শরতের ভোরের কুয়াশা সবে কাটতে শুরু করেছে। পূর্ব আকাশে সূর্যের উঁকি, মিষ্টি রোদের পরশ আর শান্ত জলের বুকে ফুটে থাকা হাজারো লাল শাপলাÑসব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির আঁকা এক অপূর্ব ছবি। সবুজ লতাপাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে থাকা শাপলার পাপড়িতে জমে থাকা শিশিরবিন্দুতে সূর্যের আলো পড়তেই রক্তিম আভায় সেজে ওঠে পুরো বিল। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের তারাইল বিল এখন শরতের এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মুখর। বিলের শান্ত জল, চারপাশের সবুজ আর লাল-সাদা শাপলার সমারোহে প্রতিদিন ভোরে সেখানে ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমী, দর্শনার্থী, ফটোগ্রাফার ও কনটেন্ট নির্মাতারা। স্থানীয়রা জানান, টুঙ্গিপাড়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বিলে দীর্ঘদিন ধরেই প্রাকৃতিকভাবে শাপলা ফুটে আসছে।
প্রায় এক কিলোমিটার বিস্তৃত জলাশয়ের বিভিন্ন অংশজুড়ে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত লাল ও সাদা শাপলার দেখা মেলে। ভোরের আলো ফুটতেই শাপলাগুলো যেন নতুন রূপে জেগে ওঠে। নীলাভ পানির ওপর লাল-সাদার মিশেলে তৈরি হয় চোখজুড়ানো দৃশ্য। বিলের পানিতে সাদা বক, পানকৌড়িসহ বিভিন্ন জলজ পাখির বিচরণও বাড়িয়ে দিয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ভোরে নৌকায় চড়ে বিলের মধ্যে ঘুরে বেড়ান অনেকে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উপভোগ করছেন শরতের নির্মল পরিবেশ। বিলপাড়ের বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় শত বছর ধরে এ বিলে প্রাকৃতিকভাবেই শাপলা ফুটছে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাপলাবিলের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ এখানে আসছেন। তবে দর্শনার্থীদের বাড়তি উপস্থিতির পাশাপাশি তৈরি হয়েছে কিছুটা উদ্বেগও। স্থানীয়দের অভিযোগ, ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণের সময় অনেকে অসচেতনভাবে শাপলা ছিঁড়ে ফেলছেন। এতে বিলের স্বাভাবিক সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি এর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। স্থানীয়দের ভাষ্য, শাপলা শুধু বিলের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এ ফুল সংগ্রহ ও বাজারে বিক্রির সঙ্গে কিছু পরিবারের জীবিকাও জড়িত। ফলে বিলের পরিবেশ ও শাপলার স্বাভাবিক বিস্তার ধরে রাখতে দর্শনার্থীদের ফুল না ছেঁড়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এলাকাবাসীর মতে, প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি, বিলের পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপদ নৌযান চলাচল এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে তারাইল বিলটি ভবিষ্যতে একটি সম্ভাবনাময় পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এতে একদিকে যেমন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য নতুন আকর্ষণ তৈরি হবে, অন্যদিকে স্থানীয়দের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সুযোগও বাড়বে। যেভাবে যাবেন লাল শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে ভোরে তারাইল বিলে পৌঁছানো সবচেয়ে ভালো। গোপালগঞ্জ জেলা শহর বা দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে ঘোনাপাড়া হয়ে টুঙ্গিপাড়া উপজেলা সদরে যেতে হবে। এরপর টুঙ্গিপাড়া থানার সামনের সড়ক ধরে বাগিয়ারকূল হয়ে তারাইল বাজারে যেতে হবে। সেখান থেকে বেড়িবাঁধের রাস্তা ধরে চর গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিকে প্রায় এক কিলোমিটার এগোলেই দেখা মিলবে শাপলায় ভরা বিলটির। শিশিরভেজা লাল শাপলার সারি, শান্ত পানির ঢেউ, চারপাশের সবুজ আর পাখির কলকাকলিতে শরতের ভোরে তারাইল বিল যেন হয়ে ওঠে প্রকৃতির জীবন্ত ক্যানভাস। ব্যস্ত নগরজীবন থেকে দূরে এই বিলের পাড়ে দাঁড়ালে এখনো অনুভব করা যায় গ্রামবাংলার চিরচেনা প্রকৃতির সেই নির্মল সৌন্দর্য।
সংবাদ শিরোনাম
টুঙ্গিপাড়ার তারাইল বিলে শরতের লাল শাপলার মেলা
-
টুঙ্গিপাড়া (গোপালগঞ্জ) প্রতিনিধি - আপডেট সময় ০৭:৪০:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 25
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























