মাধ্যমিক স্তর হলো একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়। এই সময়ে শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের ভিত্তি তৈরি করে থাকে। সাধারণত একটি নির্দিষ্ট কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তকের ওপর ভিত্তি করেই পরীক্ষা পদ্ধতি পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরীক্ষায় এমন কিছু প্রশ্ন আসে যা নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত নয়। এই ‘পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত’ বা আউট অব সিলেবাস প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের ওপর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
১. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ সৃষ্টি-
শিক্ষার্থীরা সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করে তাদের পাঠ্যপুস্তকগুলো শেষ করে। যখন পরীক্ষার হলে তারা এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয় যা তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে, তখন তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এই আকস্মিক চাপ তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে জানা উত্তরগুলোও তারা ভুল করে আসে। দীর্ঘমেয়াদে এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষাভীতি বা ‘এক্সাম ফোবিয়া’ তৈরি করে।
২. কোচিং ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীলতা-
যখন মূল পাঠ্যপুস্তক থেকে পরীক্ষায় শতভাগ প্রশ্ন কমন পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না, তখন শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে। ফলে তারা বিভিন্ন গাইড বই এবং কোচিং সেন্টারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে পাঠ্যবই পড়ার যে মূল উদ্দেশ্য, তা ব্যাহত হয় এবং বাণিজ্যিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার ঘটে।
৩. বৈষম্য ও আর্থিক চাপ-
শহরাঞ্চলের সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা অনেক সময় বিভিন্ন সহায়ক বই বা নামী-দামী কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে বাড়তি সুবিধা ভোগ করতে পারে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের বা নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য শুধু মূল পাঠ্যপুস্তকই একমাত্র ভরসা। পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত প্রশ্ন মূলত এই দুই শ্রেণির শিক্ষার্থীর মধ্যে এক বিশাল বৈষম্য তৈরি করে। এর ফলে দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে এবং অভিভাবকদের ওপর আর্থিক চাপ বৃদ্ধি পায়।
৪. মূল পাঠ্যবইয়ের প্রতি অনীহা-
পরীক্ষায় যদি পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত প্রশ্ন নিয়মিত আসে, তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ধারণা জন্মে যে—মূল বই পড়ে কোনো লাভ নেই। এতে তারা মূল পাঠ্যবইয়ের গভীরে যাওয়ার পরিবর্তে ভাষা-ভাষা জ্ঞান নিয়ে অন্য উৎসের পেছনে দৌড়ায়। এটি শিক্ষার গুণগত মানকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
৫. সৃজনশীলতার অপমৃত্যু
সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশ ঘটানো। কিন্তু সেই সৃজনশীলতার নামে যদি এমন কিছু জানতে চাওয়া হয় যা তাদের পাঠ্যক্রমের সীমানার বাইরে, তবে তা সৃজনশীলতা না হয়ে বরং হয়রানিতে রূপ নেয়। শিক্ষার্থী তখন নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করার চেয়ে প্রশ্ন কমন পাওয়ার পেছনে বেশি সময় ব্যয় করে।
সম্ভাব্য সমাধানসমূহ বিবেচনা করা যেতে পারে:
১. প্রশ্নকর্তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান-
সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর মেধার প্রতিফলন ঘটানো, তাকে বিপদে ফেলা নয়। তাই প্রশ্নকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা পাঠ্যপুস্তকের শিখনফলের সীমানার মধ্যে থেকেই মানসম্মত ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন।
২. কঠোর মডারেশন বা পরিমার্জন ব্যবস্থা-
পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র মডারেশনের জন্য একটি দক্ষ বিশেষজ্ঞ কমিটি থাকতে হবে। তাদের প্রধান দায়িত্ব হবে প্রতিটি প্রশ্ন পাঠ্যবইয়ের কোনো না কোনো অংশ থেকে এসেছে কি না, তা নিশ্চিত করা। যদি কোনো প্রশ্ন নির্ধারিত সিলেবাসের বাইরে থাকে, তবে তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তন করতে পারেন।
৩. পাঠ্যপুস্তক ও প্রশ্নকাঠামোর সমন্বয়-
কারিকুলামের বাইরে কোনো প্রশ্ন না করার বিষয়ে একটি কঠোর নীতিমালা তৈরি করা যেতে পারে । প্রশ্ন হতে হবে পাঠ্যবইয়ের মূল কনসেপ্টের ওপর ভিত্তি করে, যাতে একজন শিক্ষার্থী শুধু পাঠ্যবই পড়েই আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিতে পারে।
৪. প্রশ্নব্যাংক ও নমুনা প্রশ্ন প্রণয়ন-
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে প্রতিটি বিষয়ের জন্য একটি মানসম্মত ‘নমুনা প্রশ্নব্যাংক’ সরবরাহ করা যেতে পারে। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই প্রশ্নের ধরন ও সীমা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন, যা বিভ্রান্তি কমাবে।
৫. জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
পাবলিক পরীক্ষায় বা মূল্যায়নে পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত প্রশ্ন আসলে, তার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশ্নকর্তা বা মডারেটর প্যানেলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
৬. সহায়ক নির্দেশিকা প্রদান-
শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে ‘কী ধরনের গভীরতা’ থেকে প্রশ্ন হতে পারে, তার একটি সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা থাকতে হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারবে তাদের পাঠ্যবইয়ের ঠিক কোন অংশগুলো থেকে সৃজনশীল প্রশ্ন আসার সম্ভাবনা বেশি।
৭. শিক্ষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি-
শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় শিক্ষকদের নিশ্চিত করতে হবে যে তারা যেন পাঠ্যবইয়ের বাইরের অপ্রয়োজনীয় তথ্যের চেয়ে মূল তাত্ত্বিক বিষয়গুলো বোঝাতে বেশি সময় ব্যয় করেন। পরীক্ষায় অতিরিক্ত তথ্য নয়, বরং বিষয়ের ওপর দখল যাচাই করা উচিত।
একটি আদর্শ শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যায়ন পদ্ধতি হওয়া উচিত স্বচ্ছ এবং ন্যায়সঙ্গত। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক সক্ষমতা বিবেচনা করে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা জরুরি। পাঠ্যপুস্তকের ধারণা থেকেই সৃজনশীল প্রশ্ন হতে পারে, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই পাঠ্যক্রমের মৌলিক কাঠামোর বাইরে না চলে যায়। শিক্ষার্থীদের মূলধারার শিক্ষায় ধরে রাখতে এবং তাদের মেধার সঠিক মূল্যায়নের জন্য পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত প্রশ্নের প্রবণতা রোধ করা একান্ত প্রয়োজন।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, খাস মহল লতীফ ইনস্টিটিউশন, মঠবাড়ীয়া, পিরোজপুর।