বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের ত্যাগ, সংগ্রাম এবং নেতৃত্বের পরম্পরা জাতীয় জীবনের মোড় পরিবর্তন করে দিয়েছে। সেই ধারায় নব্বইয়ের দশকের উত্তাল সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব যেমন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নতুন মাত্রা দিয়েছিল, ঠিক তেমনি বর্তমান সময়ে তাঁর তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের আবির্ভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। একটি দলের নেতৃত্বের পালাবদল নয়, বরং আধুনিক শিক্ষা, মার্জিত রুচি এবং প্রগতিশীল চিন্তাধারার এক অনন্য সংমিশ্রণ, যা দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে এক শক্তিশালী বার্তা বহন করছে। জাইমা রহমানের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয় কেবল তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নিজের মেধা ও সাহসের মাধ্যমেই তিনি আজ দেশবাসীর হৃদয়ে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন।
জাইমা রহমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠার সময়কালটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। ১৯৯৫ সালের ২৬ অক্টোবর ঢাকায় জাইমা রহমানের জন্ম হয় । তার জন্মের পর তাকে কেন্দ্র করে একটি অত্যন্ত আবেগী ও শৈল্পিক ঘটনা ঘটেছিল, যা আজও সাহিত্যের ইতিহাসে এক অমলিন স্মৃতি হয়ে আছে। তৎকালীন সময়ের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও ছড়াকার আবু সালেহ, যিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ছড়াশিল্পের এক কিংবদন্তি, তিনি জাইমা রহমানের জন্মের পর একটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি শিশুদের জন্য দপাখির ঠোঁটে ছড়া’ শিরোনামে অসাধারণ ছড়ার বই রচনা করেন এবং সেই বইটি জাইমা রহমানের নামে উৎসর্গ করেন।
বইটি যখন বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত হলো, তখন আবু সালেহ সেটি ব্যক্তিগতভাবে উপহার দেয়ার জন্য বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে যান। সেখানে এক অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। আবু সালেহ বেগম খালেদা জিয়ার কাছে বইটি হস্তান্তর করার সময় অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম, খালেদা জিয়া জুনিয়র-এর নামে উৎসর্গ করে এই ছড়ার বইটি প্রকাশ করেছি এবং আপনাকে উপহার দিতে এসেছি।’ এই আন্তরিক সম্বোধন শুনে বেগম খালেদা জিয়া অত্যন্ত খুশি হন এবং তার নাতনিকে নিয়ে করা এই কাজটির প্রশংসা করেন। তিনি তখন হাসিমুখে সায় দিয়ে বলেছিলেন, ‘জাইমা আসলেই আমার ডুপ্লিকেট হয়েছে’। এই উক্তিটি কেবল স্নেহের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং এটি ছিল এক প্রজন্মের মধ্যে অন্য প্রজন্মের চারিত্রিক ও আদর্শিক প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়ার এক রাজনৈতিক স্বীকৃতি। আবু সালেহর সেই ছড়ার বইটি আজ কেবল একটি শিশুপাঠ্য গ্রন্থ নয়, বরং জাইমা রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের এক অদৃশ্য শুভকামনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
জাইমা রহমানের পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাতনি । তার পিতা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) এবং মাতা কার্ডিওলজিস্ট ডা. জুবাইদা রহমান । তার মাতামহ ছিলেন সাবেক নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান। এমন এক বর্ণাঢ্য পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তার মজ্জাগত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৮ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাইমা রহমানকে তার পরিবারের সাথে লন্ডনে পাড়ি জমাতে হয়। লন্ডনের এই দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবন ছিল তার জন্য এক গভীর প্রস্তুতির সময়। প্রবাসে থাকলেও জাইমা কখনো তার শিকড় ভুলে যাননি। তার নিজের ভাষায়, ‘আমি কখনোই আমার শিকড় ভুলে যাইনি এবং আমার হৃদয়ে সবসময় বাংলাদেশ ছিল’। লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে তার আইন বিষয়ে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে ২০১৯ সালে ঐতিহ্যবাহী লিংকনস ইন থেকে বার-অ্যাট-ল সনদ প্রাপ্ত হন। পেশাগত জীবনে একজন ব্যারিস্টার হিসেবে তিনি কেবল আইনি লড়াই শিখেননি, বরং মানুষের অধিকার আদায়ের পথগুলোকেও রপ্ত করেছেন। লন্ডনের এই সময়কাল তাকে একজন বাস্তববাদী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে এবং তাকে এক বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছে। তার আইনি ক্যারিয়ারে তিনি সবসময় বঞ্চিতদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন এবং ন্যায়বিচারের গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন। এই শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা তাকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এক দক্ষ ও বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পথে সহায়তা করছে।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছে। ছাত্র-জনতার এই গণঅভ্যুত্থানের সময় জাইমা রহমান লন্ডনে থাকলেও নেপথ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি তাঁর বাবার পাশে থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য নিরলস কাজ করেছেন। ৫ই আগস্টের পর যখন বাংলাদেশে নতুন রাজনীতির সূর্য উদিত হলো, তখন জাইমা রহমানের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের কাছে এক নতুন আশার সঞ্চার করে।
তিনি মনে করেন, জুলাইয়ের এই বিপ্লব কেবল সরকারের পরিবর্তন নয়, বরং এটি মানুষের চিন্তার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার এক বহিঃপ্রকাশ। জাইমা রহমানের প্রভাবে বিএনপি তরুণদের সাথে এক নতুন সেতু গড়ে তুলেছে। তিনি তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন যে, এই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন, তাদের স্বপ্ন পূরণ করাই হবে নতুন বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য।
২০২৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে জাইমা রহমান তার বাবা-মায়ের সাথে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বিমানবন্দরে হাজার হাজার মানুষের আবেগঘন অভ্যর্থনা প্রমাণ করে যে, দেশের মানুষ জিয়া পরিবারের এই তরুণ উত্তরাধিকারীকে নিয়ে কতটা উৎসাহিত। দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। বিশেষ করে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তার পদযাত্রা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি তার বাবার আসন ঢাকা-১৭ এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন এবং সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যান। রাজপথে সাধারণ রিকশায় চড়ে লিফলেট বিলি করার দৃশ্যটি দেশবাসীর মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যারিস্টার যখন সাধারণ মানুষের দুয়ারে গিয়ে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান, তখন রাজনীতির প্রথাগত কাঠামোর বাইরে এক মানবিক ও জনবান্ধব রূপ ফুটে ওঠে। তার প্রচারণার শৈলী ছিল অত্যন্ত আধুনিক এবং সরাসরি জনসম্পৃক্ত, যা তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাকে জনপ্রিয় করে তোলে।
জাইমা রহমান কেবল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন না, বরং তিনি একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছেন। ঢাকা ফোরাম আয়োজিত ‘জাতি গঠনে নারী’ শীর্ষক সেমিনারে তার বক্তব্য ছিল অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও অর্থবহ। তিনি বলেন, ‘জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি অংশ নারীদের পেছনে ফেলে রেখে বাংলাদেশ কোনোদিনও প্রকৃত উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারবে না’। তিনি মনে করেন, নারীদের ক্ষমতায়ন কেবল প্রতীকী হলে চলবে না, বরং তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষায় তার সদিচ্ছা সর্বজনবিদিত। তিনি মনে করেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কী করা প্রয়োজন, তা তাদের কাছ থেকেই শোনা উচিত। তিনি প্রতিবন্ধী ভাতা বৃদ্ধিসহ তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। সাইবার বুলিং এবং অনলাইনে নারীদের হয়রানি রোধেও তিনি অত্যন্ত সচেতন। তিনি মনে করেন, স্কুল পর্যায় থেকে শিশুদের নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা উচিত, যাতে তারা অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে শিখে। তার রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির মূল স্তম্ভ হলো নারী অধিকার নিশ্চিত করা, প্রতিবন্ধী উন্নয়ন, তরুণদের মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ প্রদান এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
জাইমা রহমানের ব্যক্তিত্বের গভীরে রয়েছে তার দাদি বেগম খালেদা জিয়ার শিক্ষার প্রভাব। জাইমা তার দাদিকে ভালোবেসে ‘দাদু’ বলে ডাকেন । তিনি তার স্মৃতিচারণে বলেন যে, বেগম জিয়া শত ব্যস্ততার মাঝেও পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নিতেন এবং তাদের ছোট ছোট সাফল্যকে বড় করে দেখতেন । শৈশবে একবার স্কুলের একটা টুর্নামেন্টে জাইমা পদক পাওয়ার পর বেগম জিয়া তাকে যেভাবে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, সেই স্মৃতি জাইমার মনে নেতৃত্বের নম্রতা ও আন্তরিকতার বীজ বপন করেছিল।
বেগম খালেদা জিয়া যেমন কখনো অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি, জাইমা রহমানের মধ্যেও সেই চারিত্রিক দৃঢ়তা স্পষ্ট। বেগম খালেদা জিয়ার সেই অমর উক্তি ‘জাইমা আসলেই আমার ডুপ্লিকেট হয়েছে’—আজকের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে। জাইমা রহমানের কথা বলার ধরণ, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং পরিস্থিতি সামাল দেয়ার সক্ষমতা তাকে একজন পরিপক্ক নেতা হিসেবে গড়ে তুলছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন পরিবর্তনের সুর। এই পরিবর্তনে জাইমা রহমান কেবল একটি নাম নন, বরং তিনি একটি সম্ভাবনার নাম। উচ্চশিক্ষা, বিনয় এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ব্যারিস্টার জাইমা রহমান আজ বাংলাদেশের কোটি তরুণ-তরুণীর আইকন। তিনি চান এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে ভিন্নমতের মর্যাদা থাকবে এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে।
শহীদ জিয়ার দর্শন আর বেগম জিয়ার আপসহীন আদর্শকে বুকে ধারণ করে জাইমা রহমান এগিয়ে যাচ্ছেন আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে। তার এই পথচলা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং দেশবাসীকে এক উন্নত ও সম্মানজনক জীবনের স্বপ্ন দেখাবে—এটাই আজ সমগ্র জাতির প্রত্যাশা। জাইমা রহমানের এই ইতিবাচক রাজনীতিই হতে পারে বাংলাদেশের অন্ধকার কাটিয়ে আলোর পথে ফেরার মূল চাবিকাঠি। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন হয় গণমানুষের কল্যাণে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এক অটল দুর্গ। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দোয়া ও ভালোবাসা জাইমা রহমানের এই দীর্ঘ লড়াইয়ের পথকে আরও মসৃণ ও সফল করবে।
লেখক: কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক