লক্ষ্মীপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয় দিন দিন শিক্ষার্থী কমছে রয়েছে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের সংকট, এতে করে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা বাড়ছে অভিভাবকদের মাঝে। বিগত এক বছরে শিক্ষার্থী কমেছে ১৩ হাজার ৩৩ জন। জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৭৩২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। গত চার বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ২৫ হাজার। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী এক লাখ ২৩ হাজার ৯৭ জন। যা ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী ছিল এক লাখ ৩৬ হাজার ১৩০ জন। এক বছরে শিক্ষার্থী কমেছে ১৩ হাজার ৩৩ জন। ২৪ সালে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিলো এক লাখ ৩৮ হাজার ৯৬ জন, ২৫ সালে এসে কমেছে এক হাজার ৯৬৬জন।আর ২৪ সালে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ১১হাজার শিক্ষার্থী। এভাবে দিন দিন শিক্ষার্থী কমতে থাকলে সাধারণ মানুষের সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা তৈরি হবে। শিক্ষাবিদরা মনে করছেন শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার মূল কারণগুলো হচ্ছে, শিক্ষকদের পাঠদানে অবহেলা করা, আন্তরিকতার অভাব, ক্লাসে আসা যাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম নীতি না মানা, শিক্ষার্থীদের দিয়ে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কাজ করানো, শিক্ষার্থীদের যথাযথ যতœ না নেওয়া। এছাড়াও দিন দিন বিভিন্ন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অভিভাবকদের গাফিলতি, সাধারণ মানুষ মাদ্রাসা শিক্ষায় আগ্রহী হওয়া। তথ্যমতে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া শিক্ষার্থীরা পড়ছেন কিন্ডারগার্টেন স্কুলে। বাড়তি যতেœর কারণে অভিভাবকরা বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনের দিকে ঝুঁকছেন। তবে সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী বাড়াতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও কোনো সুফল পাচ্ছে না। শিক্ষার্থী সংকটের পাশাপাশি চরম আকার ধারণ করেছে শিক্ষক সংকট। ২৫৮টি বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক। এ ছাড়া সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য রয়েছে অনেক । সদর উপজেলায় ১০৯ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও ৭০টিতে সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য। রায়পুর ১৬টিতে প্রধান শিক্ষক ও ২৫টিতে সহকারী শিক্ষক। রামগঞ্জে ৭৪টিতে প্রধান শিক্ষক ও ৩৩ জন সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য। কমলনগরে ১৬টিতে প্রধান শিক্ষক ও ৯ জন সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য। রামগতিতে ৪৩টি প্রধান শিক্ষক ও ২৩ জন সহকারী শিক্ষকের পদ খালি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজ এবং পাঠদান করা হচ্ছে। অভিভাবকরা বলছেন, বর্তমানে সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় শিক্ষকদের অনেকেই দায়িত্বে গাফিলতি করছেন। শিক্ষকদের অদক্ষতা আর পাঠদানে আগ্রহও কম থাকায় বিদ্যালয়গুলোর এমন দশা। ফলে অভিভাবকরা সন্তানদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে ফেলতে চান না। সরেজমিনে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, যে শিক্ষার্থী কাগজে কলমে রয়েছে, বাস্তবে তা আরও কম। নিয়মিত স্কুলে আসছেন তার অর্ধেক শিক্ষার্থী। যেসব বিদ্যালয়ে কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ১০০-এর বেশি দেখানো হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানে বাস্তবে তার অর্ধেক পাওয়া গেছে। আবার কোনো কোনো বিদ্যালয়ে ৫০-এর বেশি শিক্ষার্থী ভর্তির তথ্য থাকলেও উপস্থিত ছিল মাত্র ৩০-৩৫ জন। অর্থাৎ বিদ্যালয়গুলো টিকিয়ে রাখতে দ্বিগুণ ভর্তি দেখানো হয়েছে। আবার এসব শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি সুবিধা পাওয়া অনেকেই পড়ছেন কিন্ডারগার্টেন স্কুলে। তবে এসব সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন শিক্ষার্থী সংকট দেখা দিলেও জমজমাট কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসাগুলো। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পশ্চিম চররুহিতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ জাহাঙ্গীর আবেদ বলেন, বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষার্থী কমার পিছনে অনেকগুলো কারণ বিদ্যমান। যেমন- অবকাঠামোগত সমস্যা, ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় নিয়ম বহির্ভূতভাবে অনিবন্ধিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, দারিদ্র্যতা, স্কুল ফিডিং বন্ধ হয়ে যাওয়া, প্রাথমিকে ৯টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ৭ ঘন্টা লম্বা সময় স্কুল টাইম। যেখানে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান সময় কম, শিক্ষক স্বল্পতা, এই অঞ্চলের মানুষ ধর্ম অনুরাগী হওয়ায় মাদ্রাসার প্রতি ঝুঁকে যাও, ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া, এছাড়াও পাঠদান বহির্ভূত বিভিন্ন দায়িত্ব পালনকালীন সময় পাঠদান ব্যহত হওয়া, বেতন কাঠামোগত কারনে মানসম্পন্ন শিক্ষক যোগদান করেও অন্যত্র চলে যাওয়াও শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার অন্যতম কারন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ আলাউদ্দিন আলো বলেন, প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়ে আমাদের বিভিন্ন পর্যালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে করোনা কালীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ থাকা, বন্যা ও বছরে বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে।অভিভাকদের অসচেতনতা, বিভিন্ন ডিভাইস আসক্তি, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় এই সব বিদ্যালয়ে।এই ছাড়া সিলেবাসে বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বিগত সরকারের আমলে। অন্যদিকে কেজি স্কুল ও মাদ্রাসায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হচ্ছে। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকারের যে উদ্যোগ বৃত্তি পরীক্ষা চালু, ড্রেস প্রদান সহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে এগুলো বাস্তবায়ন হলে সগৌরবে ফিরবে প্রাথমিক বিদ্যালয়। জেলা শিক্ষা অফিসার সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘শিক্ষার্থী সংকট কাটাতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। নিয়মিত ক্লাস মনিটরিং, অভিভাবক সমাবেশ, মিড ডে মিল সহ স্কুলভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি এবং মানোন্নয়ন প্রশিক্ষণ এখন নিয়মিতভাবে চলছে। আশা করা যায়, এসব উদ্যোগে শিগগিরই শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে এবং সরকারি বিদ্যালয়গুলো আবারও আগের গৌরব ফিরে পাবে। শিক্ষক ঘাটতির বিষয়ে মন্ত্রণালয় নিয়োগ দিবে। নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হলে সংকট কেটে যাবে।
সংবাদ শিরোনাম
লক্ষ্মীপুরে একবছরে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমেছে তেরো হাজার
-
আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল লক্ষ্মীপুর - আপডেট সময় ০২:০৯:০০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
- 101
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ













