ঢাকা ০৩:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র ও রপ্তানি প্রবেশদ্বার হতে চায় বাংলাদেশ Logo সিপাহি-জনতার বিপ্লব : সংবাদপত্রের পাতায় সেই দিনটি Logo উপকূলীয় অঞ্চলে চাষাবাদে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এলো উচ্চ ফলনশীল ‘ব্রি ধান- Logo শেখ হাসিনার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিফ প্রসিকিউটরের চিঠি Logo গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সচেষ্ট সরকার, অস্থিরতার সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo গ্যাস সরবরাহ চারদিন বন্ধ থাকবে এমন সংবাদ বিভ্রান্তিকর : পেট্রোবাংলা Logo রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ Logo পুলিশের জন্য কেনা হবে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী যানসহ ৫৮৩০ বাহন Logo কুইক রেন্টালের নামে লুটপাটের পরিবর্তে সাশ্রয়ী উপায়ে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী Logo কমনওয়েলথ কাবাডিতে ব্রোঞ্জজয়ী বাংলাদেশ দলকে সংবর্ধনা

পাইকগাছায় আধুনিক যুগেও পেশা আঁকড়ে ধরে মাদুর বুনে জীবিকা নির্বাহ

আধুনিকতার ছোঁয়ায় যখন অনেক গ্রামীণ ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে, তখনও এই গ্রামের মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাদুর তৈরি করে নিজেদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু বাপদাদার পেশা এখনো আঁকড়ে ধরে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছেন খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়নের কৈছিটিবুনিয়া গ্রামের অধিকাংশ পরিবার। সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কোনো না কোনোভাবে মাদুর তৈরির কাজ চলছে। কোথাও উঠানে, কোথাও বারান্দায়, আবার কোথাও ঘরের ভেতরে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে মাদুর বুনছেন। ছোট-বড় সবাই এই কাজের সঙ্গে পরিচিত। বিশেষ করে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমান দক্ষতায় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সংসারের দৈনন্দিন কাজ শেষ করে অনেক গৃহিণী নিয়মিত মাদুর তৈরি করেন, যা পরিবারের বাড়তি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গ্রামের প্রায় ৩০০ জন বাসিন্দার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদুর তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কেউ পাতি (ম্যালি) চাষ করেন, কেউ কাঁচামাল প্রস্তুত করেন, কেউ মাদুর বোনেন, আবার কেউ বাজারজাতকরণের কাজে যুক্ত থাকেন। ফলে এই কুটির শিল্পকে কেন্দ্র করে পুরো গ্রামজুড়েই একটি ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কার্যক্রম গড়ে উঠেছে। স্থানীয় কারিগর ভুদার ম-ল জানান, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পাতি (ম্যালি) দিয়েই বছরের প্রায় পুরো সময়জুড়ে মাদুর তৈরি করা হয়। বর্ষাকালেও এ কাজ পুরোপুরি বন্ধ থাকে না। এলাকার জমিতে উৎপাদিত পাতি( ম্যালি) সংগ্রহ করে প্রথমে শুকানো হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী কেটে, বাছাই করে মাদুর তৈরির উপযোগী করা হয়। কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম এবং সারা বছরই কাজ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। তিনি আরও বলেন, এই গ্রামের তৈরি মাদুরের বেশ চাহিদা রয়েছে। পার্শ্ববর্তী সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার বড়দল এর হাটসহ আশপাশের বিভিন্ন বাজারে নিয়মিত এসব মাদুর বিক্রি করা হয়। এছাড়া খুলনাসহ এ উপজেলার পাইকাররা সরাসরি গ্রামে এসে মাদুর কিনে নিয়ে যান। অনেক খুচরা ক্রেতাও নিজের পছন্দমতো মাদুর কিনতে সরাসরি কারিগরদের বাড়িতে চলে আসেন। কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি মাদুর তৈরিতে সাধারণত দুজন মানুষের প্রয়োজন হয়। দুজন দুই প্রান্তে বসে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করেন। একজন ব্যাওয়ের সাহায্যে পাতি (ম্যালি) এগিয়ে দেন, অন্যজন তা নিখুঁতভাবে বুনে মাদুরের আকৃতি দেন। দক্ষতার ওপর নির্ভর করে প্রতিদিন দুজন মিলে দুই থেকে তিনটি মাদুর তৈরি করতে পারেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তাদের হাতে তৈরি প্রতিটি মাদুর মজবুত, টেকসই এবং ব্যবহারে আরামদায়ক হওয়ায় বাজারে এর কদরও ভালো। কারিগররা জানান, বর্তমানে ৬ ফুট লম্বা ও ৪ ফুট চওড়া একটি মাদুর পাইকারি বাজারে প্রায় ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। এক জোড়া মাদুরের দাম পাওয়া যায় প্রায় ৬০০ টাকা। এছাড়া ৬ ফুট লম্বা ও ৩ ফুট চওড়া একটি মাদুরের পাইকারি মূল্য প্রায় ২০০ টাকা। তবে খুচরা বাজারে বিক্রি করতে পারলে প্রতিটি মাদুরে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব হয়। কিন্তু দূরবর্তী বাজারে নিজেরা গিয়ে বিক্রি করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা পাইকারদের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয়রা জানান, প্রায় তিন দশক ধরে এই কুটির শিল্পই গ্রামের অর্ধেক মানুষের প্রধান জীবিকার উৎস। কৃষিকাজের পাশাপাশি অনেক পরিবার পুরোপুরি মাদুর তৈরির আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এই শিল্পের মাধ্যমে অনেক পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, চিকিৎসা ব্যয় এবং সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে মাদুর শিল্পের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামবাসীর বিশ্বাস, যথাযথ পরিকল্পনা ও সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলে কৈছিটিবুনিয়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মাদুর শিল্প শুধু স্থানীয় অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করবে না, বরং দেশের কুটির শিল্পের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে জাতীয় পর্যায়েও পরিচিতি লাভ করবে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র ও রপ্তানি প্রবেশদ্বার হতে চায় বাংলাদেশ

পাইকগাছায় আধুনিক যুগেও পেশা আঁকড়ে ধরে মাদুর বুনে জীবিকা নির্বাহ

আপডেট সময় ০৯:৩৭:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

আধুনিকতার ছোঁয়ায় যখন অনেক গ্রামীণ ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে, তখনও এই গ্রামের মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাদুর তৈরি করে নিজেদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু বাপদাদার পেশা এখনো আঁকড়ে ধরে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছেন খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়নের কৈছিটিবুনিয়া গ্রামের অধিকাংশ পরিবার। সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কোনো না কোনোভাবে মাদুর তৈরির কাজ চলছে। কোথাও উঠানে, কোথাও বারান্দায়, আবার কোথাও ঘরের ভেতরে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে মাদুর বুনছেন। ছোট-বড় সবাই এই কাজের সঙ্গে পরিচিত। বিশেষ করে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমান দক্ষতায় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সংসারের দৈনন্দিন কাজ শেষ করে অনেক গৃহিণী নিয়মিত মাদুর তৈরি করেন, যা পরিবারের বাড়তি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গ্রামের প্রায় ৩০০ জন বাসিন্দার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদুর তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কেউ পাতি (ম্যালি) চাষ করেন, কেউ কাঁচামাল প্রস্তুত করেন, কেউ মাদুর বোনেন, আবার কেউ বাজারজাতকরণের কাজে যুক্ত থাকেন। ফলে এই কুটির শিল্পকে কেন্দ্র করে পুরো গ্রামজুড়েই একটি ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কার্যক্রম গড়ে উঠেছে। স্থানীয় কারিগর ভুদার ম-ল জানান, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পাতি (ম্যালি) দিয়েই বছরের প্রায় পুরো সময়জুড়ে মাদুর তৈরি করা হয়। বর্ষাকালেও এ কাজ পুরোপুরি বন্ধ থাকে না। এলাকার জমিতে উৎপাদিত পাতি( ম্যালি) সংগ্রহ করে প্রথমে শুকানো হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী কেটে, বাছাই করে মাদুর তৈরির উপযোগী করা হয়। কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম এবং সারা বছরই কাজ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। তিনি আরও বলেন, এই গ্রামের তৈরি মাদুরের বেশ চাহিদা রয়েছে। পার্শ্ববর্তী সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার বড়দল এর হাটসহ আশপাশের বিভিন্ন বাজারে নিয়মিত এসব মাদুর বিক্রি করা হয়। এছাড়া খুলনাসহ এ উপজেলার পাইকাররা সরাসরি গ্রামে এসে মাদুর কিনে নিয়ে যান। অনেক খুচরা ক্রেতাও নিজের পছন্দমতো মাদুর কিনতে সরাসরি কারিগরদের বাড়িতে চলে আসেন। কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি মাদুর তৈরিতে সাধারণত দুজন মানুষের প্রয়োজন হয়। দুজন দুই প্রান্তে বসে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করেন। একজন ব্যাওয়ের সাহায্যে পাতি (ম্যালি) এগিয়ে দেন, অন্যজন তা নিখুঁতভাবে বুনে মাদুরের আকৃতি দেন। দক্ষতার ওপর নির্ভর করে প্রতিদিন দুজন মিলে দুই থেকে তিনটি মাদুর তৈরি করতে পারেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তাদের হাতে তৈরি প্রতিটি মাদুর মজবুত, টেকসই এবং ব্যবহারে আরামদায়ক হওয়ায় বাজারে এর কদরও ভালো। কারিগররা জানান, বর্তমানে ৬ ফুট লম্বা ও ৪ ফুট চওড়া একটি মাদুর পাইকারি বাজারে প্রায় ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। এক জোড়া মাদুরের দাম পাওয়া যায় প্রায় ৬০০ টাকা। এছাড়া ৬ ফুট লম্বা ও ৩ ফুট চওড়া একটি মাদুরের পাইকারি মূল্য প্রায় ২০০ টাকা। তবে খুচরা বাজারে বিক্রি করতে পারলে প্রতিটি মাদুরে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব হয়। কিন্তু দূরবর্তী বাজারে নিজেরা গিয়ে বিক্রি করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা পাইকারদের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয়রা জানান, প্রায় তিন দশক ধরে এই কুটির শিল্পই গ্রামের অর্ধেক মানুষের প্রধান জীবিকার উৎস। কৃষিকাজের পাশাপাশি অনেক পরিবার পুরোপুরি মাদুর তৈরির আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এই শিল্পের মাধ্যমে অনেক পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, চিকিৎসা ব্যয় এবং সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে মাদুর শিল্পের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামবাসীর বিশ্বাস, যথাযথ পরিকল্পনা ও সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলে কৈছিটিবুনিয়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মাদুর শিল্প শুধু স্থানীয় অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করবে না, বরং দেশের কুটির শিল্পের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে জাতীয় পর্যায়েও পরিচিতি লাভ করবে।