নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের বরুয়াকোনা বাজারসংলগ্ন মহাদেও নদে আদালতের নিষেধাজ্ঞা, প্রশাসনের অভিযান ও নানা উদ্যোগের পরও থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলন। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র নৌকা দিয়ে দিন-রাত নদীর তলদেশ থেকে বালু তুলে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করছে। এতে একদিকে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব, অন্যদিকে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে নদীতীরবর্তী বসতভিটা, ফসলি জমি ও পরিবেশ। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বরুয়াকোনা পয়েন্টে ১০ থেকে ১২টি ছোট-বড় নৌকায় শ্রমিকরা বাঁশ ও বালতির সাহায্যে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করছেন। পরে নৌকায় করে সেই বালু উপজেলার বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এছাড়া মহাদেও নদীর তীরবর্তী নল্লাপাড়া, ওমরগাওঁ, কালিহালা, ডাইয়ারকান্দা, বৈদ্যগাঁও, চকপাড়া, চিনাহালা ও নয়নাগড় এলাকায় বালুর স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। সেখান থেকে ট্রলি ও ড্রামট্রাকে করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ড্রেজার ব্যবহার না হলেও অপরিকল্পিত ও অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তিত হয়ে দুই তীরে ভাঙন তীব্র হচ্ছে। ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বহু ফসলি জমি। তবে স্থানীয়দের দাবি, সরকারি উন্নয়নমূলক কাজের প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে বালু উত্তোলনে তাদের আপত্তি নেই। আপত্তি শুধু বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে বালু লুটের বিরুদ্ধে। বরুয়াকোনা বাজারের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ড্রেজার ব্যবহার না করলেও বর্ষা মৌসুমে ২০-৩০টি নৌকা দিয়ে নিয়মিত বালু তোলা হচ্ছে। প্রতিদিন অন্তত ৫০-৬০ নৌকা বালু নিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ি ঢল নামলে শতাধিক বড় নৌকা আসে। শুধু কলমাকান্দার নয়, পাশের উপজেলার নৌকাও এখানে বালু তোলে। বাধা দিলে প্রভাবশালীদের নাম বলে উল্টো হুমকি দেয়। নল্লাপাড়ার রসুখাঁ সেতু এবং ওমরগাঁও নল্লাপাড়া কালভার্টের মুখে লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা গেলে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রয়োজন হলে আমরা মানববন্ধন কর্মসূচিও দেব। মৌতলা গ্রামের বাসিন্দা রুস্তম আলী বলেন, মহাদেও নদ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে আমার বসতবাড়ি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে বর্ষায় আমাদের বাড়িঘর নদীগর্ভে চলে যাবে। বিচার চাইলেও কোনো প্রতিকার পাই না। আরেক বাসিন্দা আসাদ মিয়া বলেন, এ পর্যন্ত আমার প্রায় দেড় আড়া জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আমরা এর প্রতিকার চাই। আদিবাসী নেতা পিটারসন কুবি বলেন, বিগত সরকারের সময় গারো সম্প্রদায়সহ স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করেছিলেন। এখন কি আবারও আন্দোলনে নামতে হবে? নল্লাপাড়া গ্রামের রসুখাঁ সেতু সংলগ্ন বাসিন্দা জমিলা খাতুন বলেন, দিন-রাত ইঞ্জিনচালিত নৌকার ঢেউয়ে আমাদের বসতভিটা ভেঙে যাচ্ছে। বিকট শব্দে রাতে ঘুমাতে পারি না। আমরা কি এর কোনো প্রতিকার পাব না? এলাকাবাসীর অভিযোগ, আদালতের নিষেধাজ্ঞা এবং উপজেলা প্রশাসনের কড়াকড়ি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় ভূমি অফিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই অবৈধ বালু উত্তোলন চলছে। মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
নৌকার শ্রমিক আক্কাছ আলী বলেন, আমরা আদালতের নিষেধাজ্ঞা বুঝি না, বুঝি পেটের দায়। আমার মতো হাজারো শ্রমিক না খেয়ে থাকবেএটাই কি চান আপনারা? কলমাকান্দা প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ শামীম বলেন, আদালতের স্থগিতাদেশ, উপজেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কঠোর অবস্থান থাকার পরও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা যাচ্ছে না। এতে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। সরকার যদি পরিকল্পিতভাবে বালুমহাল ইজারার আওতায় আনে, তাহলে একদিকে সরকারের বিপুল রাজস্ব আয় হবে, অন্যদিকে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং অবৈধ বালু বাণিজ্যও নিয়ন্ত্রণে আসবে। রংছাতি ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা আলী আজগর বলেন, প্রশাসনের নির্দেশে রসুখাঁ সেতুর নিচে লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বড় বড় স্টিল বডির নৌকা ধাক্কা দিয়ে তা ভেঙে ফেলেছে। তারা আমার অফিসের সামন দিয়েই যাতায়াত করে। মৌখিকভাবে নিষেধ করলে শোনে না। বিষয়টি ইতোমধ্যে এসিল্যান্ড স্যারকে অবহিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. শামছুজ্জামান আসিফ বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে জরিমানা ও সাজা দেওয়া হয়েছে। মহাদেও নদে নৌকা দিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, নদীপথে সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির স্বার্থে পরিকল্পিতভাবে মহাদেও নদীর বালুমহাল বৈধ ইজারার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
সংবাদ শিরোনাম
কলমাকান্দার মহাদেও নদে থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলন নদীভাঙনে ঝুঁকিতে বসতভিটা-ফসলি জমি, সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব
-
কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি - আপডেট সময় ০২:৪৪:২৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
- 86
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ























