বারবার ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে ধারণা বদলে দিতে পারে।
একবার ব্যর্থ হওয়ার পর মনে হতে পারে, পরেরবার নিশ্চয়ই সফল হব। কিন্তু একই অভিজ্ঞতা বারবার ফিরে এলে বদলে যেতে থাকে নিজের সম্পর্কে ধারণা। যে মানুষটি একসময় নিজের সামর্থ্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, তিনিও একসময় ভাবতে শুরু করেন-‘আমাকে দিয়ে কি আদৌ কিছু হবে?’ চাকরির পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থতা, ব্যবসায় লোকসান, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া কিংবা দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়া-এসব অভিজ্ঞতা শুধু মন খারাপই করে না, নিজের ওপর বিশ্বাসও দুর্বল করে দিতে পারে। কিন্তু কেন এমন হয়?
প্রতিটি ব্যর্থতাকে নিজের অযোগ্যতা মনে হয়
কোনো কাজে ব্যর্থ হওয়া আর নিজেকে ব্যর্থ মানুষ ভাবা এক বিষয় নয়। কিন্তু বারবার প্রত্যাশা পূরণ না হলে অনেকেই এই দুটিকে এক করে ফেলেন। একটি চাকরির পরীক্ষায় সফল না হলে কেউ ভাবতে পারেন, প্রস্তুতিতে আরও মনোযোগ দেওয়া দরকার। কিন্তু একই ঘটনা কয়েকবার ঘটলে তার মনে হতে পারে, তিনি হয়তো যোগ্যই নন।
মনোবিজ্ঞানে নিজের সম্পর্কে এমন নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার পেছনে চিন্তার ধরন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি নির্দিষ্ট ঘটনার ব্যর্থতাকে জীবনের সব ক্ষেত্রে অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে ধরে নিলে আত্মবিশ্বাস আরও কমে যেতে পারে। অথচ ব্যর্থতার পেছনে প্রস্তুতির ঘাটতি, সুযোগের অভাব, প্রতিযোগিতা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরের নানা কারণ থাকতে পারে।
চেষ্টা করেও ফল না পেলে আগ্রহ কমে যায়
একই চেষ্টা বারবার করেও যখন কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না, তখন নতুন করে চেষ্টা করার শক্তি হারিয়ে ফেলতে পারেন অনেকে। মনে হতে পারে, এত চেষ্টা করেও যখন কিছু হচ্ছে না, তখন আবার চেষ্টা করে লাভ কী!
মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ‘শেখা অসহায়ত্ব’ ধারণাটির সম্পর্ক রয়েছে। বারবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা নেতিবাচক পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে কেউ কেউ ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করেন, চেষ্টা করেও পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়। ফলে সুযোগ থাকলেও তারা নতুন উদ্যোগ নিতে দ্বিধা করেন।
তবে বারবার ব্যর্থ হলেই যে প্রত্যেকের মধ্যে এমন মানসিকতা তৈরি হবে, তা নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিক সহায়তা ও পরিস্থিতির ধরন অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে।
অন্যের সাফল্য নিজের ব্যর্থতাকে বড় করে দেখায়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতদের নতুন চাকরি, পদোন্নতি, বিয়ে, বাড়ি কেনা কিংবা বিদেশযাত্রার খবর চোখে পড়ে। অন্যের জীবনের সাফল্যের মুহূর্তগুলো দেখতে দেখতে নিজের জীবনের অপূর্ণতাগুলো আরও স্পষ্ট মনে হতে পারে।
বিশেষ করে যখন নিজের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না, তখন অন্যের অর্জনকে নিজের পিছিয়ে পড়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা শুরু হয়। মনে হতে পারে, সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু নিজের জীবনই থমকে আছে।
কিন্তু অন্যের জীবনের দৃশ্যমান সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবনের সব সংগ্রামের তুলনা করা বাস্তবসম্মত নয়। প্রত্যেকের সুযোগ, দায়িত্ব, আর্থিক অবস্থা ও জীবনের পরিস্থিতি আলাদা। তাই অন্যের অর্জন দিয়ে নিজের যোগ্যতা মাপতে গেলে হতাশা বাড়তে পারে।
সমালোচনা ও প্রত্যাখ্যানের ভয় বাড়ে
বারবার ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা মানুষকে শুধু নিজের চোখেই ছোট করে না, অন্যের চোখে কেমন দেখাচ্ছেন, সেই চিন্তাও বাড়িয়ে দিতে পারে। আত্মীয়স্বজনের প্রশ্ন, বন্ধুদের মন্তব্য কিংবা পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার অপরাধবোধ নতুন করে চেষ্টা করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তখন কেউ নতুন চাকরিতে আবেদন করতে ভয় পান, নিজের কাজ অন্যকে দেখাতে চান না কিংবা নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়ার আগে সম্ভাব্য ব্যর্থতার কথা ভাবতে থাকেন। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কায় সুযোগ এড়িয়ে চললে সাময়িকভাবে উদ্বেগ কমতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।
আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে যা করবেন
প্রথমেই ব্যর্থতা ও ব্যক্তিগত মূল্যকে আলাদা করে দেখতে হবে। কোনো কাজে সফল না হওয়া মানেই আপনি অযোগ্য নন। বরং কোথায় সমস্যা হয়েছে, কোন দক্ষতা বাড়ানো দরকার এবং কোন বিষয়গুলো আপনার নিয়ন্ত্রণে ছিল না-সেগুলো আলাদা করে বোঝার চেষ্টা করুন।
বড় লক্ষ্যকে ছোট ছোট কাজে ভাগ করাও সহায়ক হতে পারে। যেমন, চাকরি পাওয়াই যদি লক্ষ্য হয়, তবে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় প্রস্তুতি নেওয়া, একটি দক্ষতা শেখা কিংবা কয়েকটি মানসম্মত আবেদন করাকে অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করুন। এতে সাফল্য না আসা পর্যন্তও নিজের প্রচেষ্টার দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায়।
নিজের পুরোনো অর্জনগুলোর কথাও মনে করুন। কঠিন পরিস্থিতি সামলানো, কোনো নতুন কাজ শেখা কিংবা বিপদের সময় দায়িত্ব পালন করাও সামর্থ্যের পরিচয়। একই সঙ্গে প্রয়োজনে অভিজ্ঞ কারও পরামর্শ নিন। কখনো কখনো নিজের পরিকল্পনা বদলানো, বিরতি নেওয়া কিংবা অন্য পথ বেছে নেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ।
দীর্ঘদিন হতাশা, আত্মদোষারোপ, ঘুমের সমস্যা বা দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলার মতো লক্ষণ দেখা দিলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
বারবার ব্যর্থ হওয়া আপনার জীবনের একটি অভিজ্ঞতা, আপনার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। সব চেষ্টা সফল হবে না, সব লক্ষ্যও হয়তো অর্জিত হবে না। কিন্তু কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন, কখন নতুন করে শুরু করতে হবে আর কখন নিজের প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হওয়া দরকার-তা বুঝতে শেখাও এগিয়ে যাওয়ারই অংশ। আত্মবিশ্বাস মানে কখনো ব্যর্থ না হওয়া নয়, বরং ব্যর্থতার পরও নিজের সম্ভাবনাকে একেবারে অস্বীকার না করা। সূত্র: মিডিয়াম, ইমেজ ম্যাগাজিন
সংবাদ শিরোনাম
বারবার ব্যর্থ হলে নিজের ওপর বিশ্বাস কমে যায় কেন?
-
খবরপত্র ডেস্ক: - আপডেট সময় ০৮:৪৮:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
- 5
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























