পবিত্র রমজান মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। এক মাসের সিয়াম, কিয়াম, কোরআন তিলাওয়াত ও দান-সদকার মাধ্যমে মুমিনের হৃদয়ে ঈমানের এক বিশেষ জাগরণ সৃষ্টি হয়। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো; রমজান শেষ হওয়ার পর এই অর্জিত ঈমান ও তাকওয়া কতটা ধরে রাখা যায়?
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, রমজানের মূল লক্ষ্যই হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন।
কিন্তু যদি রমজান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের জীবনে গুনাহ, অবহেলা ও উদাসীনতা ফিরে আসে, তবে সেই তাকওয়ার বাস্তব প্রতিফলন কোথায়?
আরেক স্থানে আল্লাহ বলেন, “আর তোমার প্রতিপালকের ইবাদত কর, যতক্ষণ না তোমার কাছে মৃত্যু আসে।” (সুরা আল-হিজর আয়াত : ৯৯)
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ইবাদত কোনো নির্দিষ্ট মাস বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা একটি আজীবন চলমান প্রক্রিয়া। রমজান এই ধারাবাহিক ইবাদতের প্রশিক্ষণকাল মাত্র।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়। (বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৪)
এই হাদিস আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ করে যে, রমজানে অনেক ইবাদত করার পর তা হঠাৎ ছেড়ে না দিয়ে, বরং কম হলেও ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়া উচিত।
রমজান শেষে ঈমান ধরে রাখার ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ সামনে আসে। প্রথমত, শয়তানের প্ররোচনা। রমজানে শয়তান শৃঙ্খলিত থাকলেও (বুখারি, হাদিস: ১৮৯৯), রমজান শেষে সে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং মানুষকে গুনাহের দিকে আকৃষ্ট করে।
দ্বিতীয়ত, পরিবেশ ও অভ্যাসের প্রভাব। রমজানে মসজিদমুখী জীবন, কোরআন তিলাওয়াত, রাতের ইবাদদের মতো যে পরিবেশ তৈরি হয়; রমজান শেষে তা অনেকাংশে কমে যায়। ফলে পুরনো অভ্যাসে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
তৃতীয়ত, আত্মতুষ্টি। অনেকেই মনে করেন, রমজানে ইবাদত করাই যথেষ্ট, এখন কিছুটা শিথিলতা চলতে পারে।
অথচ ঈমান একটি পরিবর্তনশীল বিষয়, যা যতœ না নিলে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এক্ষেত্রে করণীয় কী?
প্রথমত, ছোট কিন্তু নিয়মিত আমলের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। প্রতিদিন অল্প কোরআন তিলাওয়াত, নফল সালাত ও যিকির। এই ধারাবাহিকতা ঈমানকে জীবিত রাখে।
দ্বিতীয়ত, নেক সঙ্গ গ্রহণ করা। যারা আল্লাহর স্মরণ করিয়ে দেয়, এমন মানুষের সঙ্গে থাকা ঈমানকে শক্তিশালী করে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তুমি নিজেকে তাদের সঙ্গে রাখো, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে ডাকতে থাকেৃ” (সুরা কাহফ, আয়াত : ২৮)
তৃতীয়ত, গুনাহ থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকা। কারণ গুনাহ হৃদয়কে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে এবং ঈমানকে দুর্বল করে দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, রমজান কোনো সমাপ্তি নয়; বরং এটি একটি সূচনা; একটি নতুন, পরিশুদ্ধ জীবনের সূচনা। প্রকৃত সফল সেই ব্যক্তি, যে রমজানের শিক্ষা সারা বছর ধরে জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের অর্জন সংরক্ষণ করার তাওফিক দান করুন।
লেখক: ্ প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক saifpas352@gmail.com