বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে পারস্পরিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে প্রতিরক্ষা, এভিয়েশন, আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) এবং চিকিৎসা খাতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। গতকাল শুক্রবার (৫ জুন) রাজধানীর একটা হোটেলে বন্ধুপ্রতিম দুই দেশের প্রতিনিধিরা বৈঠকে বসেন। পরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন খলিলুর রহমান এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। বৈঠক শেষে এক ব্রিফিংয়ে খলিলুর রহমান এসব কথা বলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে স্ট্র্যাটিজিক বন্ধুত্ব বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। তুরস্কের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে চায় বাংলাদেশ। আপাতত অন্তর্বর্তী চুক্তি করা যায় কিনা তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
এদিকে একই ভেন্যুতে ঢাকা-আঙ্কারা সাংস্কৃতিক বিনিময় সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। এরআগে, গত এপ্রিলে হাকান ফিদানের আমন্ত্রণে তুরস্ক সফর করেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। শুক্রবার (৫ জুন) সকালে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বন্ধু দুদেশের প্রতিনিধিরা বৈঠকে বসেন। পরে, দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন খলিলুর রহমান এবং হাকান ফিদান। এখানেই সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়।
বাসস সূত্রে প্রকাশ,বাংলাদেশ ও তুরস্ক আজ কৌশলগত সহযোগিতা গভীরতর করতে, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারণ করতে এবং একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়েছে, কারণ উভয় দেশই তাদের দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে একটি নতুন কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করতে চায়।
নগরীর একটি হোটেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই অঙ্গীকারগুলো করা হয়। ড. রহমান এখানে তার তুর্কি প্রতিপক্ষের সাথে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা জোর দিয়েছি যে এই সফরটি বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং এটি সহযোগিতা গভীরতর করতে ও দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্বকে কৌশলগত পর্যায়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য উভয় দেশের যৌথ অঙ্গীকারের প্রমাণ।”
সফররত তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে ড. রহমান বলেন, দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্বের প্রতিফলন ঘটিয়ে বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার চেতনায় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করে ড. খলিলুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন আমাদের সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই দর্শন দ্বারা পরিচালিত। এই নীতি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণ রক্ষায় আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। একই সাথে, এটি আমাদের এই বিশ্বাসকেও প্রতিফলিত করে যে, আমাদের সীমান্তের বাইরে বন্ধু ও অংশীদার রয়েছে, প্রভু নয়।”
উভয় পক্ষ একমত হয়েছে যে, এই সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক এবং এটি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও আঞ্চলিক বিষয়ে সহযোগিতার নতুন সুযোগ উন্মোচন করেছে। আলোচনার একটি প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ।
ডঃ রহমান বলেন, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও বাড়াতে বাংলাদেশ ও তুরস্ক একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উভয় দেশ এখন বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমান প্রায় ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে কাজ করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তুর্কি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ এবং দেশটির অর্থনৈতিক ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য আমন্ত্রণ জানান।
তিনি বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত তুর্কি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন এবং বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্প অংশীদারিত্বে তুর্কি সহযোগিতা ও সমন্বয় সংস্থা (টিআইকেএ)-এর সম্পৃক্ততা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
ডঃ খলিলুর রহমানের মতে, বাংলাদেশ তুর্কি বিনিয়োগের জন্য বেশ কয়েকটি সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে বস্ত্র ও পোশাক, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ শিল্প, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং স্মার্ট প্রযুক্তি।
তিনি তুরস্কের সহযোগিতায় ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল ও নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন এবং তুরস্কে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সুযোগ বৃদ্ধির অনুরোধ করেন।
বর্তমানে তুরস্কে প্রায় ৩,০০০ বাংলাদেশী বসবাস করছেন, যাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। এই বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি পর্যটন, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত ভ্রমণ সহজ করার জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বান জানান।
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকারসহ মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র কার্যকর সমাধান।
রোহিঙ্গা জনগণের জন্য তুরস্কের অব্যাহত মানবিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সমর্থনের জন্য তিনি ধন্যবাদ জানান এবং বলেন যে, সফররত তুর্কি প্রতিনিধিদল পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি জ্ঞান অর্জনের জন্য দিনের পরবর্তী সময়ে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলো পরিদর্শন করবে।
ড. খলিলুর রহমান আস্থা প্রকাশ করেছেন যে, হাকান ফিদানের এই সফর দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা, সমন্বয় ও পারস্পরিক বোঝাপড়াকে আরও গভীর করবে এবং বিভিন্ন খাতে অংশীদারিত্বের নতুন সুযোগ উন্মোচনে সহায়তা করবে।
তিনি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর জন্য এবং নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিস একিনজিকে পাঠানোর জন্য তুরস্কের প্রতি বাংলাদেশের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বে বাংলাদেশের সফল প্রার্থিতাকে সমর্থন করার জন্য তুরস্ক সরকার এবং ব্যক্তিগতভাবে হাকান ফিদানকেও ধন্যবাদ জানান।
সংবাদ শিরোনাম
কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও তুরস্ক
প্রতিরক্ষা ও এভিয়েশনে একসঙ্গে কাজ করবে ঢাকা-আঙ্কারা: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
-
খবরপত্র প্রতিবেদক: - আপডেট সময় ০৯:৫৮:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
- 124
রাজধানীর একটি হোটেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: সংগৃহীত
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ





















