ঢাকা ০২:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo সুনামগঞ্জে মাঠ জুড়ে রোপা আমন চারার সবুজের সমারোহ Logo পাবনার রুপপুরে পৌঁছেছে ইউরেনিয়ামের ২য় চালনের গাড়িবহর Logo অবশেষে উদ্ধার হলো নাজিরপুরের আলোচিত ট্রলার ডুবির নিখোঁজ রিনা বেপারীর মৃত দেহ Logo রায়পুরে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা Logo বিজয়া দশমীতে নিমাগাছী মাতৃমন্দিরের উদ্যোগে ৬৩ অসহায় পরিবারের মাঝে বস্ত্র বিতরণ Logo সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় মসজিদের ধানক্ষেতে তৃতীয়বার বিষ প্রয়োগের অভিযোগ! Logo দিনাজপুরে সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় Logo সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন এখন বাংলাদেশ-আমান উল্লাহ আমান Logo বুড়িচংয়ে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে র‌্যালি-আলোচনা সভা Logo মেলান্দহে অসহায় বৃদ্ধের পাশে ইউএনও জিন্নাতুল আরা, খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান

আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সফট পাওয়ারগুলো ভাঙতে হবে

গত ৫ আগস্ট দেশে এক বিরাট বিপ্লব ঘটেছে। ছাত্র-জনতা যার নাম দিয়েছেন ৩৬ জুলাই বিপ্লব এবং দ্বিতীয় স্বাধীনতা। এ বিপ্লবের নায়ক তরুণ শিক্ষার্থীরা। ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার হাসিনার পুলিশ ও ক্যাডার বাহিনীর গুলি, টিয়ার সেলের ভয় উপক্ষো করে তাদের আহবানে সাড়া দিয়ে দেশের সর্বস্তরের জনতা রাজপথে নেমে এসেছিলেন। নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা বুলেট-বোমার আঘাতে নিহত হয়েছেন, শাহাদাত বরণ করেছেন। কিন্তু রাজপথ ছাড়েননি। বরং পয়লা জুলাই শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ এ আন্দোলন দমাতে হাসিনা যত নির্মমতা বাড়িয়েছে রাষ্ট্রশক্তির অবৈধ ব্যবহার করে খুনের নেশায় উন্মাদ হয়েছে রাজপথে ছাত্র-জনতার ঢেউ তত উত্তাল হয়েছে। রক্তের বন্যায় অন্যায়কে হটিয়ে দিয়েছে। শোককে শক্তিতে পরিণত করে সাহসে বুক বেঁধে ফ্যাসিবাদকে শুধু রুখেই দেয়নি ফ্যাসিবাদের রানী হাসিনাকে তার সাঙ্গ-পাঙ্গসহ দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে।
মুক্তিযোদ্ধা কোটার নামে স্বাধীনতা যুদ্ধের অঙ্গীকার – সাম্য ( ইনসাফপূর্ণ সম্পদ বন্টন), সামজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার – স্বাধীনতাযুদ্ধের এই তিন মূলনীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী চেতনার দোকাদার আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে বিদায় করেছে। বাংলাদেশের আকাশে উদিত হয়েছে নতুন সূর্য। মানুষ নতুন করে লাভ স্বাধীনতা করেছে। বিনিময়ে শাহাদাতের নাজরানা পেশ করেছেন হাজার ছাত্র-জনতা। চোখ,হাত, পা হারিয়ে অন্ধত্ব ও পঙ্গত্ব বরণ করেছেন ২০২৪ এর কয়েক হাজার স্বাধীনতাসংগ্রামী। এখন প্রশ্ন হলো- তাদের এ ত্যাগের দাম আমরা কবি.সাহিত্যিক,শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা কীভাবে পরিশোধ করব? নতুন করে স্বাধীনতা লাভ করা বাংলাদেশ গড়ায় আমরা কীভাবে অংশগ্রহণ করবো?
এ কথা কারো অজানা নয়,স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। সেই কঠিন কাজ যার যার অবস্থান থেকে করার শপথ নিয়েছেন এদেশের কোটি কোটি ছাত্র-জনতা। তাদের পথ দেখানোর কঠিন দায়িত্ব কবি.সাহিত্যিক,শিল্পী,সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের। কারণ তারাই দেশের সৃজনশীল নাগরিক। সৃজনশীল সৃষ্টির মাধ্যমে মনন গঠনের বড় দায়িত্ব পালনে তারা ভুল করলে গোটা জাতি আবার আঁধারে নয় তো চোরাবালিতে হারিয়ে যাবে। ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচার আবার জাতির ঘাড়ে সওয়ার হওয়ার সুযোগ পাবে। ইতোমধ্যেই সেই লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সফট পাওয়ারগুলো ভারতের বর্তমান উগ্রসাম্প্রদায়িক সরকারের সাহায্যে সুকৗশলে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে। তাদের হার্ড পাওয়ার ও সফট পাওয়ারগুলো মাঠে নামিয়ে প্রতি বিপ্লবের দুঃস্বপ্ন দেখছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন ফ্যাসিবাদী শক্তির মোকাবেলা করতে হলে অবশ্যই আমাদের নিজেরদের সফট পাওয়ারগুলোকে শক্তিশালী করার করতে হবে। তবেই ওদের সফট পাওয়ার দুর্বল হবে। প্রসঙ্গে রাজনীতি বিশ্লেষক আহমেদ খিজির ২০২৪-এর স্বাধীনতা লাভের পর একটি মন্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ্য করেছেন,‘রাজনীতিতে কেবল বিপুল জনসমর্থন আর আদর্শ থাকলেই হয় না, রাজনীতির খেলায় সফট পাওয়ার বা নরম শক্তি খুবই জরুরি। জনতার শক্তি যদি হয় হার্ড পাওয়ার, তবে মিডিয়া, সাংস্কৃতিক উইং ইত্যাদি হচ্ছে সফট পাওয়ার। পরেরটা জনতার সম্মতি উৎপাদন করে, এমনকি যখন কোনো দল বা আদর্শ বিপদে পড়ে তখন তাঁকে উদ্ধার করে বা উদ্ধার করার চেষ্টা করে। মিডিয়া, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক সংগঠন, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সমস্ত বুদ্ধিজীবীরা এই সফট পাওয়ারের জোগান দেয়।
বাংলাদেশে অন্তত দুইবার প্রচ- গণধিকৃত এবং জঘন্যতম স্বৈরাচারী শাসন করা দল আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়ার বয়ান দিয়ে দলটি বারংবার এই দেশের মানুষদের থেকে লুটেপুটে নিয়েছে। জনগণের লড়াইকে নিজেদের দাবি করে বয়ান দাঁড়া করিয়ে জনগণেরই সর্বনাশ করেছে। কিন্তু, অদ্ভুতভাবে এই দলটির গোড়া উপড়ানো যায়নি। আমরা দেশে দেশে দেখি স্বৈরাচারদের দলগুলো নির্মূল হয়ে যায়, উধাও হয়ে যায়। কিন্তু স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ আবার ফিরে আসে। এর কারণ তাদের সফট পাওয়ার।
১৬ বছরের দুঃশাসন আর গণহত্যার পর, দলের নেত্রী ভিতুর মতো পালিয়ে যাওয়ার পরেও আমরা দেখি আওয়ামী সফট পাওয়ার কাজ করে যাচ্ছে। প্রথমে তারা খেললো হিন্দু কার্ড। দশকের পর দশক ধরে হিন্দুদের সবচেয়ে বেশি অত্যাচার করা আওয়ামী লীগ প্রোপাগান্ডা করে তারাই এদেশের হিন্দুদের রক্ষক। দেশের বাইরেও নিজেদের সেকুলারিজমের একমাত্র ধারক বাহক বলে বেড়ায়। ভারতের গোলামি করে আসা আওয়ামী লীগ হিন্দু কার্ড দিয়ে সেদেশের মিডিয়া কাঁপালো। এই দেশেও কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করলো। হিন্দুদের বলির পাঁঠা ও গুটি বানালো। বিপরীতে এই দেশের কোনো দল বা শক্তি জোর গলায় বলতে পারলো না যে এই দেশে হিন্দু নিধন হয়নি। অতি অল্পমাত্রায় কিছু আওয়ামী নিধন হয়েছে। তাদের ধর্মপরিচয় সেখানে মুখ্য ছিল না। কিছুটা অস্বস্তি হলেও বাংলাদেশ সেই ফাঁড়া কাটিয়েছে। এরপর পনেরো আগস্টে শেখ মুজিবের শোক নিয়ে তারা খেললো সুশীল কার্ড। তাদের ১৬ বছরের উৎকট পালনের বিপরীতে মানুষ যেহেতু মুজিবকে ঘেন্না করা শুরু করেছে, তারা কাঁদুনি গাইলো আমাদেরও শোক করতে দিতে হবে। ছাত্র-জনতা তাঁদের কাউকে কাউকে ৩২ নম্বরে যেতে বাধা দেওয়ায় আন্দোলন আর নতুন সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করলো আওয়ামী সুশীল লীগ। স্বাভাবিকভাবেই, এই ফাঁদে পা দিলেন অনেক সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে নিজেদের ( আ’লীগ) নিয়োগ দেওয়া বিচারপতি, পুলিশ আর সেনাবাহিনীর কিছু অফিসার দিয়ে প্রতিবিপ্লবের চেষ্টাও চালালো। হাসিনাপুত্র জয় সরাসরি ভারতকে আহ্বান জানালো এই দেশের নির্বাচনের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে। আওয়ামী লীগ একটার পর একটা ষড়যন্ত্র চালাতেই থাকবে। সফট পাওয়ার থাকায় তারা থামবে না। এই বাংলাদেশ বিরোধী শক্তিকে থামানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে এদের সফট পাওয়ার ভেঙে দেওয়া। আর তারজন্য দরকার জনগণের মিডিয়া। জনগণের সাংস্কৃতিক উইং। গ্ণতান্ত্রিক শক্তিগুলো, যারা বাংলাদেশকে ভালোবাসে, তারা এগিয়ে না এলে আওয়ামী বিষ এদেশ থেকে পুরোপুরি নির্মূল করা যাবে না।’ ( সূত্র: বাংলা আউট লুক, ১৭ আগস্ট ২০২৪)।
পাঠক অবশ্যই ওপরের আলোচনার পর বুঝেছেন এটি কম্পিউটারের হার্ড ওয়্যার ও সফট ওয়্যার বা স্কিলের বিষয় নয়। এটি সম্পূর্ণ মানবিক। যা রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য বিষয় রাজনৈতিক শক্তিকে প্রভাবিত করে। মানবিক সফট পাওয়ার কি সেই ধারণা ওপরের উল্লেখ্য করা হয়েছে, তাই এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি না। তবে সফট পাওয়ারগুলো কীভাবে কাজ করে এবং কাজে লাগালোর পদ্ধতিই বা কী সেই সম্পর্কে এ নিবন্ধে এক ঝলক দৃষ্টি ফেরানোর চেষ্টা করা এই সময়ের দাবি।
এ সফট পাওয়ারগুলো কীভাবে কাজ করে
‘দ্বীন (ইসলাম) গ্রহণের ব্যাপারে কেন জোর-জবরদস্তি নেই; সত্য পথ সুস্পষ্ট হয়েছে ভ্রান্ত পথ থেকে। অতএব, যে তাগুতকে (আল্লাহদ্রোহী) অস্বীকার করবে ও আল্লাহর উপর ঈমান আনবে সে এমন এক দৃঢ?তর রজ্জু ধারন করল যা কখনো ভাঙ্গবে না। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।’ পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২৫৬ নম্বর এ আয়াতটির মধ্যে মানবিক সফট পাওয়ার কীভাবে কাজ করে সেই রহস্য লুকিয়ে আছে। কাউকে ভয় দেখিয়ে জোর করে,শারীরিকভাবে মানসিক চাপ দিয়ে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিষেধ করছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তার চেয়ে মানবচরিত্র সম্পর্কে কেউ বেশি জানেন না। কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। রাসুল সা. আল্লাহর নির্দেশে মানুষের কাছে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর আদেশ-নিদেশ উপস্থাপন করেছেন- কাব্যিক এবং প্রাণঞ্জল গদ্যে। পবিত্র কুরআনের সাহিত্যমান তৎকালীন আরবি সাহিত্যের বড় বড় প-িতদের জন্যও ছিলো এক বিস্ময়। আরবের বড় বড় কবিরা পবিত্র কুরআনের সবেচেয়ে ছোট সূরা আল কাউসারের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতেও সাহস দেখাননি। পবিত্র কুরআনের বাণী এবং এর আলোয় আলোকিত হজরত মুহাম্মদ সা এর চরিত্র ও কাজ সরাসরি সেই অন্ধকার যুগের মানুষের মন ও মস্তিকে আলোড়ন তুলেছিলো। আজকের আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায় শক্তিশালী সফট পাওয়ার হিসেবে হিসেবে কাজ করেছে আল্লাহর প্রেরিত পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআন এবং রাসুল সা. এর অনুপম চরিত্র। এ পদ্ধতিতেই তৎকালীন আরব অন্ধকার মুক্ত হয়েছে এবং সেই আলোয় আলোকিত হয়েছে গোটা বিশ্ব সেই ইঙ্গিত আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসুল সা.কে দিয়েছিলেন,‘আমি তোমাদের মধ্য হতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি যিনি তোমাদের নিকট আমার নিদর্শনাবলী পাঠ করেন এবং তোমাদেরকে পবিত্র করেন, তোমাদেরকে গ্রন্থগত জ্ঞান ও বিজ্ঞান শিক্ষা দেন এবং তোমরা যা অবগত ছিলেনা তা শিক্ষা দান করেন।- ( সূরা: বাকারা-১৫১)। এ শিক্ষা না দিয়ে জোর করে কাউকে কোন আদর্শ গ্রহণে বাধ্য করলে তারা রাষ্ট্র ও সমাজ পরিবর্তনের উপযোগী হন না। জোর করলে জীবন বাঁচাতে ভয়ের কারণে পক্ষে স্লোগান দিলেও, সুযোগ পেলেই আদর্শের ক্ষতি করে। তাই ভয় দেখিয়ে নয়, মানুষের হৃদয় জয় করতে হবে সফট পাওয়ার কাজে লাগিয়ে। তবেই যেকোন আগ্রাসী শক্তির মোকাবেলা করার মতো যোগ্য জনশক্তি তৈরি হবে।
পতিত স্বৈরাচার ভয় দেখিয়ে সমাজের নিরীহ দুর্বল মানুষগুলোকে বাধ্য করতো তাদের বিভিন্ন কর্মসূেিচত নিতে। এমন কি অস্ত্র হাতে তুলে দিয়ে বিরোধীদলের দলের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েও ছিলো। কিন্তু পতনের পর কী দেখা যাচ্ছে, যারা আওয়ামী লীগের পক্ষে ‘জয় বংলা স্লোগানে তুলেছে।’ তারা আজ কোথায়…। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের তাদের পক্ষে রাখতে অবশ্য বেশ কিছু সফট পাওয়ার তারা প্রয়োগ করছে যেমন: গণরুমে নিয়ে বয়ান শুনতে বাধ্য করা, র‌্যাগিং এর নামে চরিত্র নষ্ট করার মতো পাপ কাজে বাধ্য করা, লজ্জা ভাঙানোর নামে অশ্লীলতা উস্কে দেয়া, টাকা বিনিময়ে চেয়ে মন জয় করার অপচেষ্টা। কিন্তু এ সব কিছুই করছে সংশ্লিষ্টদের মনের বিরুদ্ধে, ভয় দেখিয়ে। ভয়ের কারণে মিছিল বড় করতে সাময়িকভাবে বাধ্যও অনেকে হয়েছে নিরীহ মানুষরা। কিন্তু বিবেকের তাড়ায় বিক্রি হয়ে যায়নি। জোর করে সফট ড্রিংক খাওনোর পর তা যেমন কারো কারো ওপর হার্ড ড্রিংকের মতো প্রভাব ফেরতে পারে তেমনি ফলাফল পেয়ে পতিত স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার অনুসারীরা।
পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,সফট পাওয়ার মাধ্যমে আগে পরিবেশ তৈরি করেছে। পরে সফট ও হার্ড পাওয়ারের সম্মিলিত আন্দোলনে অনেক বিপ্লব সফল হয়েছে। বিপ্লবোত্তর অবস্থায় যারা সফট পাওয়ারগুলো আরো শক্তিশালী করতে পেরেছে, তারাই অর্জন ধরে রাখাতে পেরেছে। এখন প্রশ্ন হলো ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর মিডিয়া, সাংস্কৃতিক উইং অর্থাৎ সফট পাওয়ারগুলোর কীভাবে দেশের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ভূমিকা পালন করবে, তাদের সামনের চ্যালেঞ্জগুলোই বা কী ?
মিডিয়া, সাংস্কৃতিক উইং এবং বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে দায়িত্ব
৩৬ জুলাই বা ৫ আগস্ট বিপ্লবের আগে দেশ বার বার ফ্যাসিবাদের কবলে পড়েছে। ফ্যাসিবাদীরা একটি বিশেষ চেতনার বৃত্ত দিয়ে গোটা জাতিকে বিভক্ত করে ফেলেছিলো। ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বাইরের সবাইকে তারা তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বৃত্তের বাইরে ফেলে জোরগলায় ‘রাজাকার’ বলে চিৎকার করতো। তাদের সেই তালিকায় স্বাধীনতার ঘোষক বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান,৯ম সেক্টর কমান্ডার মেজর আবদুল জলিলও ছিলেন। এই অস্ত্রের অপব্যবহার এতটাই বেড়ে গিয়েছিলো যে ১৯৭১ পরে যারা জন্মগ্রহণ করেছেন, তারা ভারতীয় আগ্রাসনের বিরোধিতা কিংবা ইসলামের পক্ষে কথা বললে তাদেরকে কেউও ‘ন্বাধীনতা বিরেধী রাজাকার’,‘জঙ্গী’ বলা হতো। ভারত এই অস্ত্র আওয়ামী লীগের হাতে তুলে দিয়েছিলো ফ্যাসিবাদের বিকাশের লক্ষ্যেই। এ নিবন্ধে ‘ভারতের নীলনকশা’ উপশিরোনামে এ বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে।
বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে মিডিয়া, সাংস্কৃতিক উইং-এর যে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে তার মধ্যে অন্যতম হলো: ‘ফ্যাসিবাদী শক্তির এই বয়ানের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বয়ান তৈরি করা। এতে ব্যর্থ হলে,ইতিহাসের গতি বদলানো যাবে না। এই দ্বিতীয় স্বাধীনতার মাধ্যমেই দেশ প্রকৃত স্বাধীনতা পেয়েছে, এর আগে স্বাধীনতার আমাদের আগ্রাসী ভারতের গোলামে পরিণত করেছিলো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করে ফ্যাসিবাদের শিকলে গোটা জাতিকে বন্দি করেছিলো। জাতিকে বিভক্তকারী ফ্যাসিবাদী বয়ানগুলো ধ্বংস করে জাতীয় ঐক্য সংহতি প্রতিষ্ঠার পক্ষের এমন নতুন নতুন বয়ান সৃষ্টি করতে হবে।
সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক এদেশের প্রত্যেক নাগরিক চায়। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার জন্য ভারত সরকারের কমিটি করার দরকার নেই। একথা এদেশের হিন্দু,মুসলিম,বৌদ্ধ খ্রিস্টান নাগরিকদের পক্ষ থেকে কঠোর ভাষায় ভারতকে জানাতে হবে। তাদের বলতে হবে ভারতের বাবরী মসজিদ ট্র্যাজেডির মতো কোন ঘটনা এদেশে ঘটেনি। গরু রক্ষার নামে বাংলাদেশে মানুষ হত্যা করা হয় না। অতএব তারা নিজ দেশের নাগরিকদের জীবন রক্ষার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করলেই বাংলাদেশের মানুষ খুশি। এদেশের কোন রাজনৈতিক নেতা কিংবা ধর্মীয় নেতা তাদের দেশের নেতাদের মতো ‘মসজিদে ঢুকে খুঁজে খুঁজে মুসলমানদের হত্যা করা হবে’ – এমন ঘোষণা দেন না। কোন প্রকার সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক বাক্য ব্যবহার না করে এ সত্য তুলে ধরতে হবে। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আদর্শের আলোকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য নিরাপদ এক সুন্দর দেশ গড়ার উপাদান সমৃদ্ধ ইতিবাচক গান,কবিতা, কথাসাহিত্য সৃষ্টি করে তা ছড়িয়ে দিতে হবে। ইতিবাচক সংবাদ,ফিচার বিশ্ববাসীর সামনে তুল ধরতে হবে। উল্লেখিত বিষয়গুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বিপ্লবোত্তর পরিস্থতিতে ভারত সরকারের নীতিনির্ধারকদের ফাঁস হওয়া ষড়যন্ত্র দেখলেই বোঝা যায়। তারা উল্লেখিত সফট পাওয়ারকে কতটা ভয় পাচ্ছে।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ এন্ড অ্যানালাইসিস সংক্ষেপে ’র’ এর সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নীলনকশা পর্যালোচনা করলে বিষয়টি খুব সহজে বুঝায় যায়। ভারত মনে করে তাদের সহযোগিতায় ১৯৭১ সালে দেশ জাতীয় হয়েছে এ চেতনা ধবংস করে সেই স্বাধীনতা অর্থবহ হয়নি, বরং তার মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারতের আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের শিকার হয়েছিলো। প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করেছে ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সফট পাওয়ারগুলো এই ধারনার শক্ত ভিত রচনা করতে পারলে আওয়ামী লীগের আবার রাজনীতিতে পুনর্বাসন শুধু কঠিনই হবে না, অসম্ভব হবে। তাই ভারত যেকোন মূল্যে তা প্রতহিত করতে চায়। তাই তারা মিডিয়াসন্ত্রাস ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আরো জোরদার করবে। বাংলাদেশে কথিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশের মোড়কে তাদের অর্থানুকূল্যে পরিচালিত মিডিয়া ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আরো সক্রিয় করবে। প্রয়োজনে নতুন নতুন নামে আরো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করবে।
ভারতের নীলনকশা
৩৬ জুলাইয়ের গণঅভ্যূত্থানকে ভারত মনে করে, একটি দার্শনিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি দিতে চাইলে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের একচ্ছত্র বয়ান ক্ষুণ্ন হবে। যা ঢাকায় ভারতের সফট পাওয়ারকে দুর্বল করে দেবে। এই গণঅভ্যূত্থানের চেতনাকে বৃহত্তর পরিসরে গ্রহণ করা হলে, ‘র’ এর দ্বিতীয় পরিকল্পনা ‘রিসেটেল আওয়ামী লীগ-২০২৫’-ও খুব কঠিন হয়ে যাবে। দিল্লিভিত্তিক একজন বাংলাদেশ গবেষক মনে করেন,হাসিনার অসাধারণ ক্ষমতা আছে কামব্যাক করার। তিনি ৮১-তে, ৯৬-তে কামব্যাক করেছেন। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে গিয়ে তিনি ২০০৯ সালে অপ্রতিরোধ্যভাবে ফিরে এসেছেন। তারা মনে করে, হাসিনা ফিরতে না পারলেও তিনি হয়ত দিল্লি থেকে দল পরিচালনা করবেন। কিন্তু তার দল ফিরতে পারবে। তবে সেখানে সংকট হবে গণঅভূত্থানের ইতিহাসকে জাতীয় ইতিহাস, সাহিত্যকর্মের অংশ করে একটি আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করলে। তাই ভারত ছাত্রদের বেশি সময় দিতে চায় না।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ভারতের এ ষড়যন্ত্রের কথা ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। জার্মানি থেকে প্রকাশিত ‘দ্য মিরর এশিয়া’ তাদের দিল্লি প্রতিনিধির উত্তম গুহ -এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে,‘১৬ জুলাই যখন হাসিনা সরকার শিক্ষার্থীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়, তখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সরকারের অনুকূলে চলে যায়। পরবর্তীতে শেখ হাসিনার বিশেষ অনুরোধ ও ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টার সরাসরি তদারকিতে বাংলাদেশে ‘র’ এর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৪০০ কর্মকর্তা ঢাকায় যান। তাদের ভাষায়, আন্দোলন কাশ্মীরি কায়দায় দমন করে তারা দিল্লি ফেরেন ২৮ জুলাই। কিন্তু পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ‘র’ ওয়াকিবহাল ছিল না। তাদের ভাষায়, তারা সিআইএ’র কৌশলের কাছে হেরে যান ৫ আগস্ট। যদিও ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দিল্লি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেওয়া নয়। ২ আগস্ট প্লান ‘সি’ এর অংশ হিসেবে এই পরিকল্পনা করে রাখে হাসিনা ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিদ ডোভাল। উল্লেখ্য, ভারত দক্ষিণ এশিয়াকে তার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অঞ্চল হিসেবে দেখে, ফলে এসব দেশের ব্যাপারে নিরাপত্তা উপদেষ্টার একটা হস্তক্ষেপ থাকে। ‘র’ ৫ আগস্টের পর ১০ আগস্ট সংখ্যালঘুদের সমাবেশের আড়ালে একটি প্রতিবিপ্লব করার পরিকল্পনা করে। তার জন্য বিপুল সংখ্যক ভারতীয় সাংবাদিকও সেদিন ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন। সেটি ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় ক্যু পরিকল্পনা করা হয় ১৫ আগস্ট। সেটিও ব্যর্থ হয়। … জানা গেছে, আপাতত দুটি প্রোজেক্ট দেওয়া হয়েছে। প্রথম প্রোজেক্ট ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর। এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য হলো ইউনূস সরকারের ওপর ভর করেছে শিবির, হেফাজত ও হিযবুত তাহরির- বামপন্থিদের মাধ্যমে এই বয়ান হাজির করানো। সেই সাথে