বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:৫৩ অপরাহ্ন




আমার দেখা ক’জন শিক্ষা দরদী গুণিজনের কথা

খালিদ হোসেন মিলটন, সভাপতি, গলাচিপা প্রেসক্লাব :
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০২০




“যে জাতি যত শিক্ষিত হবে সেই দেশ তত উন্নত শিখরে আত্ম মর্যাদা লাভ করবে”। কথায় আছে “শিক্ষায় সম্মান, অশিক্ষায় অপমান”। যে মানুষেরা দেশের দুর্গম ও প্রান্তিক পর্যায়ে সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়, তারা সত্যিকার অর্থে সমাজের এবং দেশের গুণীজন।। এবং ঐ সমস্ত দেশপ্রেমিক মানুষ তাদের কোন চাওয়া পাওয়ার বিনিময় ছাড়াই দেশের বিভিন্ন স্থানে, নিজ এলাকায়, কর্মস্থলে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে একটি এলাকার শিশু কিশোরদের শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছেন তাদের মানসিকতা কত বড়, সে চিন্তা ক’জন মানুষ করে। নিজের অর্থ, শ্রম এবং নি:স্বার্থ ভাবে প্রতিষ্ঠান-প্রতিষ্ঠিত করে স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে সমাজে ও দেশের মঙ্গলে কতটা নিবেদিত প্রাণ, তা বোঝার ক্ষমতা বা যোগ্যতা আমার নেই। আমি শুধু তাদের সৃষ্টিশীল মহান কর্মের জন্য দোয়া করি ঈশ^রের কাছে, শিক্ষাপ্রেমী সৃষ্টিশীল মানুষগুলো যেন জীবিত অসহায় বা মৃত্যুর পরে, তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধাটুকু গ্রহণ করে এবং তাদেরকে আমার হৃদয় থেকে স্যালুট। আমি যে সমস্ত শিক্ষা প্রেমী গুণিজনের কথা বলতে চাই, তারা প্রত্যেকেই নিজের প্রয়োজনটুকু মিটিয়ে পরক্ষণেই মানুষের কল্যাণ কাজে কৃতজ্ঞ হয়ে আছে। সৃষ্টিশীল কর্মের জন্য তাদের মধ্যে, প্রথমেই বলতে হয়, গলাচিপা উপজেলার সর্বজন স্বীকৃত, সকলের শ্রদ্ধেয় স্যার, গলাচিপা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সাবেক ম্যাজিস্ট্রেট মরহুম মো: ইউসুফ মিয়া স্যার। তিনি তার শিক্ষা বিস্তারের শেষে এবং জীবনের শেষ সময়ে, স্থাপন করেছে গলাচিপা মহিলা কলেজ। যে সৃষ্টিতে তৈরি হচ্ছে নারী শিক্ষার্থী। মরহুম ইউসুফ মিয়া স্যার ছিলেন আমার মায়ের শিক্ষক, আমার শিক্ষক, তার দেয়া নৈতিকতা ও আদর্শ এবং অধ্যবসায় আমাকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করে চলছে।
এছাড়া এই উপজেলায় সম্প্রতি সময়ে বা দুই যুগ থেকে কিছু ব্যক্তির নাম না বললেই নয়। তারা হলো- মরহুম সেকান্দার আলী চৌধ্রুী। তিনি পেশায় ঠিকাদার ছিলেন এবং বড় একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম। তার পিতা জমিদার ছিলেন। তিনি স্থাপিত করে গেছেন এলাকার একটি অজ-পাড়া গ্রামে কলাগাছিয়া সেকান্দার আলী চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ। যা আজ প্রতিষ্ঠিত।
এরপর যার নাম নিতে হয় সে হলো জাতীয় পার্টির সাবেক এম.পি মরহুম ইয়াবুল আলী চৌধুরী। যিনি সেকান্দার আলী চৌধুরীর চাচাতো ভাই এবং একাই বংশধর। তিনি খারিজ্জমা স্কুল এবং খারিজ্জমা কলেজ স্থাপনা করে অমর হয়ে আছেন। উপরের দু’জন ব্যক্তিই আমার বাবার মামাতো ভাই।
এরপরে আমার জনপদে সবচেয়ে গরীব সাধারণ মানুষের বন্ধু নামে খ্যাত, তিনি মরহুম সাবেক রতনদী তালতলী ইউপি চেয়ারম্যান ওমর ফারুক (ফারুক ভাই)। তিনি স্থাপন করলেন বড়বাঁধ মহিলা দাখিল মাদ্রাসা। এমনি ভাবে আমার উপজেলার সবচেয়ে যে এলাকাটি দুর্গম বা চরাঞ্চল, চর-বিশ^াস ইউনিয়নে শিল্পপতি আলহাজ¦ গোলাম মোস্তফার নিজস্ব জমি ও অর্থায়নে কে.আলী কলেজ স্থাপন করে। যেখানে দুর্গম এলাকার ছেলে-মেয়েরা শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে।
এরপরে সাবেক চেয়ারম্যান মো: ইউসুফ মোল্লা বকুলবাড়িয়া কলেজ, আমখোলা ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান আ: ছাত্তার হাওলাদার প্রতিষ্ঠা করলেন আমখোলা কলেজ। উপরের ৩টি কলেজ প্রতিষ্ঠায় যার নাম সর্বজন এবং যিনি সরকারের কাছে প্রতিবেদন বা রিপোর্ট দিয়ে কলেজগুলো প্রতিষ্ঠার সহায়তায় যার বেশি অবদান তিনি হলেন, সাবেক ইউ.এন.ও এবং বর্তমান স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব মেসবাহ উদ্দিন স্যার।
