম দামে সরবরাহ করা গেলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমাতেও সহায়ক হতে পারে। তবে এ উদ্যোগের সুফল পেতে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নিরাপদ সংরক্ষণ, পরিবহন এবং পুনর্ব্যবহার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।ব্র্যাকের ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ রফি সায়েম বলেন, সেন্টমার্টিনের মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বছরব্যাপী কার্যক্রম প্রয়োজন। অতীতে বিভিন্ন উদ্যোগের বড় অংশ পর্যটন মৌসুমকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হলেও দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় সারা বছরই কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, শুধু উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগ দিয়ে বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে। নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলা, পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করা এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশকর্মী আব্দুল আজিজ বলেন, বিগত বছরগুলোতে সেন্টমার্টিনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ মূলত পর্যটন মৌসুমকেন্দ্রিক ছিল। ব্র্যাকের বছরব্যাপী কার্যক্রম দ্বীপবাসীর মধ্যে স্বস্তি তৈরি করেছে। নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকলে দ্বীপের পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে ব্র্যাকের কমিউনিটি ভলান্টিয়াররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন। পাশাপাশি উঠান বৈঠকের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ব্র্যাকের কমিউনিটি ভলান্টিয়ার সালমা আক্তার বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপেই তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা ও বিয়ে। তাঁর ৩৪ বছরের অভিজ্ঞতায় স্থায়ী বাসিন্দাদের কেন্দ্র করে এ ধরনের ধারাবাহিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়েনি। তিনি বলেন, আগে অনেক উদ্যোগ পর্যটকদের ঘিরে পরিচালিত হলেও বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সচেতনতার আওতায় আনা হচ্ছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিংবা উঠান বৈঠকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করলে অনেকেই আগ্রহ নিয়ে অংশ নেন। দ্বীপের পূর্বপাড়ার বাসিন্দা রুকেয়া বেগম বলেন, ব্র্যাকের কর্মীরা তাঁদের নিয়মিত ডাস্টবিনে বর্জ্য ফেলতে উৎসাহিত করছেন। তাঁদের কাছ থেকে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য চেনার পাশাপাশি ডাস্টবিনের পৃথক অংশে কোন ধরনের বর্জ্য ফেলতে হবে, সে বিষয়েও শিখেছেন তাঁরা। সেন্টমার্টিনের সৈকতকর্মী আমিন বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ব্র্যাক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ শুরু করায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। পর্যটন মৌসুমে হোটেল-মোটেল মালিকদের বর্জ্য অপসারণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো। নিয়মিত কার্যক্রমের ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আগের তুলনায় শৃঙ্খলা এসেছে বলে তিনি মনে করেন।পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, স্থানীয় বাসিন্দা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও পরিবেশকর্মীদের বক্তব্যে বছরব্যাপী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। তবে এ কার্যক্রমের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় এবং পর্যাপ্ত আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ওপর। গত ১১ মাসে প্রায় ১০০ টন বর্জ্য সংগ্রহের অভিজ্ঞতা সেন্টমার্টিনে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। তবে শুধু বর্জ্য সংগ্রহ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সংগৃহীত বর্জ্যের চূড়ান্ত ও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।বিশেষ করে বাজার এলাকায় যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার কার্যক্রম চালু করা, কম্পোস্ট উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানো এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বর্জ্য পৃথকীকরণের অভ্যাস স্থায়ী করা এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। সেন্টমার্টিনকে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব রাখতে পর্যটন মৌসুমের সাময়িক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পরিবর্তে বছরব্যাপী সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ব্র্যাকের চলমান কার্যক্রম, ডিপিএইচইর বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ উদ্যোগ এবং দ্বীপবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের পাশাপাশি দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
সংবাদ শিরোনাম
পর্যটন মৌসুমের বাইরেও চলছে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, বর্জ্য থেকে সম্পদ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ
-
অলি উল্লাহ রনি (স্টাফ রিপোর্টার) কক্সবাজার - আপডেট সময় ০৮:১৯:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
- 7
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