হেফাজত ইসলামের একটি অংশ, যার সাথে ‘র’ এর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ, তাদের বোঝানো হচ্ছে ‘ড. ইউনূস সুদখোর, তিনি মার্কিন এজেন্ট, কোনভাবে একজন ভালো মুসলিম নন। বেশ কিছুদিন গেলে এই সরকার সমকামীদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে পারে’। এই গ্রুপকে জামায়াতের সাথে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ঐক্যে না যাওয়ার জন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে মিশন থেকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, আন্দোলনকারীদের সাথে হিযবুত তাহরীর সংশ্লিষ্টতা ও তাদের ভাবাদর্শ নিয়ে একটি ভয় তৈরি করার দিকে। দ্য মিরর এশিয়া জানতে পেরেছে, ইতিমধ্যে ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী’ তিনজন বামপন্থী সাবেক ছাত্রনেতার সাথে পশ্চিম বাংলায় দিল্লিতে কর্মরত একজন সাংবাদিক দীর্ঘক্ষণ আলাপ করেছেন। তাদের সাথে ভবিষ্যতে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এদিকে, বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যে ‘র’ এর মধ্যে একটি উপ-গ্রুপ করা হয়েছে ‘বাংলা মিশন’ সম্পন্ন করার জন্য। সম্প্রতি চিকেন নেক নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহর মন্তব্য ও সেভেন সিস্টার নিয়ে সমন্বয়কদের কারো কারো বক্তব্যকেও আমলে নিয়েছে বাংলাদেশ নিয়ে গঠিত গোয়েন্দা উপ-টিম ‘বাংলা মিশন’। তাদের প্রত্যেকের ফেসবুক স্ট্যাটাসকে হিন্দি ও ইংরেজিতে অনুবাদ করে ভিক্টর-২ এর টেবিলে দেওয়া হয়েছে। ভিক্টর-২ হলো ‘র’ এর একটি প্রোটোকল, যার কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কিত সর্বশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, আন্দোলনকারী সমন্বয়কদের নিয়ে ও তাদের আদর্শিক ধারণা নিয়ে দিল্লির দুটি ও আসামের একটি থিংক ট্যাংক গত ২০ দিন ধরে গবেষণা করেছে। তিনটি সংস্থার রিপোর্ট বলছে, সমন্বয়করা যে দল গঠন করতে যাবে তা হবে একটি ভারতবিরোধী রাজনৈতিক দল। বামপন্থি বৈপ্লবিক ধারণা তারা পোষণ করলেও তাদের সাথে ধর্মের বিরোধ থাকবে না। এই আদর্শের ফলে মূলত দেশের বামপন্থিদের রাজনৈতিক স্পেস একেবারে শূন্য হয়ে যাবে বলে মনে করছেন গবেষকরা। ফলে তারা বামদের সাথে তরুণদের একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হবে বলে ধারণা করছেন। সে চিন্তা থেকেই ‘র’ বামপন্থি ছাত্র নেতাদের সাথে যোগাযোগ করছে।’
তাই বর্তমান প্রজন্মের মনন গঠনে ভূমিকা রাখতে হলে কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের এ জেনারেশনের বৈশিষ্টগুলো জানতে হবে। ৫ আগস্টে নেতৃত্ব দেয়া জেনারেশনকে বলা হয়, তাদের বলা হচ্ছে ‘জেনারেশন জেড’ বা সংক্ষেপে ‘জেন-জি।
জেনারেশন জেড কারা এবং এদের বৈশিষ্ট্য কী
‘জেনারেশন জেড’ হলো নব্বইয়ের দশকের শেষ তিন বছর এবং দুই হাজার সাল থেকে ২০১২ পর্যন্ত যাদের জন্ম। ১৯৯৭-২০১২ সময়কালে জন্ম নেওয়া প্রত্যেকের বয়স এখন ১২ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে। এর আগের প্রজন্ম হলো মিলেনিয়াল জেনারেশন। তাদের সংক্ষিপ্ত নাম জেন-ওয়াই। আর তারও আগের প্রজন্মের নাম জেনারেশন এক্স। তাদের বৈশিষ্ট্য কেমন? মূলত এই প্রজন্ম হলো প্রকৃত ডিজিটাল প্রজন্ম। এর আগের প্রজন্ম ইন্টারনেটের উত্থান দেখলেও তারা ডিশ ক্যাবল সংযুক্ত টেলিভিশন দেখেছে, ল্যান্ডফোনও ব্যবহার করেছে। কিন্তু জেন-জি গোত্রের অধিকাংশই বড় হয়েছে একধরনের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সময়ের মধ্য দিয়ে। এই প্রজন্মের অনেকেই একেবারে ছোটবেলা থেকেই ফেসবুক ব্যবহার করছে, অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে সময় কাটাচ্ছে; কিন্তু এর আগের প্রজন্মের বেড়ে ওঠা এমন ছিল না। এখন জেন-জির অনেক সদস্যরাই স্মার্টফোন আসার আগের কোনো জীবনের কথা মনে করতে পারে না।
আরও একটি বিষয় হলো, জেন-জি সাধারণত শহর বা মহানগর এলাকার বড় হচ্ছে। এদের খুব সীমিত একটা অংশ বেড়ে উঠছে গ্রামাঞ্চলে। বিশ্বকোষ ব্রিটানিকা বলছে, জেন-জি এর সবচেয়ে বয়স্ক সদস্যরা বিয়ের ক্ষেত্রে দেরি করেছেন। এদের মাত্র ৪ শতাংশ ১৮ থেকে ২১ বছর বয়সের মধ্যে বিয়ে করছেন। এই হার তাদের আগের প্রজন্মের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
জেনারেশন জেডের সদস্যদের আগের প্রজন্মের চেয়ে বেশি বাস্তববাদী এবং অল্পবয়সে দ্রুত পরিপক্ব। এই প্রজন্মের মাঝে ক্যারিয়ার নির্ধারণে সতর্কতা, শিক্ষা বা ডিগ্রি অর্জনের হারও বেড়েছে। আবার এই প্রজন্মেরই অনেকের বাবা-মায়েরা উচ্চশিক্ষিত, যেটিও আগের তুলনায় বেশি। তবে জেন-জি’র সদস্যরা ক্যারিয়ার সচেতন হওয়ার একটি কারণ হিসেবে অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন,আগের প্রজন্মের মাঝে আর্থিক সমস্যা ও কর্মসংস্থানে অস্থিরতাসহ নানা সমস্যা দেখা। অনেকের বাবা-মা ছিলেন এক্স জেনারেশনের। তাদের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা দেখে থাকলে জেন-জি’রা শৈশবে একধরনের সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল। যেটি তাদের মধ্যে এখন অনেকবেশি সচেতনতা তৈরি হওয়ার কারণ। সবশেষে কোভিড মহামারীও এই প্রজন্মকে নতুন করে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের জেন-জি দেখে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসন: গুম,খুন, লুটপাট,অর্থ-পাচার এবং রাষ্ট্রপরিচালকদের দম্ভ ও মিথ্যাচার, ইতিহাস বিকৃতি। তাই তারা যেকোন কিছু গ্রহণ করার আগে ভালো করে দেখে তারপর বিশ্বাস করে। সত্য বলে কোন কিছু গ্রহণ করার পর যদি কখনো বুঝতে পারে তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। তাহলে তারা তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করে। এরপর কোন সত্য উপস্থাপন করলেও তাদের সন্দেহ থেকে যায়। জীবন দিয়ে হলেও সত্য প্রতিষ্ঠা করতে তারা পিছ পা হয় না। তাই কবি,সাহিত্যিক ও শিল্পীরা কোন কিছু উপস্থাপন করার আগে তাদের এ বৈশিষ্ট্যগুলোর ভুলে গেছে চলবে না। এদেশের একটি শ্রেণির পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী ব্যান্ডওয়াগন এফেক্ট -এ আক্রান্ত। তরুণরা চায় এদেশের মানুষ আওয়ামী লীগের সময় চিন্তার যে দাসত্ব বরণ করছে তারা তা থেকে মুক্তি পাক। সেই মুক্তি দিশা দিতে সফট পাওয়ারগুলোর কার্যকর ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে।
আওয়ামী ব্যান্ডওয়াগন এফেক্টের কুপ্রভাব দূর করতে হবে
“ব্যান্ডওয়াগন এফেক্ট” (ইধহফধিমড়হ ঊভভবপঃ) এ প্রক্রিয়ায় ফ্যাসিস্ট শাসকরা জনগণের চিন্তার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। তারা যা প্রচার করে তাই মানুষ বিশ্বাস করে বাধ্য হয়। আওয়ামী লীগও বিগত ১৫ বছরে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে এই অপকর্মটিই করছে। তারা শুধু আমাদের কথা বলার অধিকার, ভোটের অধিকার, নিরাপদে বাঁচার অধিকার, সাম্যের অধিকারই কেড়ে নিয়েছিলো না। তারা হরণ করেছিলো মানুষের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতাও। এ প্রসঙ্গে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত নিবন্ধে কাজী জেসিন বলেছেন,‘ফ্যাসীবাদের ভিত্তি মজবুত হয় সবসময় গণমাধ্যম এবং শিল্পীদের দ্বারা। বিগত পনেরো বছর আওয়ামী লীগের বর্ধিত মাধ্যম হিসেবে মূলত কাজ করেছে গণমাধ্যম ও শিল্পীসমাজের বৃহৎ অংশ। আমরা দেখেছি গণমাধ্যম পরিণত হয়েছে মাফিয়া মাধ্যমে। প্রতিবাদীরা সেখানে নানাভাবে পিষ্ট হয়েছেন। শিল্পীরা লিখে, গান গেয়ে, অভিনয় করে, সিনেমা, নানারকম মূর্তি বানিয়ে এই ফ্যাসিস্ট সরকারকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, কোনো জনগণ যখন পুঁজিবাদী দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজব্যবস্থার মধ্যে গা এলিয়ে আগে বাড়তে চায়, তখন জ্ঞানের চেয়ে আর্থিক সুবিধালাভে তার মনোযোগ বেশি থাকে। আর তাতে সুবিধা হয় যেকোনো ফ্যাসিস্ট বা মাফিয়া সরকারের। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই ঘটনা। সবার হাতে অর্থ তুলে দিয়ে, সবাইকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে সরকার তার ভিত্তি মজবুত করেছে। কিন্তু এটা সম্ভব হয়েছে কীভাবে? কীভাবে এদেশের বহু মানুষ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এরকম একটা মাফিয়া সরকারকে সহ্য করেছে? এর পেছনে আছে কয়েকটি কারণ। মূল যে কারণটি এড্রেস না করলেই নয়, তা হলো চিন্তায় করাপ্ট হওয়া। চিন্তার করাপশন মানুষের কীভাবে হয়? “ব্যান্ডওয়াগন এফেক্ট” (ইধহফধিমড়হ ঊভভবপঃ) বলে একটি ধারণার সূত্রপাত হয় ১৯ শতকের শেষের দিকে। থমাস নস্ট নামক একজন রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট এই ধারণাটি জনপ্রিয় করেন। তার কার্টুনে তিনি “ব্যান্ডওয়াগন”, একটি মিউজিক্যাল ওয়াগনকে প্রতিনিধিত্ব করতেন, যা রাজনৈতিক প্রচারণার সময় মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যবহৃত হতো। ধারণাটি ছিল যে মানুষ ‘ব্যান্ডওয়াগনে’ যোগ দেবে এবং একটি প্রার্থী বা উদ্দেশ্যকে সমর্থন করবে কেবলমাত্র কারণ এটি জনপ্রিয় এবং চলন্ত। সময়ের সঙ্গে, এই প্রক্রিয়া একটি ব্যাপক মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক প্রভাব বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, যেখানে মানুষ ট্রেন্ড বা আচরণ অনুসরণ করে কারণ তারা দেখে অন্যরা এটি করছে এবং প্রচারমাধ্যমও একাধারে প্রচার করতে থাকে তাই যা ক্ষমতাবানদের চিন্তাকে তুলে ধরে। এই ব্যান্ডওয়াগন তত্ত্বের কাছে পরাস্ত হয় মূলত যাদের জ্ঞানের অভাব থাকে। জ্ঞানের অভাব বলতে এখানে তাদের কথা বলছি যারা কোনো “বহুল প্রচারিত আদর্শ, বিশ্বাস বা সংস্কৃতি” যা মূলত ফ্যাসিস্টের প্রোপাগান্ডার অংশ, তা বিশ্বাস করার আগে নিজের বোধ ও বিবেচনা দিয়ে মোকাবিলা করার ক্ষমতা রাখেন না।’ “ব্যান্ডওয়াগন এফেক্ট” (ইধহফধিমড়হ ঊভভবপঃ) প্রক্রিয়ার কুপ্রভাব এ জন্য অনেকাংশেই দায়ী। তাই আওয়ামী লীগের “ব্যান্ডওয়াগন এফেক্ট”-এর কুপ্রভাব থেকে মুক্তি দিতে বিশ্বাসী ধারার মুক্ত ও উদার মনের কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী ও সাংবাদিকদের এগিয়ে আসতে হবে। ( মতামত লেখকের নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়) লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

সুনামগঞ্জে মাঠ জুড়ে রোপা আমন চারার সবুজের সমারোহ

আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সফট পাওয়ারগুলো ভাঙতে হবে

আপডেট সময় ০১:৪৫:৪০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

গত ৫ আগস্ট দেশে এক বিরাট বিপ্লব ঘটেছে। ছাত্র-জনতা যার নাম দিয়েছেন ৩৬ জুলাই বিপ্লব এবং দ্বিতীয় স্বাধীনতা। এ বিপ্লবের নায়ক তরুণ শিক্ষার্থীরা। ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার হাসিনার পুলিশ ও ক্যাডার বাহিনীর গুলি, টিয়ার সেলের ভয় উপক্ষো করে তাদের আহবানে সাড়া দিয়ে দেশের সর্বস্তরের জনতা রাজপথে নেমে এসেছিলেন। নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা বুলেট-বোমার আঘাতে নিহত হয়েছেন, শাহাদাত বরণ করেছেন। কিন্তু রাজপথ ছাড়েননি। বরং পয়লা জুলাই শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ এ আন্দোলন দমাতে হাসিনা যত নির্মমতা বাড়িয়েছে রাষ্ট্রশক্তির অবৈধ ব্যবহার করে খুনের নেশায় উন্মাদ হয়েছে রাজপথে ছাত্র-জনতার ঢেউ তত উত্তাল হয়েছে। রক্তের বন্যায় অন্যায়কে হটিয়ে দিয়েছে। শোককে শক্তিতে পরিণত করে সাহসে বুক বেঁধে ফ্যাসিবাদকে শুধু রুখেই দেয়নি ফ্যাসিবাদের রানী হাসিনাকে তার সাঙ্গ-পাঙ্গসহ দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে।
মুক্তিযোদ্ধা কোটার নামে স্বাধীনতা যুদ্ধের অঙ্গীকার – সাম্য ( ইনসাফপূর্ণ সম্পদ বন্টন), সামজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার – স্বাধীনতাযুদ্ধের এই তিন মূলনীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী চেতনার দোকাদার আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে বিদায় করেছে। বাংলাদেশের আকাশে উদিত হয়েছে নতুন সূর্য। মানুষ নতুন করে লাভ স্বাধীনতা করেছে। বিনিময়ে শাহাদাতের নাজরানা পেশ করেছেন হাজার ছাত্র-জনতা। চোখ,হাত, পা হারিয়ে অন্ধত্ব ও পঙ্গত্ব বরণ করেছেন ২০২৪ এর কয়েক হাজার স্বাধীনতাসংগ্রামী। এখন প্রশ্ন হলো- তাদের এ ত্যাগের দাম আমরা কবি.সাহিত্যিক,শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা কীভাবে পরিশোধ করব? নতুন করে স্বাধীনতা লাভ করা বাংলাদেশ গড়ায় আমরা কীভাবে অংশগ্রহণ করবো?
এ কথা কারো অজানা নয়,স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। সেই কঠিন কাজ যার যার অবস্থান থেকে করার শপথ নিয়েছেন এদেশের কোটি কোটি ছাত্র-জনতা। তাদের পথ দেখানোর কঠিন দায়িত্ব কবি.সাহিত্যিক,শিল্পী,সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের। কারণ তারাই দেশের সৃজনশীল নাগরিক। সৃজনশীল সৃষ্টির মাধ্যমে মনন গঠনের বড় দায়িত্ব পালনে তারা ভুল করলে গোটা জাতি আবার আঁধারে নয় তো চোরাবালিতে হারিয়ে যাবে। ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচার আবার জাতির ঘাড়ে সওয়ার হওয়ার সুযোগ পাবে। ইতোমধ্যেই সেই লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সফট পাওয়ারগুলো ভারতের বর্তমান উগ্রসাম্প্রদায়িক সরকারের সাহায্যে সুকৗশলে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে। তাদের হার্ড পাওয়ার ও সফট পাওয়ারগুলো মাঠে নামিয়ে প্রতি বিপ্লবের দুঃস্বপ্ন দেখছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন ফ্যাসিবাদী শক্তির মোকাবেলা করতে হলে অবশ্যই আমাদের নিজেরদের সফট পাওয়ারগুলোকে শক্তিশালী করার করতে হবে। তবেই ওদের সফট পাওয়ার দুর্বল হবে। প্রসঙ্গে রাজনীতি বিশ্লেষক আহমেদ খিজির ২০২৪-এর স্বাধীনতা লাভের পর একটি মন্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ্য করেছেন,‘রাজনীতিতে কেবল বিপুল জনসমর্থন আর আদর্শ থাকলেই হয় না, রাজনীতির খেলায় সফট পাওয়ার বা নরম শক্তি খুবই জরুরি। জনতার শক্তি যদি হয় হার্ড পাওয়ার, তবে মিডিয়া, সাংস্কৃতিক উইং ইত্যাদি হচ্ছে সফট পাওয়ার। পরেরটা জনতার সম্মতি উৎপাদন করে, এমনকি যখন কোনো দল বা আদর্শ বিপদে পড়ে তখন তাঁকে উদ্ধার করে বা উদ্ধার করার চেষ্টা করে। মিডিয়া, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক সংগঠন, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সমস্ত বুদ্ধিজীবীরা এই সফট পাওয়ারের জোগান দেয়।
বাংলাদেশে অন্তত দুইবার প্রচ- গণধিকৃত এবং জঘন্যতম স্বৈরাচারী শাসন করা দল আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়ার বয়ান দিয়ে দলটি বারংবার এই দেশের মানুষদের থেকে লুটেপুটে নিয়েছে। জনগণের লড়াইকে নিজেদের দাবি করে বয়ান দাঁড়া করিয়ে জনগণেরই সর্বনাশ করেছে। কিন্তু, অদ্ভুতভাবে এই দলটির গোড়া উপড়ানো যায়নি। আমরা দেশে দেশে দেখি স্বৈরাচারদের দলগুলো নির্মূল হয়ে যায়, উধাও হয়ে যায়। কিন্তু স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ আবার ফিরে আসে। এর কারণ তাদের সফট পাওয়ার।
১৬ বছরের দুঃশাসন আর গণহত্যার পর, দলের নেত্রী ভিতুর মতো পালিয়ে যাওয়ার পরেও আমরা দেখি আওয়ামী সফট পাওয়ার কাজ করে যাচ্ছে। প্রথমে তারা খেললো হিন্দু কার্ড। দশকের পর দশক ধরে হিন্দুদের সবচেয়ে বেশি অত্যাচার করা আওয়ামী লীগ প্রোপাগান্ডা করে তারাই এদেশের হিন্দুদের রক্ষক। দেশের বাইরেও নিজেদের সেকুলারিজমের একমাত্র ধারক বাহক বলে বেড়ায়। ভারতের গোলামি করে আসা আওয়ামী লীগ হিন্দু কার্ড দিয়ে সেদেশের মিডিয়া কাঁপালো। এই দেশেও কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করলো। হিন্দুদের বলির পাঁঠা ও গুটি বানালো। বিপরীতে এই দেশের কোনো দল বা শক্তি জোর গলায় বলতে পারলো না যে এই দেশে হিন্দু নিধন হয়নি। অতি অল্পমাত্রায় কিছু আওয়ামী নিধন হয়েছে। তাদের ধর্মপরিচয় সেখানে মুখ্য ছিল না। কিছুটা অস্বস্তি হলেও বাংলাদেশ সেই ফাঁড়া কাটিয়েছে। এরপর পনেরো আগস্টে শেখ মুজিবের শোক নিয়ে তারা খেললো সুশীল কার্ড। তাদের ১৬ বছরের উৎকট পালনের বিপরীতে মানুষ যেহেতু মুজিবকে ঘেন্না করা শুরু করেছে, তারা কাঁদুনি গাইলো আমাদেরও শোক করতে দিতে হবে। ছাত্র-জনতা তাঁদের কাউকে কাউকে ৩২ নম্বরে যেতে বাধা দেওয়ায় আন্দোলন আর নতুন সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করলো আওয়ামী সুশীল লীগ। স্বাভাবিকভাবেই, এই ফাঁদে পা দিলেন অনেক সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে নিজেদের ( আ’লীগ) নিয়োগ দেওয়া বিচারপতি, পুলিশ আর সেনাবাহিনীর কিছু অফিসার দিয়ে প্রতিবিপ্লবের চেষ্টাও চালালো। হাসিনাপুত্র জয় সরাসরি ভারতকে আহ্বান জানালো এই দেশের নির্বাচনের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে। আওয়ামী লীগ একটার পর একটা ষড়যন্ত্র চালাতেই থাকবে। সফট পাওয়ার থাকায় তারা থামবে না। এই বাংলাদেশ বিরোধী শক্তিকে থামানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে এদের সফট পাওয়ার ভেঙে দেওয়া। আর তারজন্য দরকার জনগণের মিডিয়া। জনগণের সাংস্কৃতিক উইং। গ্ণতান্ত্রিক শক্তিগুলো, যারা বাংলাদেশকে ভালোবাসে, তারা এগিয়ে না এলে আওয়ামী বিষ এদেশ থেকে পুরোপুরি নির্মূল করা যাবে না।’ ( সূত্র: বাংলা আউট লুক, ১৭ আগস্ট ২০২৪)।