এর পরে যে শিক্ষা দরদী, এবং দেশপ্রেমিক একজন সৎ, যোগ্য, বিনয়ী মানুষ হিসেবে যার নাম আসে, তিনি হলেন আবুল কাসেম মোঃ মহিউদ্দিন, অতিরিক্ত সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়। তার অমর সৃষ্টি এবং গুড এ্যাডুকেশনে, যে শিক্ষায় এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ফলাফলে সম্মানিত হয়েছে তাদের মধ্যে গলাচিপা উপজেলা প্রশাসনের পরিচালিত বাংলাদেশ তুরস্ক ফ্রেন্ডশীপ স্কুল (প্রাইমারী ও প্রাইভেট) তার প্রতিষ্ঠিত। যেখানে ৩ বার শতভাগ বৃত্তি লাভ করে এবং শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে এবং ফলাফলে বরিশাল বিভাগে সর্বোচ্চ সম্মান লাভ করেছে। এছাড়া তিনি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক হিসেবে ৩য় শ্রেণি থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত কালেক্টরেট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনি চট্টগ্রামের রাম গতি উপজেলায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ঢাকায় কলেজ স্থাপন করে, কত যে সম্মানিত হয়েছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যিনি-শিক্ষা জীবন থেকে এতটা মেধাবী এবং তার পিতা ও মাতার এতটা নির্ভরযোগ্য সন্তান যা আমার কাছে সর্ব শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। এরপরে বর্তমান নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও সাবেক পটুয়াখালী জেলার ২০১৬-২০১৭ সালের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বে নিয়োজিত শিক্ষাদরদী শ্রদ্ধেয় এ.কে.এম শামিমুল হক সিদ্দিকি, তার কর্মজীবনে পটুয়াখালী পুরাতন এস.ডি.ও বাসভবনের সামনে জেলা প্রশাসক মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করে, যা পরর্তীতে জেলা কালেক্টরেট স্কুল হিসেবে আত্মলাভ করে। তিনি ৫ তলা পাকা ভবন ও একাডেমিক শিক্ষা গৃহ নির্মাণ ও শিক্ষক নিয়োগ করে শিক্ষায় সফলতা অর্জন করে এবং পটুয়াখালী জেলার অন্যতম একটি আদর্শিক বিদ্যাপীঠ হিসেবে আজ পরিচিত। ব্যক্তিজীবনে এ.কে.এম শামিমুল হক সিদ্দিকি একজন বিনয়ী ভদ্র ও মানুষকে এবং দেশের কল্যাণে একজন গুণী ব্যক্তি হিসেবে আমার কাছে শ্রদ্ধেয়।।
এরপরে যার নাম লিখব তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায় তার জন্ম। দেশের একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। অথচ-তিনি এমন এক ব্যক্তি যাকে, তার গর্ভধারিণী মা, এতটা দোয়া, আদর, স্নেহ, মমতা দিয়ে এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে, তা আমি আমার জানা মানুষের মধ্যে ততটা দেখতে পাই নি। তিনি হলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ¦ শেখ আতাউর রহমান। ২০০৫-২০০৬ সালে, গলাচিপা থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে আমার সাথে তার পরিচয় এবং বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। এই ব্যক্তিটি গলাচিপা থানা মসজিদের সংস্কার, উন্নয়ন, মুজায়িক পাথর স্থাপন সহ তার নিজ এলাকায় মানুষের কল্যাণে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। যা ভাবতে গেলে আমি অবাক হয়ে যাই। তিনি সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার উত্তর শ্রীপুর একটি পশ্চাৎপদ এলাকায় তিনি মানুষের শিক্ষার উন্নয়নে, শিক্ষার সুযোগ এবং জীবনমানের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নে দুর্গম এলাকার মানুষের শিক্ষার সুযোগ ও শিক্ষার প্রদীপকে আলোকিত করার জন্য একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। যার নাম দিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা-আতাউর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়। তার জন্ম একই গ্রামে। বাজার গ্রাম, রহিমপুরে। সেখানে তিনি মায়ের নামে মাদ্রাসা, এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করে এলাকায় হাজী মুহম্মদ মহসিন নামে এবং একজন দানবীর ও সমাজ সেবক হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। তিনি এলাকার গরীব, মেহনিত মানুষের কল্যাণে নিজ অর্থ দিয়ে প্রতিনিয়ত সহায়তা করে যাচ্ছেন। যা আমাকে এতটা গর্ব করে এবং তার প্রতি আমার অসীম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তার সাথে আমার এত সখ্যতা এবং বন্ধুত্ব হয় যেটা আমার আপন রক্তের সাথেও হয় নি। তিনি আমাকে তার মানসিক বা অন্তরের আত্মায় এতটা বড় সম্মান দিয়েছে যেটা আমার প্রাপ্য বা যোগ্য নই। জীবনে তিনি এতটা সফল যা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। তার সুযোগ্য স্ত্রী ও তিন ছেলের জনক। বড় ছেলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন উর্ধ্বতন অফিসার। বাকি দুই ছেলে উচ্চতর লেখাপড়া করে আজ অস্ট্রেলিয়ায় প্রতিষ্ঠিত। তার প্রতি আমার বিন¤্র শ্রদ্ধা প্রকাশ করছি।
আরেকজন ব্যক্তির নাম বলব, ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার একজন প্রবীণ কৃতবান শিক্ষক, যিনি লালমোহন মহিলা কলেজ স্থাপনের জন্য যতেষ্ট ভূমিকা পালন করেছেন এবং শিক্ষক হিসেবে এতটা সুনাম অর্জন এবং তিনটি ছেলের মধ্যে প্রথম ছেলে ইউ.এন.ও, ২য় ছেলে এম.বি.বি.এস ডাক্তার ও ৩য় ছেলে পৌর কাউন্সিলর এবং তিনি কতটা গুণী ব্যক্তি যাকে প্রতিনিয়ত আমার মনে পরে।
আমার ৩০ বছরের সংবাদ কর্মী হিসেবে উপরোল্লিখিত যত গুণিজনের নাম এবং তাদের কর্মের দাগ, সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করতে পেরে আমি ধন্য এবং তাদেরকে গুণিজন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াই আমার বিবেকের দায়িত্ব।
যাক সে কথা, আমার নিজ উপজেলায় আমার জানার বাইরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এতিমখানা, মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠার পিছনে অনেক তথ্য না পাওয়ায় বা আমার জানার বাইরে মানুষের কল্যাণে যে সমস্ত গুণিজনরা দাগ রেখেছেন তাদের নাম উল্লেখ করতে পারি নি বলে ক্ষমা প্রার্থী। তাদের সকল সৃষ্টিশীল এবং বিশেষ করে, শিক্ষার উন্নয়নে, প্রতিষ্ঠান গড়ে, কত যে দেশের প্রতি ভালোবাসা রেখেছে, সেটা বর্তমান সময়ে বিরল। তবে আমি একজন মফস্বল সংবাদকর্মী হিসেবে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করছি। সমাজে যতটুকু ভালো কাজ যারা করেছে তাদেরকে দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে যদি না পারি, সেটা আমার বিবেকের কাছে লজ্জাকর এবং আমার পেশার কাছে আমি ছোট মনে করি। ইতিপূর্বে যাদের নাম লিখতে পেরে ধন্য মনে করছি তারা প্রত্যেকেই অধিক শিক্ষিত এবং বই পড়া মানুষ।
এর বাইরেও গলাচিপা ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক এম.পি মরহুম আঃ বারেক মিয়া সহ ২১টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ১৯৬৯ সালে গলাচিপা কলেজটি প্রতিষ্ঠা করে। এছাড়া পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সময় গলাচিপা প্রাক্তন সাব রেজিস্ট্রার মনিরুজ্জামান, এম,এ রব মিয়া, আবুল হোসেন মধু মিয়া, আমার পিতা মরহুম হারুন অর রশিদ, মরহুম মোজাম্মেল হক (সাবেক চেয়ারম্যান) সহ তৎকালীন কতিপয় গুণিব্যক্তিদের প্রচেষ্টায় গলাচিপা সদরে প্রথম বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করে। সে বিষয়ে আমার যতটা তথ্য জানতে পেরেছি তাই উপস্থাপন করছি। আমার প্রিয় ব্যক্তিগণ, গুরুজন, শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি, বন্ধুবর বা প্রবীণ পন্ডিত সহ যাদের নাম উল্লেখ করেছি সেটা আমার জন্য বড় গর্বের বা বিবেক থেকে প্রকাশ।
জীবনের ৫৮ বছর অতিক্রম হয়েছে। আমার একটাই দাবী সমাজের মানুষের কাছে, ভালো মানুষকে এবং এলাকায় গুণিজনদের তুলে ধরুন এবং তাদেরকে সম্মান প্রদর্শন করুন। অর্থ ও বিত্তশালীদের কাছে অনুরোধ, মানুষের কল্যাণে কিছু সৃষ্টিশীল কাজ করার জন্য দাবী করছি।। জীবন চলার পথে ক্ষুদ্রজ্ঞানে যতটুকু জেনেছি তার মধ্যে টমাস আলভা এডিসনের একটি বিখ্যাত বাণী দিয়ে লেখা শেষ করছি, তিনি বলেছেন “ যদি সম্ভব হত তবে আমি মৃত্যুর পর শুধু কিছু বই সাথে নিয়ে পরপারে যেতাম এবং মানুষের সৃষ্টিশীল আত্মার খবরাখবর জানতাম”।
খালিদ হোসেন মিলটন
সভাপতি ও কলামিস্ট
গলাচিপা প্রেসক্লাব




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com