কেয়ামত ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের একটি বিষয়। কোরআন ও সহিহ হাদিসে কেয়ামতের পূর্ববর্তী বিভিন্ন নিদর্শন এবং কেয়ামতের দিনের ভয়াবহ ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীতে সংঘটিত প্রতিটি বন্যা, ভূমিকম্প, ভূমিধস, ঝড় কিংবা হিমবাহধসকে কেয়ামতের নির্দিষ্ট নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করা ঠিক নয়। সহিহ মুসলিমে কেয়ামতের বড় নিদর্শনগুলোর মধ্যে দাজ্জালের আবির্ভাব, ঈসা (আ.)-এর অবতরণ, ইয়াজুজ-মাজুজ, সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়া, দাব্বাতুল আরদ, ধোঁয়া এবং বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের ভূমিধসের কথা বর্ণিত হয়েছে। তাই নেপালের বর্তমান দুর্যোগকে কেয়ামতের নিশ্চিত বা নির্দিষ্ট আলামত বলা যাবে না। এর পক্ষে কোরআন বা সহিহ হাদিসে কোনো সরাসরি দলিল নেই। তবে এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনা মানুষকে মৃত্যু, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব এবং আখিরাতের প্রস্তুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।
বিপদ-আপদ মানুষের জন্য পরীক্ষা ও সতর্কতা :
আল্লাহ তাআলা বলেন-তোমাদের ওপর যে বিপদ-আপদ আসে, তা তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মের কারণেই; আর তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন। -(সূরা আশ-শূরা: ৩০) এই আয়াত মানুষকে নিজের জীবন ও কর্ম পর্যালোচনা করার শিক্ষা দেয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগে নিহত মানুষ ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর শাস্তি পেয়েছেন- এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়। কার পরিণতি কী এবং আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা কতটুকু, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। মুমিনের জন্য বিপদ কখনো পরীক্ষা হতে পারে, কখনো সতর্কবার্তা এবং কখনো আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ। তাই দুর্যোগ দেখে অন্যের বিচার না করে নিজের ঈমান ও আমল পর্যালোচনা করাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
কেয়ামতের সময় কেউ জানে না: কেয়ামত কখন সংঘটিত হবে, তা কোনো মানুষ জানে না। আল্লাহ বলেনÑনিশ্চয়ই কেয়ামতের জ্ঞান আল্লাহর কাছেই। (সূরা লুকমান: ৩৪)। রাসুলুল্লাহ (সা.) কে কেয়ামতের সময় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি নির্দিষ্ট সময় জানাননি; বরং কেয়ামতের কিছু নিদর্শনের কথা উল্লেখ করেছেন। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। অতএব কেয়ামতের দিন-তারিখ নির্ধারণ বা কোনো দুর্যোগ দেখে কেয়ামত আসন্ন বলে ঘোষণা করা ইসলামসম্মত নয়। মানুষের দায়িত্ব হলো সেই দিনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
কেয়ামতের দিন কী ঘটবে : কোরআনে কেয়ামতের দিনের ভয়াবহতা বিভিন্নভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেদিন পৃথিবীর বর্তমান ব্যবস্থা পরিবর্তিত হবে এবং মানুষ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হবে, যার সঙ্গে দুনিয়ার কোনো ঘটনার তুলনা করা যায় না। আল্লাহ বলেন-যখন পৃথিবী প্রবলভাবে কেঁপে উঠবে এবং পাহাড়সমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। (সূরা আল-ওয়াকিয়া:৪-৬)। সেদিন আকাশ, পৃথিবী, পাহাড় ও সমুদ্রের বর্তমান পরিচিত কাঠামো পরিবর্তিত হবে। দুনিয়ার জীবনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে শুরু হবে আখিরাতের স্থায়ী জীবন।
শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে : আল্লাহ বলেন- আর শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, তখন আকাশম-লী ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা অচেতন হয়ে পড়বে, তবে আল্লাহ যাদের ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া। অতঃপর আবার তাতে ফুঁ দেওয়া হবে, তখন তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে। (সূরা আয-যুমার:৬৮)। অর্থাৎ কেয়ামতের সময় আল্লাহর নির্দেশে শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে এবং এরপর পুনরুত্থানের পর্যায় শুরু হবে। মৃত্যুর পর মানুষের অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায় না। আল্লাহ কেয়ামতের দিন সবাইকে পুনরুত্থিত করবেন। আল্লাহ বলেন-তারপর তোমরা অবশ্যই কেয়ামতের দিন পুনরুত্থিত হবে। (সূরা আল-মুমিনূন:১৬)। পৃথিবীতে মানুষ যে জীবন কাটিয়েছে, তার প্রতিটি কাজের হিসাব তাকে দিতে হবে। এই বিশ্বাসই একজন মুমিনকে দায়িত্বশীল জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে।
প্রতিটি কাজের হিসাব হবে : মানুষের ছোট-বড় কোনো কাজই আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। আল্লাহ বলেন : যে অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সেও তা দেখতে পাবে। (সূরা আয-যিলযাল:৭-৮)। তাই সামান্য ভালো কাজকেও অবহেলা করা উচিত নয়। একইভাবে ছোট মনে করে কোনো গুনাহে জড়িয়ে পড়াও নিরাপদ নয়। মানুষের কথা, আচরণ, অধিকার আদায় এবং অন্যের প্রতি তার ব্যবহার-সবকিছুরই মূল্য রয়েছে।