পাঠক অবশ্যই ওপরের আলোচনার পর বুঝেছেন এটি কম্পিউটারের হার্ড ওয়্যার ও সফট ওয়্যার বা স্কিলের বিষয় নয়। এটি সম্পূর্ণ মানবিক। যা রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য বিষয় রাজনৈতিক শক্তিকে প্রভাবিত করে। মানবিক সফট পাওয়ার কি সেই ধারণা ওপরের উল্লেখ্য করা হয়েছে, তাই এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি না। তবে সফট পাওয়ারগুলো কীভাবে কাজ করে এবং কাজে লাগালোর পদ্ধতিই বা কী সেই সম্পর্কে এ নিবন্ধে এক ঝলক দৃষ্টি ফেরানোর চেষ্টা করা এই সময়ের দাবি।
এ সফট পাওয়ারগুলো কীভাবে কাজ করে
‘দ্বীন (ইসলাম) গ্রহণের ব্যাপারে কেন জোর-জবরদস্তি নেই; সত্য পথ সুস্পষ্ট হয়েছে ভ্রান্ত পথ থেকে। অতএব, যে তাগুতকে (আল্লাহদ্রোহী) অস্বীকার করবে ও আল্লাহর উপর ঈমান আনবে সে এমন এক দৃঢ?তর রজ্জু ধারন করল যা কখনো ভাঙ্গবে না। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।’ পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২৫৬ নম্বর এ আয়াতটির মধ্যে মানবিক সফট পাওয়ার কীভাবে কাজ করে সেই রহস্য লুকিয়ে আছে। কাউকে ভয় দেখিয়ে জোর করে,শারীরিকভাবে মানসিক চাপ দিয়ে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিষেধ করছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তার চেয়ে মানবচরিত্র সম্পর্কে কেউ বেশি জানেন না। কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। রাসুল সা. আল্লাহর নির্দেশে মানুষের কাছে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর আদেশ-নিদেশ উপস্থাপন করেছেন- কাব্যিক এবং প্রাণঞ্জল গদ্যে। পবিত্র কুরআনের সাহিত্যমান তৎকালীন আরবি সাহিত্যের বড় বড় প-িতদের জন্যও ছিলো এক বিস্ময়। আরবের বড় বড় কবিরা পবিত্র কুরআনের সবেচেয়ে ছোট সূরা আল কাউসারের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতেও সাহস দেখাননি। পবিত্র কুরআনের বাণী এবং এর আলোয় আলোকিত হজরত মুহাম্মদ সা এর চরিত্র ও কাজ সরাসরি সেই অন্ধকার যুগের মানুষের মন ও মস্তিকে আলোড়ন তুলেছিলো। আজকের আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায় শক্তিশালী সফট পাওয়ার হিসেবে হিসেবে কাজ করেছে আল্লাহর প্রেরিত পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআন এবং রাসুল সা. এর অনুপম চরিত্র। এ পদ্ধতিতেই তৎকালীন আরব অন্ধকার মুক্ত হয়েছে এবং সেই আলোয় আলোকিত হয়েছে গোটা বিশ্ব সেই ইঙ্গিত আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসুল সা.কে দিয়েছিলেন,‘আমি তোমাদের মধ্য হতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি যিনি তোমাদের নিকট আমার নিদর্শনাবলী পাঠ করেন এবং তোমাদেরকে পবিত্র করেন, তোমাদেরকে গ্রন্থগত জ্ঞান ও বিজ্ঞান শিক্ষা দেন এবং তোমরা যা অবগত ছিলেনা তা শিক্ষা দান করেন।- ( সূরা: বাকারা-১৫১)। এ শিক্ষা না দিয়ে জোর করে কাউকে কোন আদর্শ গ্রহণে বাধ্য করলে তারা রাষ্ট্র ও সমাজ পরিবর্তনের উপযোগী হন না। জোর করলে জীবন বাঁচাতে ভয়ের কারণে পক্ষে স্লোগান দিলেও, সুযোগ পেলেই আদর্শের ক্ষতি করে। তাই ভয় দেখিয়ে নয়, মানুষের হৃদয় জয় করতে হবে সফট পাওয়ার কাজে লাগিয়ে। তবেই যেকোন আগ্রাসী শক্তির মোকাবেলা করার মতো যোগ্য জনশক্তি তৈরি হবে।
পতিত স্বৈরাচার ভয় দেখিয়ে সমাজের নিরীহ দুর্বল মানুষগুলোকে বাধ্য করতো তাদের বিভিন্ন কর্মসূেিচত নিতে। এমন কি অস্ত্র হাতে তুলে দিয়ে বিরোধীদলের দলের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েও ছিলো। কিন্তু পতনের পর কী দেখা যাচ্ছে, যারা আওয়ামী লীগের পক্ষে ‘জয় বংলা স্লোগানে তুলেছে।’ তারা আজ কোথায়…। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের তাদের পক্ষে রাখতে অবশ্য বেশ কিছু সফট পাওয়ার তারা প্রয়োগ করছে যেমন: গণরুমে নিয়ে বয়ান শুনতে বাধ্য করা, র‌্যাগিং এর নামে চরিত্র নষ্ট করার মতো পাপ কাজে বাধ্য করা, লজ্জা ভাঙানোর নামে অশ্লীলতা উস্কে দেয়া, টাকা বিনিময়ে চেয়ে মন জয় করার অপচেষ্টা। কিন্তু এ সব কিছুই করছে সংশ্লিষ্টদের মনের বিরুদ্ধে, ভয় দেখিয়ে। ভয়ের কারণে মিছিল বড় করতে সাময়িকভাবে বাধ্যও অনেকে হয়েছে নিরীহ মানুষরা। কিন্তু বিবেকের তাড়ায় বিক্রি হয়ে যায়নি। জোর করে সফট ড্রিংক খাওনোর পর তা যেমন কারো কারো ওপর হার্ড ড্রিংকের মতো প্রভাব ফেরতে পারে তেমনি ফলাফল পেয়ে পতিত স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার অনুসারীরা।
পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,সফট পাওয়ার মাধ্যমে আগে পরিবেশ তৈরি করেছে। পরে সফট ও হার্ড পাওয়ারের সম্মিলিত আন্দোলনে অনেক বিপ্লব সফল হয়েছে। বিপ্লবোত্তর অবস্থায় যারা সফট পাওয়ারগুলো আরো শক্তিশালী করতে পেরেছে, তারাই অর্জন ধরে রাখাতে পেরেছে। এখন প্রশ্ন হলো ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর মিডিয়া, সাংস্কৃতিক উইং অর্থাৎ সফট পাওয়ারগুলোর কীভাবে দেশের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ভূমিকা পালন করবে, তাদের সামনের চ্যালেঞ্জগুলোই বা কী ?
মিডিয়া, সাংস্কৃতিক উইং এবং বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে দায়িত্ব
৩৬ জুলাই বা ৫ আগস্ট বিপ্লবের আগে দেশ বার বার ফ্যাসিবাদের কবলে পড়েছে। ফ্যাসিবাদীরা একটি বিশেষ চেতনার বৃত্ত দিয়ে গোটা জাতিকে বিভক্ত করে ফেলেছিলো। ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বাইরের সবাইকে তারা তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বৃত্তের বাইরে ফেলে জোরগলায় ‘রাজাকার’ বলে চিৎকার করতো। তাদের সেই তালিকায় স্বাধীনতার ঘোষক বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান,৯ম সেক্টর কমান্ডার মেজর আবদুল জলিলও ছিলেন। এই অস্ত্রের অপব্যবহার এতটাই বেড়ে গিয়েছিলো যে ১৯৭১ পরে যারা জন্মগ্রহণ করেছেন, তারা ভারতীয় আগ্রাসনের বিরোধিতা কিংবা ইসলামের পক্ষে কথা বললে তাদেরকে কেউও ‘ন্বাধীনতা বিরেধী রাজাকার’,‘জঙ্গী’ বলা হতো। ভারত এই অস্ত্র আওয়ামী লীগের হাতে তুলে দিয়েছিলো ফ্যাসিবাদের বিকাশের লক্ষ্যেই। এ নিবন্ধে ‘ভারতের নীলনকশা’ উপশিরোনামে এ বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে।
বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে মিডিয়া, সাংস্কৃতিক উইং-এর যে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে তার মধ্যে অন্যতম হলো: ‘ফ্যাসিবাদী শক্তির এই বয়ানের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বয়ান তৈরি করা। এতে ব্যর্থ হলে,ইতিহাসের গতি বদলানো যাবে না। এই দ্বিতীয় স্বাধীনতার মাধ্যমেই দেশ প্রকৃত স্বাধীনতা পেয়েছে, এর আগে স্বাধীনতার আমাদের আগ্রাসী ভারতের গোলামে পরিণত করেছিলো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করে ফ্যাসিবাদের শিকলে গোটা জাতিকে বন্দি করেছিলো। জাতিকে বিভক্তকারী ফ্যাসিবাদী বয়ানগুলো ধ্বংস করে জাতীয় ঐক্য সংহতি প্রতিষ্ঠার পক্ষের এমন নতুন নতুন বয়ান সৃষ্টি করতে হবে।
সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক এদেশের প্রত্যেক নাগরিক চায়। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার জন্য ভারত সরকারের কমিটি করার দরকার নেই। একথা এদেশের হিন্দু,মুসলিম,বৌদ্ধ খ্রিস্টান নাগরিকদের পক্ষ থেকে কঠোর ভাষায় ভারতকে জানাতে হবে। তাদের বলতে হবে ভারতের বাবরী মসজিদ ট্র্যাজেডির মতো কোন ঘটনা এদেশে ঘটেনি। গরু রক্ষার নামে বাংলাদেশে মানুষ হত্যা করা হয় না। অতএব তারা নিজ দেশের নাগরিকদের জীবন রক্ষার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করলেই বাংলাদেশের মানুষ খুশি। এদেশের কোন রাজনৈতিক নেতা কিংবা ধর্মীয় নেতা তাদের দেশের নেতাদের মতো ‘মসজিদে ঢুকে খুঁজে খুঁজে মুসলমানদের হত্যা করা হবে’ – এমন ঘোষণা দেন না। কোন প্রকার সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক বাক্য ব্যবহার না করে এ সত্য তুলে ধরতে হবে। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আদর্শের আলোকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য নিরাপদ এক সুন্দর দেশ গড়ার উপাদান সমৃদ্ধ ইতিবাচক গান,কবিতা, কথাসাহিত্য সৃষ্টি করে তা ছড়িয়ে দিতে হবে। ইতিবাচক সংবাদ,ফিচার বিশ্ববাসীর সামনে তুল ধরতে হবে। উল্লেখিত বিষয়গুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বিপ্লবোত্তর পরিস্থতিতে ভারত সরকারের নীতিনির্ধারকদের ফাঁস হওয়া ষড়যন্ত্র দেখলেই বোঝা যায়। তারা উল্লেখিত সফট পাওয়ারকে কতটা ভয় পাচ্ছে।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ এন্ড অ্যানালাইসিস সংক্ষেপে ’র’ এর সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নীলনকশা পর্যালোচনা করলে বিষয়টি খুব সহজে বুঝায় যায়। ভারত মনে করে তাদের সহযোগিতায় ১৯৭১ সালে দেশ জাতীয় হয়েছে এ চেতনা ধবংস করে সেই স্বাধীনতা অর্থবহ হয়নি, বরং তার মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারতের আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের শিকার হয়েছিলো। প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করেছে ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সফট পাওয়ারগুলো এই ধারনার শক্ত ভিত রচনা করতে পারলে আওয়ামী লীগের আবার রাজনীতিতে পুনর্বাসন শুধু কঠিনই হবে না, অসম্ভব হবে। তাই ভারত যেকোন মূল্যে তা প্রতহিত করতে চায়। তাই তারা মিডিয়াসন্ত্রাস ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আরো জোরদার করবে। বাংলাদেশে কথিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশের মোড়কে তাদের অর্থানুকূল্যে পরিচালিত মিডিয়া ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আরো সক্রিয় করবে। প্রয়োজনে নতুন নতুন নামে আরো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করবে।
ভারতের নীলনকশা
৩৬ জুলাইয়ের গণঅভ্যূত্থানকে ভারত মনে করে, একটি দার্শনিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি দিতে চাইলে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের একচ্ছত্র বয়ান ক্ষুণ্ন হবে। যা ঢাকায় ভারতের সফট পাওয়ারকে দুর্বল করে দেবে। এই গণঅভ্যূত্থানের চেতনাকে বৃহত্তর পরিসরে গ্রহণ করা হলে, ‘র’ এর দ্বিতীয় পরিকল্পনা ‘রিসেটেল আওয়ামী লীগ-২০২৫’-ও খুব কঠিন হয়ে যাবে। দিল্লিভিত্তিক একজন বাংলাদেশ গবেষক মনে করেন,হাসিনার অসাধারণ ক্ষমতা আছে কামব্যাক করার। তিনি ৮১-তে, ৯৬-তে কামব্যাক করেছেন। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে গিয়ে তিনি ২০০৯ সালে অপ্রতিরোধ্যভাবে ফিরে এসেছেন। তারা মনে করে, হাসিনা ফিরতে না পারলেও তিনি হয়ত দিল্লি থেকে দল পরিচালনা করবেন। কিন্তু তার দল ফিরতে পারবে। তবে সেখানে সংকট হবে গণঅভূত্থানের ইতিহাসকে জাতীয় ইতিহাস, সাহিত্যকর্মের অংশ করে একটি আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করলে। তাই ভারত ছাত্রদের বেশি সময় দিতে চায় না।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ভারতের এ ষড়যন্ত্রের কথা ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। জার্মানি থেকে প্রকাশিত ‘দ্য মিরর এশিয়া’ তাদের দিল্লি প্রতিনিধির উত্তম গুহ -এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে,‘১৬ জুলাই যখন হাসিনা সরকার শিক্ষার্থীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়, তখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সরকারের অনুকূলে চলে যায়। পরবর্তীতে শেখ হাসিনার বিশেষ অনুরোধ ও ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টার সরাসরি তদারকিতে বাংলাদেশে ‘র’ এর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৪০০ কর্মকর্তা ঢাকায় যান। তাদের ভাষায়, আন্দোলন কাশ্মীরি কায়দায় দমন করে তারা দিল্লি ফেরেন ২৮ জুলাই। কিন্তু পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ‘র’ ওয়াকিবহাল ছিল না। তাদের ভাষায়, তারা সিআইএ’র কৌশলের কাছে হেরে যান ৫ আগস্ট। যদিও ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দিল্লি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেওয়া নয়। ২ আগস্ট প্লান ‘সি’ এর অংশ হিসেবে এই পরিকল্পনা করে রাখে হাসিনা ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিদ ডোভাল। উল্লেখ্য, ভারত দক্ষিণ এশিয়াকে তার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অঞ্চল হিসেবে দেখে, ফলে এসব দেশের ব্যাপারে নিরাপত্তা উপদেষ্টার একটা হস্তক্ষেপ থাকে। ‘র’ ৫ আগস্টের পর ১০ আগস্ট সংখ্যালঘুদের সমাবেশের আড়ালে একটি প্রতিবিপ্লব করার পরিকল্পনা করে। তার জন্য বিপুল সংখ্যক ভারতীয় সাংবাদিকও সেদিন ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন। সেটি ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় ক্যু পরিকল্পনা করা হয় ১৫ আগস্ট। সেটিও ব্যর্থ হয়। … জানা গেছে, আপাতত দুটি প্রোজেক্ট দেওয়া হয়েছে। প্রথম প্রোজেক্ট ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর। এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য হলো ইউনূস সরকারের ওপর ভর করেছে শিবির, হেফাজত ও হিযবুত তাহরির- বামপন্থিদের মাধ্যমে এই বয়ান হাজির করানো। সেই সাথে হেফাজত ইসলামের একটি অংশ, যার সাথে ‘র’ এর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ, তাদের বোঝানো হচ্ছে ‘ড. ইউনূস সুদখোর, তিনি মার্কিন এজেন্ট, কোনভাবে একজন ভালো মুসলিম নন। বেশ কিছুদিন গেলে এই সরকার সমকামীদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে পারে’। এই গ্রুপকে জামায়াতের সাথে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ঐক্যে না যাওয়ার জন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে মিশন থেকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, আন্দোলনকারীদের সাথে হিযবুত তাহরীর সংশ্লিষ্টতা ও তাদের ভাবাদর্শ নিয়ে একটি ভয় তৈরি করার দিকে। দ্য মিরর এশিয়া জানতে পেরেছে, ইতিমধ্যে ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী’ তিনজন বামপন্থী সাবেক ছাত্রনেতার সাথে পশ্চিম বাংলায় দিল্লিতে কর্মরত একজন সাংবাদিক দীর্ঘক্ষণ আলাপ করেছেন। তাদের সাথে ভবিষ্যতে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এদিকে, বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যে ‘র’ এর মধ্যে একটি উপ-গ্রুপ করা হয়েছে ‘বাংলা মিশন’ সম্পন্ন করার জন্য। সম্প্রতি চিকেন নেক নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহর মন্তব্য ও সেভেন সিস্টার নিয়ে সমন্বয়কদের কারো কারো বক্তব্যকেও আমলে নিয়েছে বাংলাদেশ নিয়ে গঠিত গোয়েন্দা উপ-টিম ‘বাংলা মিশন’। তাদের প্রত্যেকের ফেসবুক স্ট্যাটাসকে হিন্দি ও ইংরেজিতে অনুবাদ করে ভিক্টর-২ এর টেবিলে দেওয়া হয়েছে। ভিক্টর-২ হলো ‘র’ এর একটি প্রোটোকল, যার কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কিত সর্বশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, আন্দোলনকারী সমন্বয়কদের নিয়ে ও তাদের আদর্শিক ধারণা নিয়ে দিল্লির দুটি ও আসামের একটি থিংক ট্যাংক গত ২০ দিন ধরে গবেষণা করেছে। তিনটি সংস্থার রিপোর্ট বলছে, সমন্বয়করা যে দল গঠন করতে যাবে তা হবে একটি ভারতবিরোধী রাজনৈতিক দল। বামপন্থি বৈপ্লবিক ধারণা তারা পোষণ করলেও তাদের সাথে ধর্মের বিরোধ থাকবে না। এই আদর্শের ফলে মূলত দেশের বামপন্থিদের রাজনৈতিক স্পেস একেবারে শূন্য হয়ে যাবে বলে মনে করছেন গবেষকরা। ফলে তারা বামদের সাথে তরুণদের একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হবে বলে ধারণা করছেন। সে চিন্তা থেকেই ‘র’ বামপন্থি ছাত্র নেতাদের সাথে যোগাযোগ করছে।’
তাই বর্তমান প্রজন্মের মনন গঠনে ভূমিকা রাখতে হলে কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের এ জেনারেশনের বৈশিষ্টগুলো জানতে হবে। ৫ আগস্টে নেতৃত্ব দেয়া জেনারেশনকে বলা হয়, তাদের বলা হচ্ছে ‘জেনারেশন জেড’ বা সংক্ষেপে ‘জেন-জি।
জেনারেশন জেড কারা এবং এদের বৈশিষ্ট্য কী
‘জেনারেশন জেড’ হলো নব্বইয়ের দশকের শেষ তিন বছর এবং দুই হাজার সাল থেকে ২০১২ পর্যন্ত যাদের জন্ম। ১৯৯৭-২০১২ সময়কালে জন্ম নেওয়া প্রত্যেকের বয়স এখন ১২ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে। এর আগের প্রজন্ম হলো মিলেনিয়াল জেনারেশন। তাদের সংক্ষিপ্ত নাম জেন-ওয়াই। আর তারও আগের প্রজন্মের নাম জেনারেশন এক্স। তাদের বৈশিষ্ট্য কেমন? মূলত এই প্রজন্ম হলো প্রকৃত ডিজিটাল প্রজন্ম। এর আগের প্রজন্ম ইন্টারনেটের উত্থান দেখলেও তারা ডিশ ক্যাবল সংযুক্ত টেলিভিশন দেখেছে, ল্যান্ডফোনও ব্যবহার করেছে। কিন্তু জেন-জি গোত্রের অধিকাংশই বড় হয়েছে একধরনের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সময়ের মধ্য দিয়ে। এই প্রজন্মের অনেকেই একেবারে ছোটবেলা থেকেই ফেসবুক ব্যবহার করছে, অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে সময় কাটাচ্ছে; কিন্তু এর আগের প্রজন্মের বেড়ে ওঠা এমন ছিল না। এখন জেন-জির অনেক সদস্যরাই স্মার্টফোন আসার আগের কোনো জীবনের কথা মনে করতে পারে না।
আরও একটি বিষয় হলো, জেন-জি সাধারণত শহর বা মহানগর এলাকার বড় হচ্ছে। এদের খুব সীমিত একটা অংশ বেড়ে উঠছে গ্রামাঞ্চলে। বিশ্বকোষ ব্রিটানিকা বলছে, জেন-জি এর সবচেয়ে বয়স্ক সদস্যরা বিয়ের ক্ষেত্রে দেরি করেছেন। এদের মাত্র ৪ শতাংশ ১৮ থেকে ২১ বছর বয়সের মধ্যে বিয়ে করছেন। এই হার তাদের আগের প্রজন্মের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
জেনারেশন জেডের সদস্যদের আগের প্রজন্মের চেয়ে বেশি বাস্তববাদী এবং অল্পবয়সে দ্রুত পরিপক্ব। এই প্রজন্মের মাঝে ক্যারিয়ার নির্ধারণে সতর্কতা, শিক্ষা বা ডিগ্রি অর্জনের হারও বেড়েছে। আবার এই প্রজন্মেরই অনেকের বাবা-মায়েরা উচ্চশিক্ষিত, যেটিও আগের তুলনায় বেশি। তবে জেন-জি’র সদস্যরা ক্যারিয়ার সচেতন হওয়ার একটি কারণ হিসেবে অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন,আগের প্রজন্মের মাঝে আর্থিক সমস্যা ও কর্মসংস্থানে অস্থিরতাসহ নানা সমস্যা দেখা। অনেকের বাবা-মা ছিলেন এক্স জেনারেশনের। তাদের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা দেখে থাকলে জেন-জি’রা শৈশবে একধরনের সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল। যেটি তাদের মধ্যে এখন অনেকবেশি সচেতনতা তৈরি হওয়ার কারণ। সবশেষে কোভিড মহামারীও এই প্রজন্মকে নতুন করে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের জেন-জি দেখে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসন: গুম,খুন, লুটপাট,অর্থ-পাচার এবং রাষ্ট্রপরিচালকদের দম্ভ ও মিথ্যাচার, ইতিহাস বিকৃতি। তাই তারা যেকোন কিছু গ্রহণ করার আগে ভালো করে দেখে তারপর বিশ্বাস করে। সত্য বলে কোন কিছু গ্রহণ করার পর যদি কখনো বুঝতে পারে তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। তাহলে তারা তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করে। এরপর কোন সত্য উপস্থাপন করলেও তাদের সন্দেহ থেকে যায়। জীবন দিয়ে হলেও সত্য প্রতিষ্ঠা করতে তারা পিছ পা হয় না। তাই কবি,সাহিত্যিক ও শিল্পীরা কোন কিছু উপস্থাপন করার আগে তাদের এ বৈশিষ্ট্যগুলোর ভুলে গেছে চলবে না। এদেশের একটি শ্রেণির পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী ব্যান্ডওয়াগন এফেক্ট -এ আক্রান্ত। তরুণরা চায় এদেশের মানুষ আওয়ামী লীগের সময় চিন্তার যে দাসত্ব বরণ করছে তারা তা থেকে মুক্তি পাক। সেই মুক্তি দিশা দিতে সফট পাওয়ারগুলোর কার্যকর ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে।
আওয়ামী ব্যান্ডওয়াগন এফেক্টের কুপ্রভাব দূর করতে হবে
“ব্যান্ডওয়াগন এফেক্ট” (ইধহফধিমড়হ ঊভভবপঃ) এ প্রক্রিয়ায় ফ্যাসিস্ট শাসকরা জনগণের চিন্তার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। তারা যা প্রচার করে তাই মানুষ বিশ্বাস করে বাধ্য হয়। আওয়ামী লীগও বিগত ১৫ বছরে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে এই অপকর্মটিই করছে। তারা শুধু আমাদের কথা বলার অধিকার, ভোটের অধিকার, নিরাপদে বাঁচার অধিকার, সাম্যের অধিকারই কেড়ে নিয়েছিলো না। তারা হরণ করেছিলো মানুষের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতাও। এ প্রসঙ্গে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত নিবন্ধে কাজী জেসিন বলেছেন,‘ফ্যাসীবাদের ভিত্তি মজবুত হয় সবসময় গণমাধ্যম এবং শিল্পীদের দ্বারা। বিগত পনেরো বছর আওয়ামী লীগের বর্ধিত মাধ্যম হিসেবে মূলত কাজ করেছে গণমাধ্যম ও শিল্পীসমাজের বৃহৎ অংশ। আমরা দেখেছি গণমাধ্যম পরিণত হয়েছে মাফিয়া মাধ্যমে। প্রতিবাদীরা সেখানে নানাভাবে পিষ্ট হয়েছেন। শিল্পীরা লিখে, গান গেয়ে, অভিনয় করে, সিনেমা, নানারকম মূর্তি বানিয়ে এই ফ্যাসিস্ট সরকারকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, কোনো জনগণ যখন পুঁজিবাদী দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজব্যবস্থার মধ্যে গা এলিয়ে আগে বাড়তে চায়, তখন জ্ঞানের চেয়ে আর্থিক সুবিধালাভে তার মনোযোগ বেশি থাকে। আর তাতে সুবিধা হয় যেকোনো ফ্যাসিস্ট বা মাফিয়া সরকারের। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই ঘটনা। সবার হাতে অর্থ তুলে দিয়ে, সবাইকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে সরকার তার ভিত্তি মজবুত করেছে। কিন্তু এটা সম্ভব হয়েছে কীভাবে? কীভাবে এদেশের বহু মানুষ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এরকম একটা মাফিয়া সরকারকে সহ্য করেছে? এর পেছনে আছে কয়েকটি কারণ। মূল যে কারণটি এড্রেস না করলেই নয়, তা হলো চিন্তায় করাপ্ট হওয়া। চিন্তার করাপশন মানুষের কীভাবে হয়? “ব্যান্ডওয়াগন এফেক্ট” (ইধহফধিমড়হ ঊভভবপঃ) বলে একটি ধারণার সূত্রপাত হয় ১৯ শতকের শেষের দিকে। থমাস নস্ট নামক একজন রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট এই ধারণাটি জনপ্রিয় করেন। তার কার্টুনে তিনি “ব্যান্ডওয়াগন”, একটি মিউজিক্যাল ওয়াগনকে প্রতিনিধিত্ব করতেন, যা রাজনৈতিক প্রচারণার সময় মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যবহৃত হতো। ধারণাটি ছিল যে মানুষ ‘ব্যান্ডওয়াগনে’ যোগ দেবে এবং একটি প্রার্থী বা উদ্দেশ্যকে সমর্থন করবে কেবলমাত্র কারণ এটি জনপ্রিয় এবং চলন্ত। সময়ের সঙ্গে, এই প্রক্রিয়া একটি ব্যাপক মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক প্রভাব বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, যেখানে মানুষ ট্রেন্ড বা আচরণ অনুসরণ করে কারণ তারা দেখে অন্যরা এটি করছে এবং প্রচারমাধ্যমও একাধারে প্রচার করতে থাকে তাই যা ক্ষমতাবানদের চিন্তাকে তুলে ধরে। এই ব্যান্ডওয়াগন তত্ত্বের কাছে পরাস্ত হয় মূলত যাদের জ্ঞানের অভাব থাকে। জ্ঞানের অভাব বলতে এখানে তাদের কথা বলছি যারা কোনো “বহুল প্রচারিত আদর্শ, বিশ্বাস বা সংস্কৃতি” যা মূলত ফ্যাসিস্টের প্রোপাগান্ডার অংশ, তা বিশ্বাস করার আগে নিজের বোধ ও বিবেচনা দিয়ে মোকাবিলা করার ক্ষমতা রাখেন না।’ “ব্যান্ডওয়াগন এফেক্ট” (ইধহফধিমড়হ ঊভভবপঃ) প্রক্রিয়ার কুপ্রভাব এ জন্য অনেকাংশেই দায়ী। তাই আওয়ামী লীগের “ব্যান্ডওয়াগন এফেক্ট”-এর কুপ্রভাব থেকে মুক্তি দিতে বিশ্বাসী ধারার মুক্ত ও উদার মনের কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী ও সাংবাদিকদের এগিয়ে আসতে হবে। ( মতামত লেখকের নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়) লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক।