কাগজে-কলমে প্রকল্পের নাম ‘ভাষাসৈনিক গোলাম মাওলা সেতু’। কিন্তু শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কীর্তিনাশা নদীর ঘাটে এসে দাঁড়ালে এটিকে কোনো সেতু নয়, বরং ‘সরকারি অর্থ অপচয় ও ঠিকাদারি গাফিলতি’র এক উন্মুক্ত স্মারক বলে মনে হয়। বিগত ১০ বছর ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে মাত্র ১৪৫ মিটারের একটি সেতু। এই এক দশকে তিনবার ঠিকাদার বদল হয়েছে, পাল্টেছে নকশা, আর ১৪ কোটি টাকার প্রকল্প চোখের পলকে লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ কোটি ২ লাখ টাকায়! কাজ শেষ না হলেও রহস্যজনক কারণে প্রথম দুই ঠিকাদারের পকেটে চলে গেছে ১৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। আর ওপারে যাওয়ার জন্য প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, গাদাগাদি করে মাত্র তিনটি ট্রলারে চড়ছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ চার ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কীভাবে একের পর এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ মাঝপথে ফেলে চলে গেছে এবং এলজিইডির উদাসীনতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ এক দশক ধরে জিম্মি হয়ে আছে। প্রকল্পের মূল প্রাক্কলন (২০১৭): ১৪ কোটি টাকা বর্তমান সংশোধিত ব্যয় (২০২৬): ৩৯ কোটি ২ লাখ টাকা (বৃদ্ধি প্রায় ৩ গুণ) বর্তমানে কাজ বন্ধ হয়ে আছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, দ্বিতীয় ঠিকাদার কোহিনুর এন্টারপ্রাইজকে ইতিমধ্যে ৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা ক্যাশ দেওয়া হয়েছে এবং কাজ বন্ধ থাকা অবস্থাতেই আরও ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ছাড় করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি ছাড়াই ১৮ কোটি টাকার কাছাকাছি সরকারি তহবিল সরকারি কোষাগার থেকে উধাও। ভেঙে ফেলা হলো পুরোনো সেতু, বিচ্ছিন্ন চার ইউনিয়ন। যোগাযোগের এই মহা-সংকটের শুরু ২০২৩ সালে। নতুন সেতু দ্রুত শেষ করার অজুহাতে ১৯৯৭ সালে নির্মিত পুরোনো ১০৫ মিটারের ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি ডিনামাইট ও এক্সকাভেটর দিয়ে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেয় এলজিইডি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিকল্প কোনো বেইলি ব্রিজ বা অস্থায়ী কাঠের সেতু না বানিয়েই পুরোনোটি ভেঙে ফেলায় পুরো এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পদ্মা সেতু চালুর পর নড়িয়া-জাজিরা-ঢাকা সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে বহুগুণ। জাজিরা থেকে নড়িয়া হয়ে ঢাকায় যাতায়াতের এটিই ছিল প্রধান পথ। অথচ কীর্তিনাশা নদীর ওপর সেতু না থাকায় কোনো যানবাহন নদী পার হতে পারছে না। ফলে দূরপাল্লার যাত্রীদের বাধ্য হয়ে জেলা শহরের প্রেমতলা ঘুরে প্রায় ১৫ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে প্রতিটি গাড়ির জ্বালানি খরচ ও সময় বাড়ছে দ্বিগুণ। বর্ষার মেঘলা আকাশে যখনই মেঘ জমে, নড়িয়া সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মৌসুমি আক্তারের বুকে তখন কাঁপন ধরে। সে বলে, আজ ট্রলারে ওঠার পরপরই হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি শুরু হয়। মাঝনদীতে ট্রলারে কোনো ছাউনি ছিল না। প্রতিটা দিন আমরা এই ঘাটে এসে জীবন বাজি রাখি। আমাদের এই দুর্ভোগ দেখার যেন কেউ নেই। একই ঘাটে কথা হয় মাদবরকান্দি গ্রামের আবুল মিস্ত্রির সঙ্গে। তাঁর প্রসূতি স্ত্রী নড়িয়া হাসপাতালে ভর্তি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জরুরি রোগী নিয়ে ভ্যানে করে ঘাটে আসি। তারপর গাদাগাদি করে ট্রলারে তুলতে হয়। গত তিন বছর ধরে চিকিৎসা তো দূর, সামান্য বাজার করতে গেলেও এই নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের দাবি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে গেলে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত ও কালো তালিকাভুক্ত করার কথা। কিন্তু কীর্তিনাশা সেতুর ক্ষেত্রে বারবার নমনীয়তা দেখানোর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রকৌশল বিভাগের বিরুদ্ধে। জানতে চাইলে শরীয়তপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রাফেউল ইসলাম খবরপত্রকে বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় দফার ঠিকাদারেরা বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও কারিগরি কারণে কাজ শেষ করতে পারেনি। আমরা বসে নেই, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ঠিকাদারের পাওনা থেকে ২০ শতাংশ জরিমানা কেটে রাখা হবে। তবে জরিমানা কাটার কথা বলা হলেও কেন কাজ বন্ধ থাকা অবস্থায় ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বিল পাসের প্রক্রিয়া চলছে তার কোনো সদুত্তর মেলেনি। বর্তমানে তৃতীয় দফায় এক বছরের সময় দিয়ে নতুন করে ২১ কোটি ২৫ লাখ টাকার চুক্তি করা হয়েছে।
সংবাদ শিরোনাম
১৪ কোটি থেকে ব্যয় বেড়ে ৩৯ কোটি, তবু নেই সেতু: ট্রলারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হাজারো মানুষ
-
মঞ্জুরুল ইসলাম রনি শরীয়তপুর - আপডেট সময় ০৩:১৮:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
- 135
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ



















