বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী অন্যতম প্রধান বৃক্ষপ্রজাতি ‘সুন্দরী’ গাছের ওপর মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে মরনব্যাধি ‘আগামরা’ (টপ-ডাইং) রোগ। বর্তমানে বনের প্রায় ৩৯ শতাংশ সুন্দরী গাছ এ রোগে আক্রান্ত। সংখ্যার হিসেবে যা প্রায় ১২ কোটি ৯৫ লাখ। এর মধ্যে ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার গাছের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এর পাশাপাশি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে বনের কার্বন শোষণের ক্ষমতা। গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের সক্ষমতা আগের চেয়ে ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা বৈশ্বিক ও জাতীয় জলবায়ু সুরক্ষায় মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ‘ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দরবন’ (২০২৪-২৫) শীর্ষক একটি গবেষণা সম্পন্ন করে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর বন ভবনে আয়োজিত কর্মশালায় এবং ১০ অক্টোবর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ চিত্র তুলে ধরা হয়। সংকটের মূল কারণ হিসাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও নদীর নাব্যতা হ্রাসকে দায়ী বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষণা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত লবণাক্ততা, উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ হ্রাস ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বহুমুখী পরিবেশগত চাপের কারণে এ রোগের প্রকোপ বাড়ছে। সুন্দরবন একাডেমি খুলনার চেয়ারম্যান অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির জানান, পশ্চিম সুন্দরবনের কপোতাক্ষ, মাথাভাঙ্গা ও ভৈরবসহ অন্যান্য সংযোগ নদীগুলোর নাব্যতা হারানোর ফলে উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ আটকে গেছে। অতীতে মিষ্টি ও লবণাক্ত পানির সংমিশ্রণে তৈরি হতো প্রয়োজনীয় ‘ব্র্যাকিশ ওয়াটার’ (ইষৎ নোনা পানি), যা সুন্দরী গাছের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি জুগিয়েছে। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় জোয়ারের সাথে আসা অতিরিক্ত লবণাক্ত পলি সুন্দরী গাছের গোড়ায় জমা হচ্ছে। ফলে পলি জমে গাছের শ্বাসমূল (নিউমেটোফোর) ঢেকে যাচ্ছে, যা গাছটির অক্সিজেন গ্রহণ ও পুষ্টি শোষণে চরম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এতে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় গাছের পাতা বিবর্ণ হয়ে আগা থেকে শুকিয়ে যেতে থাকে। দুর্বল গাছগুলো সহজেই বিভিন্ন ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের শিকারে পরিণত হচ্ছে। বদলে যাচ্ছে বনের উদ্ভিদ বৈচিত্র্য গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনে বর্তমানে মোট প্রায় ৩৩ কোটি সুন্দরী গাছ রয়েছে। তবে আগামরা রোগের কারণে লবণাক্ততা-সংবেদনশীল এ প্রজাতির বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে থামছে। ফলে এর স্থান দখল করে নিচ্ছে লবণাক্ততা-সহিষ্ণু গেওয়া, বাইন ও কেওড়াসহ অন্যান্য প্রজাতির গাছ। প্রাকৃতিক পুনর্জন্মে এ ধরনের পরিবর্তন পুরো বনের প্রাণীকুল, খাদ্যশৃঙ্খল ও আবাসের প্রাকৃতিক কাঠামোকে বদলে দিতে পারে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন। হুমকিতে পরিবেশগত ভারসাম্য জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা বর্ম হিসেবে কাজ করে। কিন্তু কার্বন শোষণের সক্ষমতা ১৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় বিশ্বমঞ্চে ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বনটির পরিবেশগত ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া প্রয়োজন: ?নদীর নাব্য পুনরুদ্ধার: অবিলম্বে সংলগ্ন নদীগুলোর পলি অপসারণ ও প্রবাহ সচল করে বনের অভ্যন্তরে উজান থেকে মিষ্টি পানির স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা। ?ধারাবাহিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ: নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিতকরণ ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বনাঞ্চল ব্যবস্থাপনা চালনা করা। ?সংরক্ষণ পরিকল্পনা: রোগ প্রতিরোধে আক্রান্ত গাছের সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা এবং নতুন চারার যথাযথ বিকাশ মূল্যায়ন করে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ। ?সুন্দরবনের এই সংকট কেবল একটি বিশেষ বৃক্ষপ্রজাতির রোগ নয়, বরং এটি সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ও পরিবেশগত অস্তিত্বের সংকট। দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ম্যানগ্রোভের এই অমূল্য রতœ চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
সংবাদ শিরোনাম
সুন্দরবনে ১২ কোটি ৯৫ লাখ সুন্দরী গাছ ‘আগামরা’ রোগে আক্রান্ত কার্বন শোষণের সক্ষমতা কমেছে ১৫ শতাংশ, ঝুঁকিতে ২ কোটির বেশি গাছ
-
এস এম এ রউফ (কয়রা) খুলনা - আপডেট সময় ০৮:০০:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
- 6
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























