ঢাকা ০২:৫০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo জগন্নাথপুরে বাঁশের সাঁকোর বদলে ব্রিজ নির্মাণের দাবি, কয়ছর আহমদ এমপির সহযোগিতা কামনা এলাকাবাসীর Logo গজারিয়ায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে র‌্যালি ও আলোচনা সভা Logo লালমোহনে এসএসসির বৃত্তির ফলাফলে হা-মীমের শিক্ষার্থীদের চমক Logo ক্যান্সার সচেতনতামূলক সংলাপ ও পথশিশুদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ Logo উপকুলের লবনাক্ত আবহাওয়া মাটিতে সাবেক ব্যাংকার জিয়াউদ্দিনের মাল্টা চাষে সফলতা Logo টঙ্গী পাইলট স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজে নতুন এডহক কমিটি, সভাপতি সরকার জাবেদ আহমেদ Logo শিবগঞ্জে ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভা Logo লোহাগাড়ায় ১০০ মিটারের মধ্যে ৯টি অবৈধ করাতকল গিলে খাচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল Logo চৌদ্দগ্রামে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার Logo জামালপুরে ৫ম উপজেলা কাব ক্যাম্পুরীর মহা তাবু জলসা ও সমাপনী

লক্ষ্মীপুরে বর্ণাঢ্য আয়োজনে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস উদযাপন

“সরকারি খরচে বিরোধ শেষ, সবার আগে বাংলাদেশ” এই প্রতিপাদ্যে লক্ষ্মীপুরে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০২৬ উদযাপিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে র‌্যালি, আলোচনা সভা ও লিগ্যাল এইড মেলার আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে বেলুন ও শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে দিবসের উদ্বোধন করা হয়। পরে একটি সুসজ্জিত র‌্যালি শহরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে সভাস্থলে এসে শেষ হয়। এসময় অতিথিবৃন্দ ফিতা কেটে লিগ্যাল এইড মেলার উদ্বোধন করে স্টলসমূহ পরিদর্শন করেন। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতে কাজ করছে। লিগ্যাল এইড কার্যক্রম সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি কার্যকর মাধ্যম। মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা চালুর ফলে মানুষ দ্রুত, সহজ ও বিনা খরচে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ পাচ্ছে। এতে আদালতের ওপর চাপ কমছে এবং সামাজিক সম্প্রীতিও বজায় থাকছে। তিনি আরও বলেন, লক্ষ্মীপুরে এই কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন হওয়ায় আমি সন্তোষ প্রকাশ করছি। এটি আরও বিস্তৃত করতে প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। র‌্যালি ও আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন লক্ষ্মীপুরের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিভিল জজ দিলরুবা ইয়াছমিন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা মোঃ ইসমাইল জবিউল্যাহ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইসমাইল জবিউল্যাহ বলেন, ন্যায়বিচার মানুষের মৌলিক অধিকার এবং এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকার প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে আইনি সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা পদ্ধতি চালুর ফলে শুধু সময় ও অর্থ সাশ্রয়ই হচ্ছে না, বরং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় থাকছে এবং বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির একটি কার্যকর পথ তৈরি হয়েছে। এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করতে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, লিগ্যাল এইডকে শক্তিশালী করতে হলে জনগণের সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এ সেবার কার্যক্রম পৌঁছে দিতে হবে। এতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা আরও সুদৃঢ় হবে। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক শাহাব উদ্দিন সাবু, শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আবদুল্যাহ আল মামুন, ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) সামছুল আরেফীন, অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রেজাউল হক, পুলিশ সুপার মোঃ আবু তারেক, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশ্রাফুন নাহার, সিভিল সার্জন আবু হাসান শাহীন, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউর রহমান চৌধুরী, আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোঃ মনিরুল ইসলাম হাওলাদার ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ রফিক উল্যাহ। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক শাহাব উদ্দিন সাবু বলেন, আইনি সহায়তা এখন আর বিত্তবানদের একচেটিয়া বিষয় নয়। রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। লিগ্যাল এইড ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের এ উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ে এটি আরও সফল হবে। শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আবদুল্যাহ আল মামুন বলেন, আইনগত সহায়তা কার্যক্রম সমাজে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক সামছুল আরেফীন বলেন, বিরোধ নিষ্পত্তিতে আদালতের বাইরে সমাধানই সবচেয়ে কার্যকর। এতে সময় ও ব্যয় কমে এবং সামাজিক সম্পর্ক অটুট থাকে। অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রেজাউল হক বলেন, মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রম আদালতের ওপর চাপ কমাবে এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে গতিশীল করবে। পুলিশ সুপার মোঃ আবু তারেক বলেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় অনেক বিরোধ আদালতে যাওয়ার আগেই নিষ্পত্তি হচ্ছে। এতে যেমন সামাজিক শান্তি বজায় থাকছে, তেমনি পুলিশি তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর চাপও কমছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কার্যক্রম আরও কার্যকর হচ্ছে। সভাপতির বক্তব্যে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন বলেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মানুষ বিনামূল্যে ও দ্রুত আইনি সহায়তা পাচ্ছে। মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যকর হওয়ায় আদালতে যাওয়ার আগেই অনেক বিরোধ নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে, যা বিচারপ্রার্থীদের জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক। এ কার্যক্রমের ফলে আদালতের মামলা-জট উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং বিচারব্যবস্থায় গতি আসবে। তিনি আরও বলেন, লক্ষ্মীপুরে চালু হওয়া বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক ফল দেখাচ্ছে। বিচারপ্রার্থীরা সহজে, দ্রুত এবং বিনা খরচে ন্যায়বিচার পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে এই কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং একটি মানবিক ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা গড়ে উঠবে। অনুষ্ঠানে জজশীপ ও সিজেএম আদালতের বিচারকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এ কে এম মাঈন উদ্দিন সিদ্দিকী, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী, ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের বিচারক (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) তাহরীনা আক্তার নওরীন, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাহ জামাল, সৈকত দাস, সিনিয়র সিভিল জজ বেলাল হোসেন, সিভিল জজ আবরাম সালাম, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আরিফ হোসাইন, তাসলিমা ইসলাম, সিভিল জজ উম্মেহানী ছাদিয়া। এছাড়াও জেলা জজশীপ ও সিজেএম আদালতের বিচারকবৃন্দ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি এড. হাফিজুর রহমান, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এড. হাছিবুর রহমান, জেলা জজ আদালতের পিপি আহাম্মদ ফেরদাউস মানিক, জিপি এড. হারুন অর রশিদ বেপারীসহ অন্যান্য আইনজীবী নেতৃবৃন্দ। এ ছাড়া সরকারি বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী, এনজিও কর্মী, মানবাধিকার কর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। সভায় লিগ্যাল এইডের সুফলভোগী মোঃ ইসমাইল হোসেন ও হাফেজ রহমত উল্যাহ বক্তব্য রাখেন। সুফলভোগী ইসমাইল লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে পাওনা টাকা উদ্ধার এবং হাফেজ রহমত উল্যাহ লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মিথ্যা মামলার দায় থেকে মুক্তি পাওয়ার বিষয়ে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।
সভায় লিগ্যাল এইডের দু’জন সুফলভোগীর মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন অনুষ্ঠানের সভাপতি সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন ও বিশেষ অতিথি লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক শাহাব উদ্দিন সাবু। লিগ্যাল এইডেরনপ্যানেল আইনজীবীদের মধ্যে এড. হাসান আল মাহমুদ, এড. জসিম উদ্দিন সুমন এবং এড. আফরোজা ববিকে সেরা লিগ্যাল আইনজীবীর পুরস্কার প্রদান করা হয়। আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত ব্যয় কমিয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে লক্ষ্মীপুরে মামলা-পূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ধারা ৫, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ধারা ৯৬, নন-এগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইন, ১৯৪৯-এর ধারা ২৪, পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর ধারা ৮ এবং যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩ ও ৪ অনুযায়ী বিভিন্ন বিরোধে মামলা দায়েরের আগে লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আপস-মীমাংসা ব্যর্থ হলে তবেই সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলা দায়ের করা যাবে। এতে আদালতের মামলা-জট কমার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ স্বল্প সময়ে ও বিনা খরচে ন্যায়বিচার পাচ্ছেন। প্রসঙ্গত, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর আওতায় প্রথমে ১২টি জেলায় পাইলট প্রকল্প চালু হয়। পরবর্তীতে লক্ষ্মীপুরসহ আরও ৮টি জেলায় এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে লক্ষ্মীপুরে কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর অল্প সময়েই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়ন লক্ষ্মীপুরে বিচারপ্রক্রিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করেছে, যা সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে আরও সহজ ও গতিশীল করে তুলবে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

জগন্নাথপুরে বাঁশের সাঁকোর বদলে ব্রিজ নির্মাণের দাবি, কয়ছর আহমদ এমপির সহযোগিতা কামনা এলাকাবাসীর

লক্ষ্মীপুরে বর্ণাঢ্য আয়োজনে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস উদযাপন

আপডেট সময় ০৯:১৫:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

“সরকারি খরচে বিরোধ শেষ, সবার আগে বাংলাদেশ” এই প্রতিপাদ্যে লক্ষ্মীপুরে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০২৬ উদযাপিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে র‌্যালি, আলোচনা সভা ও লিগ্যাল এইড মেলার আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে বেলুন ও শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে দিবসের উদ্বোধন করা হয়। পরে একটি সুসজ্জিত র‌্যালি শহরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে সভাস্থলে এসে শেষ হয়। এসময় অতিথিবৃন্দ ফিতা কেটে লিগ্যাল এইড মেলার উদ্বোধন করে স্টলসমূহ পরিদর্শন করেন। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতে কাজ করছে। লিগ্যাল এইড কার্যক্রম সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি কার্যকর মাধ্যম। মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা চালুর ফলে মানুষ দ্রুত, সহজ ও বিনা খরচে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ পাচ্ছে। এতে আদালতের ওপর চাপ কমছে এবং সামাজিক সম্প্রীতিও বজায় থাকছে। তিনি আরও বলেন, লক্ষ্মীপুরে এই কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন হওয়ায় আমি সন্তোষ প্রকাশ করছি। এটি আরও বিস্তৃত করতে প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। র‌্যালি ও আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন লক্ষ্মীপুরের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিভিল জজ দিলরুবা ইয়াছমিন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা মোঃ ইসমাইল জবিউল্যাহ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইসমাইল জবিউল্যাহ বলেন, ন্যায়বিচার মানুষের মৌলিক অধিকার এবং এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকার প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে আইনি সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা পদ্ধতি চালুর ফলে শুধু সময় ও অর্থ সাশ্রয়ই হচ্ছে না, বরং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় থাকছে এবং বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির একটি কার্যকর পথ তৈরি হয়েছে। এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করতে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, লিগ্যাল এইডকে শক্তিশালী করতে হলে জনগণের সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এ সেবার কার্যক্রম পৌঁছে দিতে হবে। এতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা আরও সুদৃঢ় হবে। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক শাহাব উদ্দিন সাবু, শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আবদুল্যাহ আল মামুন, ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) সামছুল আরেফীন, অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রেজাউল হক, পুলিশ সুপার মোঃ আবু তারেক, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশ্রাফুন নাহার, সিভিল সার্জন আবু হাসান শাহীন, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউর রহমান চৌধুরী, আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোঃ মনিরুল ইসলাম হাওলাদার ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ রফিক উল্যাহ। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক শাহাব উদ্দিন সাবু বলেন, আইনি সহায়তা এখন আর বিত্তবানদের একচেটিয়া বিষয় নয়। রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। লিগ্যাল এইড ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের এ উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ে এটি আরও সফল হবে। শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আবদুল্যাহ আল মামুন বলেন, আইনগত সহায়তা কার্যক্রম সমাজে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক সামছুল আরেফীন বলেন, বিরোধ নিষ্পত্তিতে আদালতের বাইরে সমাধানই সবচেয়ে কার্যকর। এতে সময় ও ব্যয় কমে এবং সামাজিক সম্পর্ক অটুট থাকে। অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রেজাউল হক বলেন, মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রম আদালতের ওপর চাপ কমাবে এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে গতিশীল করবে। পুলিশ সুপার মোঃ আবু তারেক বলেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় অনেক বিরোধ আদালতে যাওয়ার আগেই নিষ্পত্তি হচ্ছে। এতে যেমন সামাজিক শান্তি বজায় থাকছে, তেমনি পুলিশি তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর চাপও কমছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কার্যক্রম আরও কার্যকর হচ্ছে। সভাপতির বক্তব্যে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন বলেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মানুষ বিনামূল্যে ও দ্রুত আইনি সহায়তা পাচ্ছে। মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যকর হওয়ায় আদালতে যাওয়ার আগেই অনেক বিরোধ নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে, যা বিচারপ্রার্থীদের জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক। এ কার্যক্রমের ফলে আদালতের মামলা-জট উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং বিচারব্যবস্থায় গতি আসবে। তিনি আরও বলেন, লক্ষ্মীপুরে চালু হওয়া বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক ফল দেখাচ্ছে। বিচারপ্রার্থীরা সহজে, দ্রুত এবং বিনা খরচে ন্যায়বিচার পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে এই কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং একটি মানবিক ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা গড়ে উঠবে। অনুষ্ঠানে জজশীপ ও সিজেএম আদালতের বিচারকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এ কে এম মাঈন উদ্দিন সিদ্দিকী, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী, ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের বিচারক (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) তাহরীনা আক্তার নওরীন, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাহ জামাল, সৈকত দাস, সিনিয়র সিভিল জজ বেলাল হোসেন, সিভিল জজ আবরাম সালাম, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আরিফ হোসাইন, তাসলিমা ইসলাম, সিভিল জজ উম্মেহানী ছাদিয়া। এছাড়াও জেলা জজশীপ ও সিজেএম আদালতের বিচারকবৃন্দ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি এড. হাফিজুর রহমান, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এড. হাছিবুর রহমান, জেলা জজ আদালতের পিপি আহাম্মদ ফেরদাউস মানিক, জিপি এড. হারুন অর রশিদ বেপারীসহ অন্যান্য আইনজীবী নেতৃবৃন্দ। এ ছাড়া সরকারি বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী, এনজিও কর্মী, মানবাধিকার কর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। সভায় লিগ্যাল এইডের সুফলভোগী মোঃ ইসমাইল হোসেন ও হাফেজ রহমত উল্যাহ বক্তব্য রাখেন। সুফলভোগী ইসমাইল লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে পাওনা টাকা উদ্ধার এবং হাফেজ রহমত উল্যাহ লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মিথ্যা মামলার দায় থেকে মুক্তি পাওয়ার বিষয়ে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।
সভায় লিগ্যাল এইডের দু’জন সুফলভোগীর মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন অনুষ্ঠানের সভাপতি সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন ও বিশেষ অতিথি লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক শাহাব উদ্দিন সাবু। লিগ্যাল এইডেরনপ্যানেল আইনজীবীদের মধ্যে এড. হাসান আল মাহমুদ, এড. জসিম উদ্দিন সুমন এবং এড. আফরোজা ববিকে সেরা লিগ্যাল আইনজীবীর পুরস্কার প্রদান করা হয়। আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত ব্যয় কমিয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে লক্ষ্মীপুরে মামলা-পূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ধারা ৫, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ধারা ৯৬, নন-এগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইন, ১৯৪৯-এর ধারা ২৪, পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর ধারা ৮ এবং যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩ ও ৪ অনুযায়ী বিভিন্ন বিরোধে মামলা দায়েরের আগে লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আপস-মীমাংসা ব্যর্থ হলে তবেই সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলা দায়ের করা যাবে। এতে আদালতের মামলা-জট কমার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ স্বল্প সময়ে ও বিনা খরচে ন্যায়বিচার পাচ্ছেন। প্রসঙ্গত, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর আওতায় প্রথমে ১২টি জেলায় পাইলট প্রকল্প চালু হয়। পরবর্তীতে লক্ষ্মীপুরসহ আরও ৮টি জেলায় এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে লক্ষ্মীপুরে কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর অল্প সময়েই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়ন লক্ষ্মীপুরে বিচারপ্রক্রিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করেছে, যা সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে আরও সহজ ও গতিশীল করে তুলবে।