নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার নড়াগাতি থানার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক রাণী রাশমণি এস্টেটের কাচারিবাড়ি সোমবার (১১ মে) পরিদর্শন করেছেন কালিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ জিন্নাতুল ইসলাম এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) শ্রাবণী বিশ্বাস। প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত করার লক্ষ্যে এবং রাণী রাসমণির স্মৃতি বিজড়িত জমিদারি সংস্কৃতি ও প্রাচীন স্থাপত্য সংরক্ষণ করে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে তারা প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই করেন। পরিদর্শনকালে কর্মকর্তারা কাচারিবাড়ির স্থাপত্যশৈলী, বর্তমান অবস্থা এবং সংরক্ষণের বিভিন্ন দিক ঘুরে দেখেন। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পত্রিকায় ধারাবাহিক লেখালেখি ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবির পর প্রশাসনের এমন উদ্যোগে এলাকাবাসীর মাঝে আশার সঞ্চার হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি দেশের অন্যতম দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। বাংলার ইতিহাস, জমিদারি সংস্কৃতি ও প্রাচীন স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নড়াগাতির ঐতিহাসিক রাণী রাশমণি এস্টেটের কাচারিবাড়ি। সময়ের অবহেলা, অযতœ ও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের মুখে পড়লেও ইতিহাসপ্রেমী মানুষের কাছে এটি এখনও এক বিস্ময়ের নাম। সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগে সংরক্ষণ ও সংস্কার করা হলে এ প্রাচীন স্থাপনাটি দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার নড়াগাতি থানার অন্তর্গত জয়ানগর ইউনিয়নের নড়াগাতি গ্রামে অবস্থিত এ প্রাচীন কাচারিবাড়িটি। কালিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার পূর্বদিকে নড়াগাতি বাজার সংলগ্ন নড়াগাতি-বাঐসোনা পাকা সড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি বহু বছর ধরে স্থানীয়দের কৌতূহল ও ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে রয়েছে। ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে কলকাতার প্রখ্যাত জমিদার ও সমাজসেবক তৎকালীন মকিমপুর পরগণার (বর্তমান রাধানগর) জমিদার ছিলেন। জনশ্রুতি রয়েছে, তার জমিদারি বিস্তৃত হয়েছিল কালিয়ার নড়াগাতি অঞ্চল পর্যন্ত। সেই সূত্র ধরেই নড়াগাতিতে প্রতিষ্ঠিত হয় রাণী রাশমণি এস্টেটের এই কাচারিবাড়ি, যা স্থানীয় মানুষের কাছে আজও “রাণী রাশমণির কাচারি” নামে পরিচিত। অনেকে আবার এটিকে “অমৃতনগর জমিদারির কাচারি” বলেও উল্লেখ করে থাকেন। প্রাচীন এ স্থাপনার মাঝখানে রয়েছে একতলা বিশিষ্ট একটি ভবন, যা মূল কাচারি ঘর হিসেবে পরিচিত। ভবনের পূর্ব পাশে প্রায় সাড়ে ছয় মিটার দূরে অবস্থিত একটি প্রাচীন কালী মন্দির। দক্ষিণ পাশে রয়েছে ধ্বংসাবশেষের একটি বড় ঢিবি এবং উত্তর-পূর্ব পাশে রয়েছে একটি প্রাচীন পুকুর, যা পুরো এলাকাকে আরও ঐতিহাসিক আবহ এনে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দক্ষিণাংশে অবস্থিত প্রায় ৪৫০ বর্গমিটার আয়তনের ধ্বংসস্তূপটি একসময় নীলকরদের নীল প্রক্রিয়াজাতকরণের স্থান বা নীল জাগের হাউজ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখনও সেখানে প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার পুরু দেয়ালের কিছু অংশ দৃশ্যমান রয়েছে, যা প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন বহন করছে। ঢিবিটি পার্শ্ববর্তী ভূমি থেকে প্রায় এক মিটার উঁচু হওয়ায় এটি আরও দৃষ্টিনন্দন ও রহস্যময় হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতœতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শন।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে রাণী রাশমণি এস্টেটের কাচারিবাড়িকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করা হোক। পাশাপাশি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুললে নড়াইলের ইতিহাস ও সংস্কৃতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ স্থাপনাটি সংরক্ষণ করা গেলে শুধু ইতিহাস রক্ষাই নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন শিল্পেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকরা ছুটে আসবেন এই ঐতিহাসিক কাচারিবাড়ি দেখতে। ফলে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি নড়াইল জেলার ঐতিহ্যও নতুনভাবে দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করবে।
বাংলার অতীত ঐতিহ্য ও জমিদারি সংস্কৃতির স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রাণী রাশমণি এস্টেটের কাচারিবাড়ি আজ যেন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অপেক্ষায়। যথাযথ উদ্যোগ নিলে এটি হতে পারে নড়াইলের ইতিহাসভিত্তিক পর্যটনের এক অনন্য কেন্দ্র।
সংবাদ শিরোনাম
সংরক্ষণ হতে যাচ্ছে কালিয়া উপজেলারঐতিহাসিক রানী রাসমণি স্টেটের কাচারি বাড়ি
-
গোলাম মোর্শেদ শেখ (কালিয়া) নড়াইল - আপডেট সময় ০১:২৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
- 194
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ























