শান্তির বার্তালাইলাতুল কদরের ফজিলত ও মর্যাদা ঘোষণা করে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি মর্যাদাপূর্ণ কদর রাতে। হে হাবিব (সা.)! আপনি কী জানেন, মহিমাময় সেই কদরের রাত কি? মহিমান্বিত কদরের রাত হলো হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ তাদের প্রভুর অনুমতি ও নির্দেশে দলে দলে অবতরণ করেন। সব বিষয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে।
এই শান্তির ধারা চলতে থাকে ফজর পর্যন্ত।’ (সুরা কদর, আয়াত ১-৫)
আবু হাতেম ও ওয়াহেদির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, ‘একদিন রসুল (সা.) সাহাবিদের নিয়ে আলোচনা করছেন। কথায় কথায় রসুল (সা.) বললেন, বনি ইসরায়েলের যুগে একজন বড় বুজুর্গ মানুষ ছিলেন। তিনি রাতভর নামাজ ও তিলাওয়াতে ডুবে থাকতেন আর দিনভর নাঙ্গা তলোয়ার হাতে খোদার রাস্তায় জিহাদ করে কাটিয়ে দিতেন।
এভাবে তিনি এক হাজার মাস ইবাদতে অতিবাহিত করেন। এ ঘটনা শুনে বিস্ময়ে সাহাবিদের চোখ কপালে উঠে গেল। তারা আফসোস করে বললেন, ওই আবেদের তুলনায় আমাদের ইবাদত কত কম। আখেরি নবী (সা.)-এর উম্মতের এ আফসোসটুকু আল্লাহ বরদাশত করলেন না।
নবী (সা.) ও তাঁর উম্মতের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সঙ্গে সঙ্গে সুরা কদর নাজিল করে জানিয়ে দিলেন, এ উম্মতের জীবনে প্রতি বছরই এমন একটি মহিমান্বিত রাত আসবে যে রাতের ইবাদতের মর্যাদা হাজার মাসের চেয়েও বেশি হবে।’ (তাফসিরে মুজাহিদ ও তাফসিরে তাবারি)।
মালেকি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালেক (রহ.) তাঁর বিখ্যাত মুয়াত্তা গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমি এক জ্ঞানীকে বলতে শুনেছি, উম্মতে মুহাম্মাদির হায়াতে দুনিয়া খুবই সামান্য। অন্যান্য উম্মত হাজার বছরও হায়াত পেত। তাই যুক্তি বলে অন্যান্য উম্মতের চেয়ে উম্মতে মুহাম্মাদির ইবাদতের পরিমাণও হবে কম।
কিন্তু এ যুক্তি টেকে না লাইলাতুল কদরের মতো অসাধারণ নেয়ামতের কল্যাণে। এ এক রাতের ইবাদত উম্মতে মুহাম্মাদিকে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে দেবে। (মুয়াত্তা মালেক)।
প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা কাজি সানাউল্লাহ পানিপথী (রহ.) তাঁর তাফসিরে ইমাম মুয়াত্তার হাদিসটি উল্লেখ করে বলেন, ‘সুরা কদর নাজিল হওয়ার যতগুলো শানেনজুল বর্ণিত হয়েছে তার মধ্যে ইমাম মালেকের বর্ণনাটিই সর্বাধিক সহি। এ বর্ণনাটি এ কথাও প্রমাণ করে, লাইলাতুল কদর উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য বিশেষ হাদিয়া। অন্য কোনো উম্মতকে এ ধরনের নেয়ামত দিয়ে ধন্য করা হয়নি। ইবনে হাবিব মালেকিও এরকম বলেছেন। আর ইমাম শাফেয়ি (রহ.) তাঁর ‘আল ইদ্দত’ গ্রন্থে এটিই অধিকাংশ আলেমের মত বলে মন্তব্য করেছেন।’ (তাফসিরে মাজহারি।)
কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী বলেন, ‘লাইলাতুল কদর উম্মতের মুহাম্মাদির বিশেষ মর্যাদার প্রতীক এ মতের পক্ষে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। নাসায়ি শরিফে সাহাবি আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, একবার তিনি রসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রসুলুল্লাহ! ফজিলতপূর্ণ কদরের রাত কি কেবল নবুয়ত ও রেসালাতের সঙ্গেই সম্পর্কিত? নবী-রসুলগণের ওফাতের সঙ্গে সঙ্গে কি এ রাতের মর্যাদা শেষ হয়ে যায়? জবাবে রসুল (সা.) বললেন, না।
বরং কদরের ফজিলত জারি থাকে।’ (নাসায়ি শরিফ)। এ হাদিসের ব্যাখ্যায় একটি ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন বিখ্যাত হাদিসবিশারদ আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)। তাঁর মতে, পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্যও লাইলাতুল কদর ছিল। কেননা নবীজি (সা.) বলেছেন, নবী-রসুলগণের ওফাতের পরও লাইলাতুল কদর জারি থাকে। এ থেকে বোঝা যায়, অন্যান্য নবীর উম্মতদের জন্যও কদর ছিল। আর সেসব আম্বিয়ায়ে কেরাম ওফাতের পর তাঁদের উম্মতের জন্য কদর জারি ছিল।
এ বক্তব্যের জবাবে কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী বলেন, ইবনে হাজারের বক্তব্য এখানে গ্রহণযোগ্য নয়। বরং রসুল (সা.)-এর বাণী ‘নবী রসুলদের ওফাতের পরও লাইলাতুল কদরের ফজিলত জারি থাকবে এ কথা দিয়ে বোঝানো হয়েছে, হুজুর (সা.)-এর ওফাতের পর লাইলাতুল কদরের নেয়ামত বন্ধ হয়ে যাবে না। এর মাধ্যমে এ কথা প্রমাণ করার সুযোগ নেই যে অন্যান্য নবীর উম্মতের জন্যও লাইলাতুল কদর ছিল। (তাফসিরে মাজহারি)
নির্ভরযোগ্য হাদিসের বর্ণনাগুলো থেকে জানা যায়, মাহে রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোয় এ রাতটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম ২৬-এর দিবাগত ২৭-এর রজনির দিকেই বেশি ইঙ্গিত দিয়েছেন। মর্যাদার এ রাত পেয়ে গেলে মুমিন বান্দা আল্লাহর কাছে কী দোয়া করবেন? কী চাইবেন? এ সম্পর্কে হাদিসের একটি বর্ণনা এভাবে এসেছে আম্মাজান আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার আমি রসুলুল্লাহকে (সা.) জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রসুল! (সা.) আপনি বলে দিন, আমি যদি লাইলাতুল কদর পেয়ে যা-ই তাহলে কী দোয়া করব? জবাবে রসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আয়েশা! তুমি বলবে, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন; তুহিব্বুল আফওয়া, ফাফু আন্নি।’ অর্থ হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল; ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন।’ আমিন (মুসনাদে আহমাদ ও ইবনে মাজাহ।)
লেখক: ইসলামিক গবেষক