ঢাকা ০২:০৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo পুঁজিবাজার প্রাতিষ্ঠানিক ও পুরোপুরি কাগজবিহীন করার আহ্বান অর্থমন্ত্রীর Logo ভিন্নমত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের শক্তি : মাহদী আমিন Logo রাজনৈতিক পরিচয়ে কারো প্রতি বৈষম্য হবে না : ৪৯তম বিসিএস প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo শাপলা এখন শরীয়তপুরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবিকায়নের অংশ Logo বিনিয়োগ, এলএনজি সরবরাহ ও দক্ষতা উন্নয়নে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান রাষ্ট্রপতির Logo সরকার সর্বশক্তি দিয়ে দেশে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে: প্রধানমন্ত্রী Logo দল ছেড়ে ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞার শঙ্কায় রোনালদো Logo কতদিন পরপর ফোন বদলাবেন? Logo মিষ্টি ভালো লাগলেও কম খাবেন যারা Logo ‘দুনিয়াদারি হোক যাই ভেতরে রবের জিকির চাই’, মিশা সওদাগর

শ্রম বিক্রির হাটে টিকে থাকার সংগ্রাম

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় জীবিকার কঠিন সংগ্রাম। কাজের সন্ধানে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন হাজার হাজার কৃষি শ্রমিক। স্থানীয়দের মতে, এ অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশ প্রতিদিন কাজের খোঁজে শহরমুখী হন। শ্রমিকদের এ সমাগমকে অনেকে বলেন ‘শ্রম বিক্রির হাট’। রংপুর শহরের শিমুলবাগ, জামতলা মোড়, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, বেতপট্টি, রেলস্টেশন ও গঙ্গাচড়া স্টার হোটেলের সামনে সকাল থেকেই জড়ো হন তারা। প্রত্যেকের সঙ্গে থাকে কাজের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কাস্তে, কোদাল, শাবল, দা কিংবা ডালি। এখানে শ্রম বিক্রি হয় না শরীর দিয়ে, বরং বিক্রি হয় তাদের শ্রম, সময় এবং কঠোর পরিশ্রম। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে বসে থাকেন শ্রমিকরা?-কেউ এসে কাজের জন্য ডেকে নেবে, এই আশায়। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮ টার দিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পূর্ব গেটে ১০ জনের একটি শ্রমিক দলের সঙ্গে কথা হয়। প্রত্যেকের সাইকেলের পেছনে বাঁধা কাস্তে, কোদাল, শাবলসহ নানা সরঞ্জাম যেন তারা প্রস্তুত, শুধু একজন ক্রেতার অপেক্ষায়। লক্ষ্মীটারী গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, ভোরে বের হই, সারাদিন বসে থাকি। কেউ ডাকলে কাজ পাই, না হলে কোনো আয় থাকে না। কোলকোন্দ ইউনিয়নের চিলাখাল চরের নওশা আলী ও আব্দুল হাকিম বলেন, এই হাটে বসে থাকি শুধু কাজের আশায়। যারা ডাকে, তাদের কাছে দিনভিত্তিক নিজেদের শ্রম বিক্রি করি। কাজ না থাকলে সারাদিন অপেক্ষা করেও কিছুই জোটে না। গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের নবনীদাস গ্রামের আফসার আলী বলেন, রংপুর শহরে বিভিন্ন এলাকায় নিজের শ্রম বিক্রি করি। কোনদিন কাজ পাই, কোনদিন কাজ পাই না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে এই শ্রমজীবী মানুষদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও তাদের মজুরি বাড়েনি সেই অনুপাতে। ফলে দিন শেষে আয়ের চেয়ে ব্যয়ের চাপই বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গান্নারপাড় এলাকার দুলু মিয়া ও মোখলেস ইসলাম জানান, দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পাই, সেটাও নিয়মিত না। অনেক দিন কোনো কাজই থাকে না। এখন কাজের চেয়ে মানুষ বেশি তাই আমরা যেন হাটে বসে থাকা পণ্যের মতো হয়ে গেছি। তাদের ভাষায়, এই শ্রমবাজারে প্রতিদিন এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা চলে ,কে আগে কাজ পাবে। কেউ দলবেঁধে চুক্তিতে যায়, কেউ একাই দিনমজুর হিসেবে কাজ নেয়। কিন্তু সবার অবস্থাই অনিশ্চিত। তিস্তার বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না পারা এবং গ্রামে কাজের অভাব তাদের শহরমুখী হতে বাধ্য করেছে। অনেকেই আবার কাজের খোঁজে পরিবার ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যাচ্ছেন। আউলিয়ার হাট, বিনবিনা, জয়রামওঝা, শংকরদহ চরে গিয়ে দেখা যায়, বহু পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাড়িতে নেই। কেউ গেছেন বগুড়া, কেউ কুমিল্লা, ফেনী, সিলেট কিংবা ঢাকায় শুধু কিছু আয়ের আশায়। ফেনীতে থাকা এক শ্রমিকের স্ত্রী আকলিমা বেগম বলেন, এলাকায় কাজ নেই বলেই ওদের বাইরে যেতে হয়। না গেলে সংসার চালানোই কঠিন। স্থানীয় ইউপি সদস্য দুলাল মিয়া জানান, এই চরে প্রায় ৬০০ পরিবার রয়েছে। অন্তত ৮০০ মানুষ শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এর মধ্যে প্রায় ৪০০ জন ইতোমধ্যে অন্য জেলায় কাজের জন্য গেছেন। বাকিরা প্রতিদিন শহরে গিয়ে কাজ খোঁজেন। এই ‘শ্রম বিক্রি হাট’ আসলে কোনো আনুষ্ঠানিক বাজার নয়, এটি দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার নির্মম প্রতিচ্ছবি। এখানে মানুষ বিক্রি হয় না, বিক্রি হয় তাদের শ্রম, সময় আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

পুঁজিবাজার প্রাতিষ্ঠানিক ও পুরোপুরি কাগজবিহীন করার আহ্বান অর্থমন্ত্রীর

শ্রম বিক্রির হাটে টিকে থাকার সংগ্রাম

আপডেট সময় ০৪:১৩:৩৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় জীবিকার কঠিন সংগ্রাম। কাজের সন্ধানে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন হাজার হাজার কৃষি শ্রমিক। স্থানীয়দের মতে, এ অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশ প্রতিদিন কাজের খোঁজে শহরমুখী হন। শ্রমিকদের এ সমাগমকে অনেকে বলেন ‘শ্রম বিক্রির হাট’। রংপুর শহরের শিমুলবাগ, জামতলা মোড়, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, বেতপট্টি, রেলস্টেশন ও গঙ্গাচড়া স্টার হোটেলের সামনে সকাল থেকেই জড়ো হন তারা। প্রত্যেকের সঙ্গে থাকে কাজের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কাস্তে, কোদাল, শাবল, দা কিংবা ডালি। এখানে শ্রম বিক্রি হয় না শরীর দিয়ে, বরং বিক্রি হয় তাদের শ্রম, সময় এবং কঠোর পরিশ্রম। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে বসে থাকেন শ্রমিকরা?-কেউ এসে কাজের জন্য ডেকে নেবে, এই আশায়। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮ টার দিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পূর্ব গেটে ১০ জনের একটি শ্রমিক দলের সঙ্গে কথা হয়। প্রত্যেকের সাইকেলের পেছনে বাঁধা কাস্তে, কোদাল, শাবলসহ নানা সরঞ্জাম যেন তারা প্রস্তুত, শুধু একজন ক্রেতার অপেক্ষায়। লক্ষ্মীটারী গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, ভোরে বের হই, সারাদিন বসে থাকি। কেউ ডাকলে কাজ পাই, না হলে কোনো আয় থাকে না। কোলকোন্দ ইউনিয়নের চিলাখাল চরের নওশা আলী ও আব্দুল হাকিম বলেন, এই হাটে বসে থাকি শুধু কাজের আশায়। যারা ডাকে, তাদের কাছে দিনভিত্তিক নিজেদের শ্রম বিক্রি করি। কাজ না থাকলে সারাদিন অপেক্ষা করেও কিছুই জোটে না। গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের নবনীদাস গ্রামের আফসার আলী বলেন, রংপুর শহরে বিভিন্ন এলাকায় নিজের শ্রম বিক্রি করি। কোনদিন কাজ পাই, কোনদিন কাজ পাই না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে এই শ্রমজীবী মানুষদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও তাদের মজুরি বাড়েনি সেই অনুপাতে। ফলে দিন শেষে আয়ের চেয়ে ব্যয়ের চাপই বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গান্নারপাড় এলাকার দুলু মিয়া ও মোখলেস ইসলাম জানান, দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পাই, সেটাও নিয়মিত না। অনেক দিন কোনো কাজই থাকে না। এখন কাজের চেয়ে মানুষ বেশি তাই আমরা যেন হাটে বসে থাকা পণ্যের মতো হয়ে গেছি। তাদের ভাষায়, এই শ্রমবাজারে প্রতিদিন এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা চলে ,কে আগে কাজ পাবে। কেউ দলবেঁধে চুক্তিতে যায়, কেউ একাই দিনমজুর হিসেবে কাজ নেয়। কিন্তু সবার অবস্থাই অনিশ্চিত। তিস্তার বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না পারা এবং গ্রামে কাজের অভাব তাদের শহরমুখী হতে বাধ্য করেছে। অনেকেই আবার কাজের খোঁজে পরিবার ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যাচ্ছেন। আউলিয়ার হাট, বিনবিনা, জয়রামওঝা, শংকরদহ চরে গিয়ে দেখা যায়, বহু পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাড়িতে নেই। কেউ গেছেন বগুড়া, কেউ কুমিল্লা, ফেনী, সিলেট কিংবা ঢাকায় শুধু কিছু আয়ের আশায়। ফেনীতে থাকা এক শ্রমিকের স্ত্রী আকলিমা বেগম বলেন, এলাকায় কাজ নেই বলেই ওদের বাইরে যেতে হয়। না গেলে সংসার চালানোই কঠিন। স্থানীয় ইউপি সদস্য দুলাল মিয়া জানান, এই চরে প্রায় ৬০০ পরিবার রয়েছে। অন্তত ৮০০ মানুষ শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এর মধ্যে প্রায় ৪০০ জন ইতোমধ্যে অন্য জেলায় কাজের জন্য গেছেন। বাকিরা প্রতিদিন শহরে গিয়ে কাজ খোঁজেন। এই ‘শ্রম বিক্রি হাট’ আসলে কোনো আনুষ্ঠানিক বাজার নয়, এটি দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার নির্মম প্রতিচ্ছবি। এখানে মানুষ বিক্রি হয় না, বিক্রি হয় তাদের শ্রম, সময় আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।