কেয়ামতের দিন পূর্ণ ন্যায়বিচার হবে : দুনিয়ায় অনেক অপরাধের বিচার অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ক্ষমতাবান ব্যক্তি কখনো আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারে, আবার নিরপরাধ মানুষও অন্যায়ের শিকার হতে পারে। কিন্তু আল্লাহর আদালতে কোনো অবিচার থাকবে না।
আল্লাহ বলেন : আমি কেয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের পাল্লা স্থাপন করব। অতএব কোনো ব্যক্তির প্রতি সামান্যও জুলুম করা হবে না। (সূরা আল-আম্বিয়া:৪৭)। সেদিন মানুষের সম্পদ, ক্ষমতা, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচয় নয়; তার ঈমান ও আমলই হবে মূল বিষয়।
কেয়ামতের দিনে মানুষের অবস্থা : কোরআনে বলা হয়েছে, কেয়ামতের দিন মানুষ নিজের অবস্থার পরিণতি নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকবে যে দুনিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোও তখন তার কাছে গৌণ হয়ে যাবে। সূরা আবাসায় আল্লাহ বলেন, সেদিন মানুষ তার ভাই, মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তান থেকেও দূরে সরে যাবে। কারণ প্রত্যেক মানুষ নিজের হিসাব ও পরিণতি নিয়ে চিন্তিত থাকবে। এ থেকে বোঝা যায়, দুনিয়ার জীবনে যেসব বিষয়কে আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, আখিরাতের বিচারে সেগুলোর অনেক কিছুই তুচ্ছ হয়ে যাবে।
বিভিন্ন সময়ের দুর্যোগ আমাদের কী শিক্ষা দেয়
১. জীবন ক্ষণস্থায়ী: মুহূর্তের মধ্যে মানুষের জীবন ও সম্পদ বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারে। তাই তওবা, সৎকর্ম ও নেক আমলকে ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখা উচিত নয়।
২. মানুষের সক্ষমতা সীমিত: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষকে অনেক দূর এগিয়ে নিলেও প্রকৃতির বিশাল শক্তির সামনে মানুষের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে যায়। এটি আমাদের বিনয়ী ও সচেতন হতে শেখায়।
৩. মানবিক দায়িত্ব অপরিহার্য: দুর্যোগের সময় আহত, অসহায়, নিখোঁজদের পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব। বিপদের সময়ে মানুষের প্রতি সহমর্মিতাই প্রকৃত মানবতার পরিচয়।
৪. বিপদ আত্মশুদ্ধির সুযোগ: অন্যের বিপর্যয় দেখে শুধু আতঙ্কিত না হয়ে নিজের জীবন, চরিত্র, আমল ও মানুষের অধিকার নিয়ে আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। বিপদ আমাদের ভুল থেকে ফিরে আসার এবং নিজেকে সংশোধনের সুযোগ করে দিতে পারে। ৫. আখিরাতের প্রস্তুতি জরুরি:- কেয়ামত কখন সংঘটিত হবে, তা কোনো মানুষ জানে না। তবে মৃত্যু যে কোনো সময় আসতে পারে। তাই একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর প্রতি ঈমান, তওবা, নেক আমল ও মানুষের হক আদায়ের মাধ্যমে সবসময় আখিরাতের জন্য প্রস্তুত থাকা।
আতঙ্ক নয়, আল্লাহর দিকে ফিরে আসা
প্রাকৃতিক দুর্যোগকে কেন্দ্র করে গুজব, ভয় বা ভিত্তিহীন কেয়ামতের ভবিষ্যদ্বাণী ছড়ানো উচিত নয়। ইসলাম মানুষকে আতঙ্কিত করার পরিবর্তে শিক্ষা গ্রহণ, আল্লাহকে স্মরণ এবং বিপদগ্রস্তদের সহযোগিতা করার নির্দেশনা দেয়। আল্লাহ বলেন : হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন দেখে, সে আগামীকালের জন্য কী পাঠিয়েছে। (সূরা আল-হাশর:১৮)। এই আয়াত আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়Ñআমরা আখিরাতের জন্য কী প্রস্তুত করেছি?
পরিশেষে বলা যায়, নেপাল ও তিব্বতের সাম্প্রতিক ভয়াবহ দুর্যোগ মানবজীবনের অসহায়ত্ব, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা আমাদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে কোরআন ও সহিহ হাদিসের সুস্পষ্ট দলিল ছাড়া এ ঘটনাকে কেয়ামতের নিশ্চিত নিদর্শন বলা সঠিক নয়। বরং এমন বিপর্যয় থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত-মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, দুনিয়ার জীবন সাময়িক এবং একদিন প্রত্যেক মানুষকে তার কর্মের হিসাব নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। তাই কেয়ামত কখন আসবে-এই প্রশ্নের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কেয়ামত বা মৃত্যু যদি আজই আসে, আমরা কি তার জন্য প্রস্তুত?
এ ধরনের ঘটনা যেন আমাদের আতঙ্কিত না করে; বরং তওবা, আত্মশুদ্ধি, সৎকর্ম, মানবিকতা এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা আরও বাড়িয়ে দেয়। বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের জন্য দোয়া করা এবং নিজের আমল সংশোধন করাই হতে পারে এসব ঘটনা থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে দুনিয়ার জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি করে আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার তাওফিক দান করুন এবং কেয়ামতের কঠিন দিনে তাঁর রহমত ও ক্ষমতা লাভকারী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।
সংবাদ শিরোনাম
ভূমিকম্প
-
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ - আপডেট সময় ০৮:১৫:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
- 11
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























