চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কৃষকেরা আলোচনা করছেন ধানক্ষেতের পোকামাকড় নিয়ে। কোনটি ক্ষতিকর, কোনটি উপকারী, আবার কোন পোকা অন্য পোকাকে খেয়ে ফসল রক্ষা করে এসব নিয়ে চলছে তর্ক-বিতর্ক। রাজনীতি কিংবা গ্রাম্য সালিশের বদলে সন্ধ্যার আড্ডায় এখন প্রাধান্য পাচ্ছে ধানের রোগবালাই ও পোকা দমনের কৌশল। কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নের সোনাইছড়ি গ্রামের মহাসড়কসংলগ্ন একটি চায়ের দোকান পরিণত হয়েছে কৃষকদের অনানুষ্ঠানিক কৃষি শিক্ষাকেন্দ্রে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের,অতন্দ্র জরিপ, ও আয়সা (এগ্রো-ইকোসিস্টেম অ্যানালাইসিস কৃষি বাস্তুতন্ত্র বিশ্লেষণ) পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এ উদ্যোগ। এর মাধ্যমে জমিতে পোকা দেখা দিলেই কীটনাশক প্রয়োগের প্রচলিত প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে উপকারী ও ক্ষতিকর পোকার উপস্থিতি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে শিখছেন কৃষকেরা। এতে উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে পেকুয়া উপজেলায় ৮ হাজার ২৭০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সোনাইছড়ি ব্লকেই আবাদ হয়েছে ৫০০ হেক্টর জমিতে। এ ব্লকের মহাসড়কসংলগ্ন ২০ হেক্টর ফসলি মাঠ থেকে লটারির মাধ্যমে ৫০ শতকের একটি জমি ‘অতন্দ্র জরিপ প্লট’ হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। প্রতি বৃহস্পতিবার সকালে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার নেতৃত্বে ৩০ জন কৃষক দলবদ্ধভাবে ওই জমিতে গিয়ে পোকামাকড়ের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। কৃষি বিভাগের এ পদ্ধতিতে জমির কোনাকুনি পথে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ২০টি ধানগাছের গোছা নির্বাচন করা হয়। এরপর সেসব গাছে মাজরা পোকা, বাদামি গাছফড়িং ও পাতা মোড়ানো পোকার মতো ক্ষতিকর পোকার পাশাপাশি মাকড়সা, লেডিবার্ড বিটল ও ড্যামসেল ফ্লাইয়ের মতো উপকারী পোকার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। মাঠের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেখানে আদৌ কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন আছে কি না। কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উপকারী পোকার উপস্থিতি ও ক্ষতিকর পোকার আক্রমণের মাত্রা বিবেচনা না করে নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগ করলে ফসলের জন্য উপকারী পোকাও মারা পড়ে। অথচ প্রকৃতিতে এসব পোকা ক্ষতিকর পোকার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই মাঠ পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই এ পদ্ধতির মূল লক্ষ্য। উদ্যোগটির অন্যতম আকর্ষণ, পোকার চিড়িয়াখানা, বা ইনসেক্ট জু। এ ব্যবস্থায় কৃষকেরা জমি থেকে একটি ধানগাছের গোছা তুলে মাটির টবে স্থাপন করেন। এরপর স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঢেকে তার ভেতরে মাঠ থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন পোকা রাখা হয়। এতে কৃষকেরা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, কোন পোকা কীভাবে ফসলের ক্ষতি করছে এবং কোনটি ক্ষতিকর পোকাকে শিকার করছে। সরেজমিনে দেখা যায়, স্বচ্ছ পলিথিনে ঘেরা ধানগাছের মধ্যে মাকড়সার বাদামি গাছফড়িং শিকারের দৃশ্য দেখছেন কৃষকেরা। পাশাপাশি পোকামাকড়ের খাদ্যাভ্যাস, জীবনচক্র ও পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে হাতে-কলমে ধারণা নিচ্ছেন তাঁরা। বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে গড়ে উঠছে পোকা শনাক্তকরণ ও সঠিক বালাই ব্যবস্থাপনার দক্ষতা। স্থানীয় কৃষক আবদুল গফুর (৫৫) বলেন, ৩০ বছর ধরে চাষাবাদ করি। আগে মনে করতাম, সব পোকাই ক্ষতিকর। জমিতে পোকা দেখলেই বিষ দিতাম। এখন বুঝতে পারছি, অনেক পোকাই আমাদের বন্ধু। জরিপের পদ্ধতি শেখার পর আগে যেখানে দুইবার বিষ দিতে হতো, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে একবারও দিতে হচ্ছে না। আরেক কৃষক নুরুল আলম বলেন, আগে কীটনাশকের দোকানে গিয়ে বলতাম, জমিতে পোকা ধরেছে, বিষ দেন। এখন চায়ের দোকানে বসেই আমরা আলোচনা করি। জমিতে কী পোকা আছে, কোনটা ক্ষতিকর আর কোনটা উপকারী এসব বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করি। এতে খরচ অনেক কমেছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে উপকারী পোকামাকড়ের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে এবং পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ছাড়া অপরিকল্পিত বালাইনাশক প্রয়োগ কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় এবং ফসলের নিরাপদ উৎপাদনেও চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এ পরিস্থিতিতে মাঠভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, কৃষকের অংশগ্রহণ ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার এ উদ্যোগ অন্য এলাকার কৃষকদের জন্যও অনুসরণযোগ্য হতে পারে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিরশাদুল ইসলাম বলেন, কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে আমরা নিয়মিত অতন্দ্র জরিপ পরিচালনা করি। এর উদ্দেশ্য হলো, নির্দিষ্ট ব্লকে কী ধরনের পোকামাকড় ও রোগবালাই রয়েছে, তা শনাক্ত করা। এ তথ্যের ভিত্তিতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি আশপাশের ব্লকের কৃষকদের মধ্যেও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা আগেভাগে সতর্ক হতে পারেন। পেকুয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফারুক হোসেন চৌধুরী বলেন, অতন্দ্র জরিপ সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএমের একটি অংশ। পেকুয়ার পাঁচটি ব্লকে এ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। মাঠে বন্ধু ও শত্রু পোকার উপস্থিতি এবং আক্রমণের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বালাইনাশক প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা হয়। এতে অপ্রয়োজনীয় কীটনাশকের ব্যবহার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি। পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও নিরাপদ ফসল উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কৃষকদের কাছ থেকেও ভালো সাড়া পাচ্ছি।
সংবাদ শিরোনাম
পেকুয়ায় অতন্দ্র জরিপ ও আইপিএম পদ্ধতিতে বদলাচ্ছে কৃষকের চিন্তাভাবনা
-
স্টাফ রিপোর্টার (কক্সবাজার) - আপডেট সময় ০১:৩১:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
- 29
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























